তরুণীদের অস্বাভাবিক রূপসৌন্দর্যে বিস্মিত হলো না আজমীর। কারণ, আল্লাহ তাআলা প্রকৃতিগতভাবেই এই এলাকাটিকে দুনিয়ার মধ্যে সবেচেয়ে সুন্দর করে বানিয়েছেন। এখানকার সব মানুষই সুন্দর। আজমীরকে যে বিষয়টি অবাক করলো, তা হলো, এখানকার ধারে কাছে কোন জনবসতি নেই। দূরের জনবসতি থেকে কেউ এখানে গোসল করতে আসে না। তাছাড়া তরুণীদের দেখে নিকটবর্তী গ্রামের অধিবাসী মনে করার কোনই যুক্তি নেই। এদের রূপ-সৌন্দর্যের সাথে আশপাশের গ্রামের তরুণীদের কোন তুলনাই হতে পারে না। এদেরকে গ্রাম্য তরুণী বলারও কোন অবকাশ নেই। আজমীরের মনে পড়ল, এই এলাকায় জনশ্রুতি আছে, অনেকেই নাকি গ্রাম থেকে দূরে পাহাড়ের ঢালে বা নির্জন স্থানে সুন্দরী নারীদের দেখতে পায়। লোকজনের ভাষায় এরা হয়তো প্রেতাত্মা, নয়তো স্বর্গের জ্বিন-পরী।
কমান্ডার আজমীর মুগ্ধ ও বিমোহিত হয়ে তরুণীদের দেখছিল। হঠাৎ এক তরুণী একদিকে তাকিয়ে আর্তচিৎকার করে দৌড় দিল। দেখাদেখি আরেক তরুণীও দৌড়ে পালাল। তৃতীয় তরুণীটি নদীর পাড়ে বসা ছিল। সে উঠে দৌড় দিতে গিয়ে নদীতে পড়ে গেল। সেখানে পানি ছিল হাঁটু পরিমাণ। ঠিক এমন সময় একটি বিশালকায় বন্য শূকর গর্জন করতে করতে পানির দিকে অগ্রসর হলো। তরুণী পানি থেকে সোজা হয়ে উঠে যেই ভয়ঙ্কর দাঁতাল বন্য শূকর দেখতে পেল, অমনি আর্তচিৎকার করে আবারো পানিতে গড়িয়ে পড়ল। বিশালদেহী বন্য শূকরটি এবার তরুণীকে ধরার জন্য পানিতে নেমে তরুণীর দিকে অগ্রসর হতে লাগল।
আজমীরের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল এই তরুণী কোন প্রেতাত্মা কিংবা জীন পরী নয়- নিতান্তই মর্তের মানুষ। কমান্ডার ঘোড়ার লাগাম টেনে অশ্বপৃষ্ঠে এড়ি দিল। তাড়া খেয়ে ঘোড়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেল। কমান্ডার আজমীর বর্শাটিকে ডান হাতে নিয়ে নিশানা নিল। লক্ষ্যভেদী আঘাত হানতে হবে। কারণ, বন্য শূকর লাফিয়ে লাফিয়ে নর্তন-কুর্দন করে তীব্র গর্জন করে তরুণীকে শিকার করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। তরুণীকে ধরে ফেলবে ফেলবে অবস্থায় কমান্ডার আজমীর প্রচণ্ড জোরে শূকরের দিকে বর্শা নিক্ষেপ করলে বর্শাটি তীরের মতো উড়ে গিয়ে শূকরের পাজরে আমূল বিদ্ধ হল। বিকট চিৎকার করে শূকরটি লাফিয়ে উঠে পানিতে উল্টে পড়ল। বন্য শূকরটি আবারো পানি থেকে উঠে ঠায় কয়েকটি চক্কর দিয়ে পানিতে ঢলে পড়ল। আজমীর এক লাফে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দৌড়ে নদী থেকে তরুণীকে তুলে আনল। দাঁতাল বন্য শূকরটি তখনও পানিতে পড়ে ধীরে ধীরে গোংড়াচ্ছে আর পা ছড়িয়ে দাপাদাপি করছে।
তরুণী বেহুঁশ। তার সাথী তরুণীরা কোথায় পালিয়েছে পাত্তা নেই। আজমীর সংজ্ঞাহীন তরুণীকে পাজাকোলা করে এনে ঘোড়ার পিঠে শুইয়ে দিল এবং নদীর তীরে পড়ে থাকা কাপড়গুলো এনে তরুণীর উলঙ্গ দেহটা ঢেকে দিয়ে চৌকির দিকে রওনা হলো। সে বেহুঁশ তরুণীটিকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছিল আর মনে মনে ভাবছিল এই তরুণীদের পরিচয় উদ্ধার করতে পারলে হয়তো অনেক গোপন রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
আজমীর ভেবে কূল পাচ্ছিল না, এতো সুন্দরী এই তিন তরুণী এখানে কোত্থেকে এসেছে! আর ওর সাথীরাই বা কোথায় হারিয়ে গেছে। এই নির্জন জঙ্গলের মধ্যে এসে এরা নদীতে ঝাপাঝাপিই বা করছিল কোন উদ্দেশ্যে? এরা কি একবারও ভাবেনি, জঙ্গলের ভেতর থেকে যে কোন সময় কোন হিংস্র জন্তু এসে তাদের জন্য বিপদ হতে পারে? আকাশ-পাতাল ভাবনার কোন কিনার হওয়ার আগেই সংজ্ঞাহীন তরুণীকে নিয়ে চৌকিতে পৌঁছে গেল কমান্ডার আজমীর।
সেনাচৌকিতে পৌঁছানোর পর তরুণী ক্ষীণ কণ্ঠে আওয়াজ করল। তরুণী নিজে থেকেই শয়ন থেকে উঠতে চেষ্টা করছিল। কমান্ডার আজমীর তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে দিল। তরুণীর জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু নিজেকে এই অচেনা সেনাচৌকিতে দেখে শূকর দেখার চেয়ে আরো বেশী ঘাবড়ে যাওয়ার ভাব চোখে মুখে ফুটে উঠলো। অত্যধিক ভীত হওয়ার কারণে তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। আজমীর স্থানীয় ভাষায় কথা বললে বুঝতে পারল তরুণী। আজমীর তাকে পরিধেয় কাপড়-চোপড় ঠিকঠাক করে নিতে বলল।
“আপনিই কি আমাকে জংলী দাতাল শূকরের কবল থেকে বাঁচিয়েছেন?” ধরা গলায় আজমীরের উদ্দেশে বলল তরুণী।
“আমি যদি সেখানে না থাকতাম এবং আমার হাতে যদি বর্শা না থাকতো, তাহলে তোমার পক্ষে জীবন বাঁচানোই মুশকিল ছিল। এতোক্ষণে বন্য শূকরের আঘাতে তোমার ক্ষত-বিক্ষত দেহ নদীর স্রোতে ভেসে যেতো। আমিই সেই হিংস্র শূকরটিকে হত্যা করেছি। এখন আর তোমার কোন ভয় নেই। তুমি নিরাপদ। তুমি যেখানে যেতে চাও তোমাকে নিরাপদে সেখানেই পৌঁছে দেয়া হবে। আতঙ্কিত তরুণীকে আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে বলল কমান্ডার আজমীর।
কাপড় পরার জন্য তরুণী অপর একটি খালি কক্ষে চলে গেল। আজমীর এতোক্ষণ দেখছিল তরুণীকে। মানুষও এতো সুন্দর হতে পারে? এ যেনো কল্পনাকেও হার মানায়!
কাপড় পরে ফিরে এসে তরুণী আজমীরের কাছে জানতে চাইলো, “এখন আমার সাথে কী ধরনের আচরণ করা হবে?”
“যার আশঙ্কা তুমি করছো, এমনটি করতে চাইলে সেই নদীর তীরেই আমি করতে পারতাম।” বলল আজমীর।
আমি তোমার সম্পূর্ণ উলঙ্গ শরীর কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। এখানে কোন বদ মতলবে তোমাকে নিয়ে আসিনি। তোমার জীবন রক্ষার তাগিদেই তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। এখন বল, কোথায় যেতে চাও তুমি? যেখানে যেতে চাও, সেখানেই তোমাকে রেখে আসবো।”
