আজমীর ইমামের কথা শুনে গ্রামে গিয়ে অধিবাসীদের আতঙ্ক দূর করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে অধিবাসীদের ভয় দূর হয়নি; বরং সে নিজেই কিছুটা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছে। কারণ, সে আলেম ছিল না। ইসলামের সহীহ আকীদা-বিশ্বাসের অকাট্য কোন দলীল-প্রমাণ সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান ছিল না। সে শুধু জানতো “কেউ ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু বললে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে” এই নির্দেশের কথা।
গ্রাম প্রদক্ষিণ করে মসজিদে গিয়ে কমান্ডার আজমীর ইমাম সাহেবকে বললো, আমি একজন সৈনিক আর আপনি আলেম। আপনার ইলম এসব ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেয়? আপনি এ সম্পর্কে লোকজনকে একটা বুঝ দিন। তা না হলে আমাদের সৈনিকরাও তো ইসলাম ছেড়ে দেবে।
আমি তরবারী দিয়ে লড়াই করতে পারি, মানুষ শাসন করতে পারি, যে কোন দুর্ভেদ্য দুর্গের প্রাচীর ডিঙাতে পারি, কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ এবং নাদান একজন মানুষ। আপনার ও ইসলামের আকীদা-বিশ্বাসের পাহারাদারী করার জন্য আমাকে এখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সুলতান নির্দেশ দিয়েছেন যেন মানুষের মন জয় করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু এখানে এমন সব ঘটনা ঘটছে যে, তাতে মানুষের মনের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নানা সংশয়-সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সম্মানিত ইমাম, এ সম্পর্কে আপনি আমাকে কিছু বলুন, আল্লাহ না করুন শেষে আমি নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে না যাই।
বাস্তবে এসব অদ্ভুত ঘটনার বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়ার মতো প্রজ্ঞা ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস ও হিন্দুদের কঠিন চক্রান্ত সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ইমামের কাছে ছিল না।
ফলে যৌক্তিক কোন আশ্বাস বাণী ছাড়াই কমান্ডারসুলভ ভঙ্গিতে গ্রামবাসীকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে হুমকি ধমকি দিয়ে চৌকির কমান্ডার আজমীর নিজের চৌকিতে ফিরে এলো। আজমীর নিজেও বিভ্রান্তির শিকার। গ্রামের লোকেরা রাতের অন্ধকারে যে আওয়াজ শুনেছিল, নীরব ও একাকীত্বে আজমীর নিজেই সেই আওয়াজ শুনতে শুরু করল- “ইসলাম যদি সত্যিই সৃষ্টিকর্তার ধর্ম হয়ে থাকে, তবে এসব ঘটনার বিপরীতে কোন অলৌকিক ঘটনা দেখাও না!”
“আজমীরের সেনাচৌকির অবস্থানও ছিল একটি পাহাড়ের ঢালুতে। কাঠের তৈরী দু’তলা বিশিষ্ট একটি ঘরকে সেনাচৌকি বানানো হয়েছে। রাতের বেলায় উদ্বিগ্ন মনে চৌকির দুতলার জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল কমান্ডার আজমীর। রাত যেমন তীব্র ঠাণ্ডা, তেমনই ঘন অন্ধকার। দশ হাত দূরের কোন জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। কাশ্মীরের প্রাকৃতিক গাছ গাছালীর নানা ফুলের সুবাসে মনোমুগ্ধকর একটি মনমাতানো পরিবেশ। নাম না জানা অচেনা ফুলের গন্ধে মোহিত চারদিক।
আজমীর ছিল নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান। কিন্তু এখানে এসে সে ইসলামকে নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখী। আজমীর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো, হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস নিতান্তই একটি বাতিল ধর্মবিশ্বাস। মূর্তিপূজা সর্বৈব একটি কুফরী কাজ। কিন্তু ইসলাম যে সত্য ধর্ম, এ বিষয়টি বাস্তবতার নিরীখে সংশয়ের শিকার নওমুসলিম আজমীরের কাছে প্রমাণ করার মতো কোন উপাদান ছিল না। সে জোর দিয়ে বলতে পারছিল না, ইসলমাই সত্য।
নিস্তব্ধ রাতের এই একাকীত্বে চিন্তা-ভাবনায় হঠাৎ ছেদ ঘটালো দূরের একটি পাহাড়ের ঢালের আলোকরশ্মি। ঘন অন্ধকার রাতেও রশির আলোর ঝলক ছিল বেশ তীব্র। আলোটি কয়েকবার চমকালো আবার বন্ধ হয়ে গেলো। এ দৃশ্য দেখে কমান্ডার আজমীরের গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেলো। সে ভাবতে লাগল, সকাল হলেই গ্রামের মানুষের মুখে শোনা যাবে- রাতে গ্রামের পাহাড়ে তারা আগুন জ্বলতে দেখেছে। অথবা বলবে, রাতের বেলায় অমুক পাহাড় আগুন উদগীরণ করেছে।”
অবস্থাদৃষ্টে কমান্ডার আজমীর এতোটাই পেরেশান হলো যে, সে সিজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে নিবেদন করল, হে পরওয়ারদেগার! তুমি তোমার পবিত্র নামের মর্যাদা রক্ষা করো। তুমি তোমার প্রিয় ধর্ম ইসলামের পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখো। তুমি আমার ঈমানের দ্যুতি দেখাও, আমি যাতে এসব অদ্ভুত আগুনের রহস্য উদ্মাটন করতে পারি এই ক্ষমতা দাও।”
রাত শেষে ভোরের আলো যখন দিনের বার্তা ঘোষণা করলো, তখনও সেই রাতের ঘটনা কমাণ্ডার আজমীরের মনে পাথরের বোঝা হয়ে বিরাজ করছিল। সে দায়িত্ব অনুভব করছিল, এসব অস্বাভাবিক ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে তার ধর্মের পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু এসব অলৌকিক ঘটনার রহস্য উঘাটনের মতো ইলম ও প্রজ্ঞা কিছুই তার ছিল না। সূর্য যখন অনেকটা উপরে উঠে গেল, তখন একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে সে একাকীই বেরিয়ে পড়ল। সে চুপি চুপি গ্রামের মানুষের ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করল।
সে সময় কাশ্মীরের এই এলাকাটি ছিল ঘন গাছ গাছালীতে ভরা। ঘন বনজঙ্গলে প্রায়ই হিংস্র জীব-জন্তুকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতো। মাঝেমধ্যে হরিণও পাওয়া যেতো। তীর-ধনুক আজমীরের সাথেই ছিল। একটি বর্শাও থাকতো তার সাথে সব সময়।
যেতে যেতে চৌকি থেকে অনেকটা দূরে একটি জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল সে। জঙ্গলের পাশ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছিল পাহাড়ী নদী। হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো নারী-কণ্ঠের হাসির আওয়াজ। অতি সন্তর্পণে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালো আজমীর। তার নজরে পড়ল নদীতে তিনটি রূপসী তরুণী জলকেলী করছে আর হাসাহাসি করছে। একজন অপরজনের গায়ে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর তরুণী তিনজন। কোমর থেকে তাদের উৰ্দ্ধাংশ সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন। নিম্নাঙ্গে যদিও একখণ্ড কাপড় আছে, কিন্তু তাও এতোটাই পাতলা যে, শরীরের পশমগুলো পর্যন্ত দিব্যি দূর থেকে বোঝ যাচ্ছে।
