ইমাম সাহেব লোক দুটিকে উঠতে বললেন। ইমাম সাহেবের কথায় তারা উঠলো বটে; কিন্তু একজন হাত জোড় করে ভিখারীর মতো করে বললো
“আমরা আপনাদের গোলাম। আপনারা মুসলমান। আমরা আপনাদের ধর্ম গ্রহণ করেছি।”
ইমাম সাহেব এদেরকে তাদের গন্তব্যের কথা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা ঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছি তো?”
“না, আপনারা পথ ভুল করেছেন। বললো একজন। আমরা বহুদূর থেকে আপনাদের দেখে এসেছি। আমরা অবাক হচ্ছি, এ পথ দিয়ে আপনারা কী করে জীবন নিয়ে ফিরে এলেন! আমরা তো এই এলাকাটিকে মৃত্যুপুরী বলে থাকি। বাঘের মতো হিংস্র জন্তুও এই অঞ্চলে আসে না। এই এলাকাটি সাপের এলাকা। আপনারা যে দিকে যাচ্ছেন, এ পথে প্রতিটি গাছের ডালে ডালে একেকটি সাপকে ঝুলে থাকতে দেখবেন। আপনারা এ পথ ছেড়ে অন্য পথে চলুন। বলেই সে রাস্তার কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু এ পথটি খুবই জটিল। ঘন ঘন মোড় নিতে হবে। এ পথে গেলে বারবার আপনাদের পথ হারানোর আশঙ্কা আছে। এজন্য আমরা আপনাদের সাথেই যাচ্ছি।
“ইমাম সাহেব পথিকের বক্তব্য সারওয়াগকে জানালে সারওয়াগ ওদেরকে সাথে নিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। আরো বললেন, এরা আমাদের পথ দেখিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিলে এ কাজের জন্য আমরা তাদেরকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবো।”
“আগন্তুক দুই অশ্বারোহী সারওয়াগের কাফেলার গাইডের দায়িত্ব পেল।
চলতে চলতে সারওয়াগ ইমাম সাহেবের মাধ্যমে গাইডদের কাছে জানতে চাইলেন, তোমরা কি এই এলাকার বিস্ময়কর ঘটনাবলী সম্পর্কে কিছু জান?
জবাবে তারা বললো, “আমরা তো সেই জায়গা থেকেই পালিয়ে এসেছি। আমরা ভয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ এলাকা ছেড়ে এদিকে এসে পড়েছি।” জবাব দিলো। তাদের একজন।
“তোমরা কি কোন পাহাড় থেকে আগুন বেরোতে দেখেছো?”
“আমরা অনেক দূরে থাকি। আমরা সরাসরি আগুন দেখিনি। তবে অনেক দূর থেকে আগুনের শিখা দেখেছি। মনে হচ্ছিল যেন আসমান জ্বলছে। আমরা রাতের বেলায় আসমানে বিজলী চমকাতেও দেখেছি।… আমরা এমন আওয়াজও শুনেছি… কেউ নিজেদের বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করো না…। বললো সেই লোক।
“তোমরাও কি বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছো?”
“জি হ্যাঁ। আমরা ইসলামকে সত্যধর্ম বলে বিশ্বাস করি। এজন্য আমরা ওখান থেকে চলে এসেছি। আমরা আপনাদের ধর্ম কিছুতেই ত্যাগ করবো না।”
“গাইড দুজনই একের পর এক সেইসব ঘটনা আরো ভয়াবহ রূপ দিয়ে সারওয়াগকে জানাল, যে ঘটনা সারওয়াগকে ইমাম ও সংবাদবাহী সিপাহী শুনিয়েছিল। এদের দু’জনই তাদের কথাবার্তায় আতঙ্কিত ভাব ফুটিয়ে তুলেছিল। ইমাম সাহেব ও সারওয়াগ তাদের অভয় দিচ্ছিলেন, এতো আতঙ্কের কিছু নেই। তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। গাইড দুজন অনুগত দাসের মতো কাফেলাকে পথ দেখিয়ে আগে আগে যাচ্ছিল।
দক্ষিণ কাশ্মীরে দেওকোট নামের একটি জনবসতি। দেবদারু আর চিলি কাঠের তৈরী বিশ-পঁচিশটি বাড়ি নিয়ে দেওকোট গ্রাম। গ্রামের সকল অধিবাসীই হিন্দু। এ গ্রামে দেবদারু কাঠের একটি ছোট্ট মন্দিরও আছে। মন্দিরের অনতিদূরে গযনী বাহিনীর একটি ছোট্ট চৌকি। চৌকিতে প্রায় জনাত্রিশেক সৈনিকের অবস্থান। আজমীর নামের এক লোক এই ছোট্ট সেনাচৌকির কমান্ডার। আজমীর মুলতানের অধিবাসী। এক সময় আজমীর ছিল কারামতী সম্প্রদায়ের লোক। মুলতান দখল করে সুলতান মাহমূদ যখন কারামতীদের ধর্মীয় ভণ্ডামীর মুখোশ উন্মোচন করে দেন, তখন বহু কারামতী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুন্নী মুসলমানে দীক্ষা নেয়। আজমীর ছিল সেই কারামতীদেরই একজন।
কমান্ডার আজমীর একদিন নিয়মিত সেনাটহলের উদ্দেশ্যে সাথীদের নিয়ে গ্রামে টহল দিচ্ছিল। সুলতান মাহমূদের নির্দেশে সেই গ্রামের মন্দিরটি অপসারণ করে মসজিদ তৈরী করা হয়েছিল। মসজিদে একজন ইমামও নিযুক্ত করা হয়েছিল। ইমাম সেখানকার অধিবাসীদের কুরআন-হাদীস শিক্ষা দিতেন এবং লোকজনকে ইসলামের ইবাদত-বন্দেগীর রীতি-পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন। এ গ্রামের লোকজনও ছিল অদ্ভুত ঘটনায় আতঙ্কিত। কারণ, তারাও গ্রামের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আগুন জ্বলতে দেখেছিল এবং রাতের বেলায় বিজলীর আলোয় আকাশ উদ্ভাসিত হতে দেখেছিল।
এক রাতে এমনই বিজলী চমকানোর সময় ইমাম সাহেব ঘর থেকে বাইরে গেলে তিনজন বিবস্ত্র নারীকে দেখতে পান। তখন ছিল তীব্র বাতাস। বাতাসে বিবস্ত্র তরুণীদের চুলগুলো উড়ে তাদের চেহারা ঢেকে দিচ্ছিল। তরুণীরা সেই পাহাড়ের ঢালে দাঁড়ানো ছিল। রাত ছিল অন্ধকার। বিপরীত পাহাড় থেকে আলো দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। সেই আলাতে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীদের। ঘটনাক্রমে ইমাম সাহেব সেদিন ঠিক এ সময়ে ঘরের বাইরে এসেছিলেন। তিনি দেখলেন, কিছুক্ষণ জ্যোতি ছড়িয়ে পাহাড়ী আলো বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর আবার একই জায়গা থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছে আলোক রশ্মি । কিন্তু পরে আর তরুণীদের সেখানে দেখা যায়নি।
পরদিন ইমাম সাহেব চৌকিতে গিয়ে কমান্ডার আজমীরকে গতরাতে তার দেখা দৃশ্যের কথা জানালেন। ইমাম সাহেব আজমীরকে জানালেন, গ্রামের লোকজন বলাবলি করছে, ইসলাম যদি সত্য ধর্মই হয়ে থাকে, তাহলে ইমাম সাহেব তাদেরকে অবশ্যই এ ধরনের অলৌকিক কোন কিছু দেখাবে। গ্রামের লোকেরা আরো বলাবলি করছে, ধর্মচ্যুতির কারণে তাদের উপর মুসিবত ধেয়ে আসছে। এজন্য তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে।
