সবাই যখন ঘোড়ার খোঁজে টিলার আড়ালে হারিয়ে গেল, ঠিক এই সময়ে টিলার আড়াল থেকে অকুস্থলে দু’জন লোকের আগমন ঘটল। সাপটি তখনও ধীরে ধীরে ঘাসের উপর গড়াগড়ি করছে। এদের একজন এসে সাপটিকে একটু আড়ালে নিয়ে একটি থলের মধ্যে ভরে থলের মুখ বন্ধ করে ঘোড়ার জিনের সাথে থলেটি বেধে ফেলল। সেখানে আরো একটি ঘোড়া দাঁড়ানো ছিল।
সাপ পাকড়াওকারী লোকটি একটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে অপর গোড়াটির জীন ধরে বিপরীত দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর তার সাথীও এসে অপর ঘোড়াটিতে সওয়ার হল। ধীরে ধীরে উভয়েই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল।
সেদিন সারওয়াগের কাফেলার পুরো সময় ঘোড়া ও রসদবাহী খচ্চর ধরার পেছনেই কেটে গেল। হঠাৎ আগমনকারী দু’জনের একজন অপরজনকে বলল
“সামনে চল, এরা ফিরে যাবে না।”
“ফিরে যেতেও পারে। তবে এদের উপর নজর রাখতে হবে।” বলল অপরজন।
দিনের শেষ প্রহরে সারওয়াগের ছোট্ট কাফেলার অর্ধেক সওয়ার ও অর্ধেক পায়ে হেঁটে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। বহু চেষ্টার পর তারা তিন চারটি ঘোড়া আর মালবাহী দুটি খচ্চর ও উটকে ধরতে পেরেছিল। সারওয়াগ দৃঢ়চেতা সেনাধ্যক্ষ। কোন বাধাই তাকে লক্ষচ্যুত করতে পারে না। তিনি কাফেলার সাথীদের বললেন, পায়ে হেঁটে যারই ক্লান্তি লাগে সওয়ার হবে। আমি এখন থেকে হেঁটেই যাবো। হিন্দুস্তানের এসব নাগ আমাদের মিশন ভণ্ডুল করে দিতে পারবে না।
এ পর্যায়ে তারা পাহাড়ী এলাকায় এসে পৌঁছলো। একদিকে বিশাল পাহাড়, আর একদিকে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের ঢাল। একটু পরপরই তাদের পথ মোড় নিচ্ছিল। কখনও তাদেরকে দু’পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করতে হচ্ছিল। তারা যতোই সামনে অগ্রসর হচ্ছিল, শীতের প্রকোপ ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কনকনে শীতের বাতাস। অবশ্য জায়গাটি এমন যে, পানাহার সামগ্রী সাথে না থাকলেও তাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মরতে হতো না। জায়গাটিতে প্রচুর পানি আছে। জায়গায় জায়গায় পাহাড়ী ঝরনা বেয়ে স্ফটিকস্বচ্ছ পানি নিচে পড়ছে। নানা ধরনের ফলজ গাছে বাহারী ফল ঝুলছে। যে কয়টি জন্তু তাদের সাথে ছিল, এদের খাবারের অভাব ছিল না। এলাকাটি পশুর খাবার উপযোগী সবুজ ঘাসে ভরা।
এমন জায়গায় এসেই তাদের রাত হয়ে গেল। একটি পাহাড়ের ঢালে রাতের বিশ্রামের জন্য তাঁবু ফেলল তারা। রাতের বেশীর ভাগ সময় কাটলো এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাবার্তায়। তাদের তাঁবুর পাশেই বাধা ছিল জন্তু কয়টি। সকাল বেলায় আবারো রওনা হওয়ার জন্য ঘোড়ায় জীন আটকানো হলো এবং কাফেলা এগোতে শুরু করল।
অন্যদেরকে সওয়ার করে কাফেলার সরদার সারওয়াগ হেঁটেই অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি ইমাম সাহেবকে একটি ঘোড়ায় সওয়ার করালেন। দলনেতা পায়ে হেঁটে রওনা হওয়ায় সারওয়াগের নিরাপত্তা রক্ষীরাও পায়ে হেঁটেই যাচ্ছিল। হঠাৎ ইমাম সাহেবের ঘোড়া এদিক ওদিক লাফালাফি শুরু করল। যারা ঘোড়ায় চড়ে অভ্যস্ত, তারা ঘোড়ার এসব আচরণের অর্থ জানে। ঘোড়ার অবস্থা দেখে সারওয়াগ ইমামকে বললেন, জলদী ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে পড়ুন! ইমাম সাহেব ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘোড়াটি তীব্র হ্রেষাব করে ছুটে পালাল। সাথে সাথে অন্য ঘোড়াগুলোও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে হ্রেষাব করতে লাগল।
হঠাৎ একজন বলে উঠল, সাপ! সাপ! এবার একই রং ও একই মাপের দু’টি সাপকে দেখা গেল। সবগুলো ঘোড়া নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে লাগাম ছিঁড়ে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। সবাই ঘোড়া ধরতে পিছু পিছু দৌড়াল। কারো আর সাপ মারার খেয়াল হলো না। দু’টি ঘোড়া পাহাড়ের ঢালু জায়গায় দৌড়াতে গিয়ে পা পিছলে নিচে প্রবাহমান ঝিলম নদীতে পড়ে গেল। সারওয়াগের দুই সৈনিক পাহাড়ের উঁচু ঢালু থেকে দেখল তাদের অতি জরুরী সফরসঙ্গী দুটি ঘোড়া আতঙ্কিত হয়ে পালাতে গিয়ে পাহাড়ে পা পিছলে নদীতে পড়ে গেছে আর স্রোতস্বীনী ঝিলমের তীব্র স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। নদী থেকে ঘোড়া দুটোর তীরে উঠে আসার কোন অবকাশই ছিল না।
পাহাড়ের ঢালে রাতযাপনকারী সারওয়াগের কাফেলা সকালবেলায় রওনা হওয়ার সময় যখন অবশিষ্ট সওয়ারী ঘোড়া দুটোকেও হারিয়ে বিষণ্ণমনে সেখান থেকে রওনা হয়ে গেল, কিছুক্ষণ পর ফেলে যাওয়া সেই জায়গাটিতে এলো সারওয়াগের কাফেলাকে আড়াল থেকে অনুসরণকারী দুই অশ্বারোহী। এরা এসে ঘাসের উপরে গড়াগড়িরত অবস্থায় সাপ দুটোকে ধরে থলের মধ্যে আটকিয়ে তাদের একটি ঘোড়ার জীনের সাথে সাপভর্তি থলেটি ঝুলিয়ে দিল।
কি সব অদ্ভুত ব্যাপার সম্মানিত সেনাপতি। এই এলাকা দিয়েই তো আমি দু-তিন দিন আগে এই সৈনিককে নিয়ে আপনার কাছে পৌঁছেছি। তখন তো কোন সাপ আমার নজরে পড়েনি! এখন শীতের সময়। শীতের সময় সাধারণত সাপ গর্তে থাকে। সাপ শীত সহ্য করতে পারে না।
“ভেবে দেখুন ইমাম সাহেব! মনে হয় আমরা আসল গথ ভুলে অন্য পথে এসে পড়েছি। দেখুন না কোন জনবসতি কি চোখে পড়ছে? এমন জনমানবহীন এলাকায় রাস্তা ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ইমাম সাহেবের উদ্দেশে বললেন সেনাপতি সারওয়াগ।
সেনাপতি সারওয়াগের মনোবল এখনও চাঙ্গা। তিনি পায়ে হেঁটেই কাফেলাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সবাইকে পায়ে হেঁটে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার জন্য উজ্জীবিত করছিলেন। সারওয়াগের প্রবল ধারণা জন্মালো, ইমাম সাহেব হয়তো আসল রাস্তা ভুলে অন্যপথে কাফেলাকে নিয়ে যাচ্ছেন। চলতে চলতে সন্ধ্যার আগে পথের একটি মোড়ে তারা দুজন অশ্বারোহীকে দেখতে পেল। অশ্বারোহী দু’জন তাদের কাছাকাছি এসে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল এবং রাস্তার কিনারায় দু’হাত জোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সারওয়াগ তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, উভয়েই মাথা নিচু করে সারওয়াগকে কুর্নিশ করল। সারওয়াগ ইমাম সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনি এদের ভাষা বোঝেন, এদের তুলুন এবং এদের কাছ থেকে পথের কথা জিজ্ঞেস করে নিন।
