“হ্যাঁ, মানুষের সৃষ্টিগত দুর্বলতাগুলোতে কাজে লাগাতে হবে।” উজিরের কথাকে সমর্থন করলেন প্রধান পুরোহিত। প্রেম ও ভয় সকল মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান এবং এটি একটি প্রকৃতিপ্রদত্ত ও দুর্বলতা। ভালোবাসা ও প্রেমের আহ্বান মিথ্যা হলেও যে কোন মানুষের পক্ষেই তা তাৎক্ষণিক প্রত্যখ্যান করা কঠিন। মুসলিম সৈন্যদেরকে প্রেমের বিষ পান করিয়ে বিগড়ে দাও, তাহলে ইসলামের প্রচারক আর নওমুসলিম সবাই তোমাদের এই জালে আটকে যাবে।
রাজনৈতিক সমাধানের পথে যখন কোন ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ছাড়াই বৈঠক ভেঙে যেতে উপক্রম হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধান পুরোহিতের চানক্য কৌশল সবাইকে আশ্বস্ত ও ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করল। এটা ছিল এমন প্রস্তাব যাতে সবাই একমত পোষণ করল এবং এ প্রক্রিয়া জোরদার করার তাগিদ অনুভব করল।
১০১৪ সনের শেষের দিনগুলোতে দক্ষিণ কাশ্মীরে বিজিত এলাকাগুলোতে ইসলাম গ্রহণকারী হিন্দু নওমুসলিমদের বিভ্রান্ত এবং মুসলিম সৈন্যদেরকে বেকার করে দেয়ার জন্য শুরু হলো হিন্দু যোগী-সন্ন্যাসী ও পুরোহিতদের যাদু-টোনার আগ্রাসন। বলতে গেলে তখন হিন্দু পুরোহিতদের রাজত্ব ছিলো গোটা ভারত জুড়ে। যেসব গ্রামে কোন অস্বাভাবিক ঘটনার দৃশ্য কেউ দেখেনি, সেসব গ্রামে বাতাসে ভর করে প্রচারিত হচ্ছিলো যতোসব ভীতিকর কাহিনী। গুজবের পাল্লা এতোটাই ভারী ছিলো যে, অমুক গ্রামে পাহাড় থেকে আগুন বের হচ্ছে, মেঘবৃষ্টিহীন আকাশে বিজলী চমকাচ্ছে, অমুক গ্রামে পথচারীদের পথ আটকে দিয়েছে সুন্দর প্রেতাত্মা। লোকমুখে এসব কাহিনী শুনেই মানুষের অন্তরাত্মা ভয়ে কেঁপে উঠতো। ভয় এক সময় পরিণত হতে সামাজিক আতঙ্কে। এমন গুজবও প্রচার পেয়েছিলো যে, গয়নী বাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে জবাই করে মাংস খেয়ে ফেলছে।
সুলতান মাহমূদের সেনাচৌকির কমান্ডার যুবায়ের জামালীর মাটিতে ধসে যাওয়ার কাহিনী ছিল মারাত্মক ভয়ঙ্কর। এই ভয়ঙ্কর সংবাদটি সারওয়াগকে অবহিত করা জরুরী ছিল। কারণ, সারওয়াগ ছিলেন কালার অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রশাসক। সকল ছোট ছোট সেনাচৌকি ছিলো তার অধীনে। ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এক সৈনিক ও একজন ইমাম আঞ্চলিক কমান্ডার সারওয়াগকে ব্যাপারটি সম্পর্কে অবহিত করতে দ্রুত আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার টিলাযুগিয়ায় পৌঁছায়। টিলাযুগিয়ায় ছিলো তখনকার আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার ও কমান্ডার সারওয়াগের অবস্থান। সারওয়াগ বিষয়টি জানার পর তিনি সাথে সাথেই সংবাদদাতাদের নিয়ে কালাঞ্জর রওনা হন।
সেনাকমান্ডার সারওয়াগের সাথে তার কয়েকজন দেহরক্ষী ছিল। সেই সাথে তাদের আসবাবপত্র ও রসদ বহন করার জন্য কয়েকটি খচ্চর ও উট কাফেলার সাথী হলো। তাদের কাফেলার আগে আগে দু’জন অশ্বারোহী পথিক যাচ্ছিল। তাদের বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সাধারণ কোন মুসাফির। অশ্বারোহী মুসাফির দু’জন সারওয়াগের কাফেলাকে দেখে আগে আগেই যাচ্ছিল।
ইমাম ও সংবাদবাহী সৈনিক যখন কালার থেকে সংবাদ নিয়ে টিলাযুগীয়াতে আসছিলেন, তখন তাদের পক্ষে দেখার অবকাশ হয়নি, এই দুই অশ্বারোহী তাদেরকেই অনুসরণ করে পিছু পিছু আসছিল। ইমাম ও সংবাদবাহী সৈনিক যখন বালনাথে প্রবেশ করেছিল, তখন অশ্বারোহীরা কোথায় যেন চলে গিয়েছিলো। এখন সারওয়াগ সিপাহী এবং ইমামকে নিয়ে যখন কালারের দিকে রওনা হলেন, তখন এরা তাদের আগে আগে চলতে শুরু করল।
সারওয়াগের কোন গাইডের দরকার ছিল না। কারণ, ইমাম ও সংবাদবাহী সৈনিক রাস্তা সম্পর্কে অবহিত ছিল। কাফেলা সাধারণ গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল। পাহাড়ী পাথুরে জমিন, ঘাসের বিছানা, উঁচু-নিচু টিলা তাদের পিছনে থেকে যাচ্ছিল। কাশ্মীরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া তারা দেখতে পাচ্ছিলেন। ইমাম সেনাপতি সারওয়াগকে বলছিলেন, ওই যে বরফ ঢাকা উঁচু পাহাড়টি দেখা যাচ্ছে, এটির পাদদেশে যে বসতি এলাকাটি রয়েছে, এটি এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং সেখানকার অধিবাসীদের সৌন্দর্য সারা ভারতে প্রবাদতুল্য।
উঁচু-নিচু টিলাময় পাহাড়ী এলাকায় যখন এই কাফেলা পৌঁছলো, তখন রাত হয়ে গেছে। বিরতিহীনভাবে তারা রাতেও কিছু পথ এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। কিছুপথ অগ্রসর হয়ে বিশ্রামের জন্য কাফেলা যাত্রা বিরতি করল। তখন ছিল হাল্কা ঠাণ্ডার সময়। পরদিন দিনের বেলা যখন কাফেলা রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন হঠাৎ একটি ঘোড়া খুব জোরে হ্রেষারব করে লাগাম ছিঁড়ে পালিয়ে গেলো। এটি ছিল একজন নিরাপত্তারক্ষীর ঘোড়া। আরোহী তখনও ঘোড়ার পিঠে বসতে পারেনি, এর আগেই অজানা আতঙ্কে চম্পট দিল ঘোড়া।
সবাই দেখতে পেল তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট লম্বা একটি সাপ ঘাসের উপর গড়াচ্ছে। জায়গাটি ছিল ঘন সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। ছোট ছোট আগাছা জাতীয় গাছে থোকা থোকা ফুল ফুটে রয়েছে। প্রকৃতি যেন পরিকল্পিতভাবে জায়গাটিকে রং-বেরঙের বৃক্ষাদি লাগিয়ে অপরূপ সাজে সাজিয়েছে। ছোট ছোট টিলা আর উঁচু-নিচু খানা-খন্দকের মাঝে মাঝে সমতল জমিন। এ যেন কোন দক্ষ ভাস্কর্যের তৈরী মনোরম মনোসেন্ট।
সাপ দেখে সামান ও খাদ্যসামগ্রী বোঝাই উট ও ঘোড়া ছুটে পালাল। ঘোড়া ও খচ্চরগুলোকে পালাতে দেখে সবাই ওগুলোকে ধরতে পিছু পিছু দৌড়াল, সাপ মারার অবকাশ কারো হলো না। জায়গাটি এমন যে, ঘোড়া আর খচ্চর সামানপত্র নিয়ে কোথায় পালিয়েছে আন্দাজ করাই কঠিন। সাপের ভয়ে পালানো কোন জন্তুকে আয়ত্ত্বে আনা কঠিন।
