প্রধান পুরোহিতের একথায় রাজা-মহারাজাদের মজলিসে নেমে এলো নীরবতা। পুরোহিত এই নীরবতা দেখে সবার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে জলদগম্ভীর কণ্ঠে বললেন–
“হিন্দুস্তান হিন্দুদের দেশ, দেবদেবীদের দেশ। এটা আল্লাহু আকবার এর দেশ নয়। এটা হরেকৃষ্ণ হরিহরি মহাদেব এর দেশ। কিন্তু দেবদেবীদের দেশ হলে কি হবে, এদেশে এখন দেবদেবীদের কী ধরনের অবমাননা করা হচ্ছে, তা আপনারা দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন। এই ধরিত্রী চিৎকার করে বলছে, সে তার উপরে বিচরণকারী এক মুসলমানের বোঝাও সহ্য করতে পারে না। আপনারা যদি ধরিত্রীর এই চিৎকার শুনতে না পান, অনুধাবন না করেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত বংশধর ও নতুন প্রজন্ম মুসলমানদের গোলামে পরিণত হবে এবং শ্রীকৃষ্ণের বাঁশী চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যত প্রজন্ম ও অনাগত বংশধরদেরকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে হবে।
আপনারা স্মরণ করুন, আমাদের পূর্বপুরুষরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের রোপিত ইসলামের বৃক্ষটিকে হিন্দুস্তান থেকে কিভাবে উপড়ে ফেলতে সক্ষম এ হয়েছিল। অথচ সেই বৃক্ষ কিন্তু মহিরুহে পরিণত হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত আর অশোকের এই দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল বিন কাসিমের রোপিত ইসলামের শিকড়; কিন্তু আমাদের মহান পণ্ডিত ও ঋষিগণ হৃদয়ে ধর্মের জপমালা নিয়ে ভগবানের নামে অসীম সাহসিকতা ও কৌশলের মাধ্যমে হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে পড়া আযানের ধ্বনিকে মিটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
যে পাপের শাস্তি আপনাদের প্রত্যেকেই ভোগ করতে হচ্ছে, তাহলে আপনারা সবাই সুলতান মাহমূদের এই যুদ্ধকে রাজ্যপাটের বিরুদ্ধে আক্রমণ মনে করছেন। এই ভুল ধারণা আপনাদের ত্যাগ করতে হবে। আপনাদের বুঝতে হবে, এই যুদ্ধ দুটি শাসকগোষ্ঠীর লড়াই নয়, এই যুদ্ধ দুটি ধর্মের লড়াই। দুই ধর্ম ও বিশ্বাসের এই লড়াইয়ে ক্রমাগভাবে ইসলাম বিজয়ী হচ্ছে। মহারাজা ভীমপালের শুধু পরাজয় ঘটেনি। এখানে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় ঘটেছে। পরাজয় ঘটেছে দেবদেবী ও ভগবানে বিশ্বাসীদের। কালাঞ্জরের গোটা এলাকায় হাজারো মৌলভী ও ইমামদের ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রামে গ্রামে তৈরী করা হয়েছে মসজিদ। ইসলাম যদি এসব মানুষের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে পড়ে, তবে আর কোনদিন কারো পক্ষেই এদেশ থেকে ইসলামকে বিতাড়িত করা সম্ভব হবে না।
“মাননীয় পণ্ডিত, এসব কথা আমাদের জন্য নতুন নয়, বললেন ভীমপাল। এখন আমাদের ভাবা উচিত, কালাঞ্জরের এলাকায় যেভাবে ইসলামের বীজ বপন করা হচ্ছে, তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করা। আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, আমি যুদ্ধে সুলতান মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়েছি, আমার সেনাবাহিনীও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। আমাদের আবারো চেষ্টা করতে হবে। একটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজার সহযোগিতা দরকার।”
“আপনি পরাজয় স্বীকার করেছেন। এটাও আপনাকে মেনে নিতে হবে যে, ভবিষ্যতেও আপনি আরো পরাজয়ের সম্মুখীন হবেন।” বললেন পুরোহিত। এবারের যুদ্ধে যদি চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনা না যায়, তবে প্রস্তুতির জন্য সময় নষ্ট করা হবে নিতান্তই সময়ের অপচয়। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কালা রে যেভাবে সাধারণ প্রজাদের মুসলমান বানানো হয়েছে এবং তাদের হৃদয়ে ইসলামকে বদ্ধমূল করার চেষ্টা চলছে, তা প্রতিহত করা।”
“কী করবেন? এখন তো আর আপনার পক্ষে সেখানে গিয়ে ধর্মপ্রচার করা সম্ভব নয়।” পুরোহিতের উদ্দেশে বললেন কালাঞ্জরের রাজা নন্দরায়। কেননা, মাহমূদের সৈন্যরা সেখানে চৌকি স্থাপন করে শাসনকার্য চালাচ্ছে। মুসলিম
সৈন্যরা রাত-দিন টহল দেয়। আমি শুনেছি, মাহমূদ নাকি নির্দেশ দিয়েছে, কাউকে যদি হিন্দুধর্ম প্রচার করতে পাও, তবে তাকে সেখানেই হত্যা করবে। কালাঞ্জরে আমার দুর্গ ছাড়া আর কোথাও এখন আর হিন্দুধর্মের পূজা-অর্চনা নেই। দুর্গের বাইরে সবখানেই ইসলাম ধর্মের চর্চা, ইসলাম ধর্মের আলোচনা। আপনি যে সব ইসলাম প্রচারক ও ইসলামের কথা বলেছেন, তারা পুরোমাত্রায় মুসলিম সৈন্যদের সহযোগিতা পাচ্ছে।”
তরবারী দিয়ে সব কাজ হয় না বললেন রাজা ভীমপালের প্রধান উজির। “যাদু চালাও। ওরা যদি শক্তির জোরে মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে থাকে, আমরা তরবারীর শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই আবার এসব লোককে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে পারি। আমরা এসব লোকের মনে ইসলাম সম্পর্কে সংশয়-সন্দেহ জন্মাতে পারি। এসব বিষয়ে যারা অভিজ্ঞ, তাদের ডাকা হোক, তাদেরকে একাজ চালানোর ব্যবস্থা করা হোক। কালারের মাটি, মানুষ, ভূপ্রকৃতি, সুবিধাবাদী যাদুটোনার কারিশমা প্রদর্শনের জন্য খুবই উপযোগী। কালাঞ্জরের লোকদের মনে ভয়ানক আতঙ্ক সৃষ্টি করুন এবং অস্বাভাবিক দৃশ্যের অবতারণা করুন। যে অল্পসংখ্যক সৈন্য সুলতান মাহমূদ রেখে গেছে, তাদের মনেও আতঙ্ক সৃষ্টি করুন, সেই সাথে ওদেরকে রূপসৌন্দর্য ভোগবাদের ফাঁদে ফেলে বেকার করে দিন। গোপন ও অদৃশ্য কর্মকাণ্ডের দ্বারা যদি আমরা মুসলমানদের মোকাবেলায় এখনই কার্যক্রম শুরু না করি, তাহলে মুসলমানদের ঈমানী শক্তি বেড়ে যাবে, তখন ওদের মোকাবেলা করা আমাদের জন্য আরো কঠিন হবে।”
