সুলতান বললেন, কাশ্মীরের লোকজন গোয়াড় ও অশিক্ষিত। এরা শাসকদের যে কোন নির্দেশকেই ধর্মীয় নির্দেশের মতো অলঙ্নীয় মনে করে। এদের রাজা মহারাজার ইচ্ছা অনিচ্ছাই এদের ধর্ম। আমি এদের একথা বোঝাতে চাই যে, ধর্মের বিধি-নিষেধের সম্পর্কে কোন শাসক কিংবা রাজা-মহারাজাদের সাথে নয়। ধর্মের সম্পর্ক একান্তই আল্লাহর সাথে। আর আল্লাহ বা মাবুদকে মাটি-পাথর দিয়ে বানানো যায় না। এই এলাকায় যদি কিছু মসজিদ তৈরী করে দেয়া যায়, তাহলে সেখানে উঁচু নীচু শাসক শাসিত একই সারিতে নামায পড়লে তারা বুঝতে পারতো, ইসলাম ধর্ম শ্রেণী বৈষম্য হিসেবে সবাই এক। রাজা হোক প্রজা হোক, শাসক হোক, কিংবা শাসিত, সবার মাথা-ই একসাথে একই মাটিতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদায় অবনত হয়।
খ্যাতিমান অমুসলিম ঐতিহাসিক স্যার আর্লিস্টিন এর ভাষায় সুলতান মাহমূদ বলেছিলেন, যদি বিজিত এলাকার গণমানুষের কাছে ইসলামের মহত্ত্ব কল্যাণকামিতা বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা না হয়, তাহলে গণমানুষের মধ্যে এই ভুল ধারণা সৃষ্টি হবে যে, সুলতান বলেন এক আর করেন আরেক, যা সুলতানের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি ও ক্ষমতা সংহত করার জন্য সহায়ক, তা-ই তিনি করেন। ফলে নতুন মুসলমানরা ধর্ম থেকে নিরুৎসাহিত হয়ে ধর্মচ্যুত হয়ে যেতে পারে। আমার সালাতানাতের মধ্যে কোন মুসলমানের ধর্মচ্যুতিকে আমি বরদাশত করবো না। সাধারণ মানুষকে এটা বুঝিয়ে দিতে হবে তাদের প্রভু কে, তাদের রাসূল (সা.)-কে এবং তাদের ধর্মের বিধি-নিষেধ কী?
মহারাজা নন্দরায়ের শাসনকার্য দুটি দুর্গের ভেতরে বন্দী হয়ে পড়েছিল। আর দুর্গের বাইরে বিজিত রাজ্যে সুলতান মাহমূদ আল্লাহর নির্দেশ মতো আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নওমুসলিমদের ধর্ম শিক্ষা দেয়ার জন্য পেশোয়ার, লাহোর, মুলতান ও বেরা থেকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত বহুসংখ্যক লোক এনে নতুন এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষা ও ইমামতি করার জন্য ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কাশ্মীর এলাকায় তৈরী করা হয়েছিল বহু মসজিদ। প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কাঠ দিয়ে একটি করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
তৎকালে ভারতের এই এলাকাটির সাধারণ মানুষের ধর্ম বলতে তাদের রাজা-মহারাজাদের তোষণই ছিল প্রধান স্তম্ভ।
রাজা-মহারাজাদেরকেই এই এলাকার সাধারণ প্রজারা দেবতার জাগতিক প্রতিনিধি বলে বিশ্বাস করতো। আসলে এদের ধর্মবিশ্বাস ছিলো জীবনে বেঁচে থাকা আর পানাহার করার স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবরুদ্ধ, নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত এসব লোক যখন মুসলিম সৈন্যদেরকে বিজয়ী বেশে দেখতে পেল, প্রত্যক্ষ করলো মুসলমানদের সাম্য-মৈত্রী-মানবিকতা ও ভেদাভেদহীন নীতি, তখন স্বেচ্ছায়, বিনা প্ররোচনা ও বলপ্রয়োেগ ব্যতিরেকেই তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। এসব অজ্ঞ-অনভিজ্ঞ নাগরিকদের হৃদয়ে ইসলামের বোধ-বিশ্বাস মজবুত করার নির্দেশনা দিয়ে সুলতান মাহমূদ জরুরী প্রয়োজনে গযনীতে ফিরে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু পরাজিত হিন্দু রাজা-মহারাজাদের জন্য সুলতানের এই ইসলাম প্রচার আয়োজন ছিল রাজত্ব হারানোর চেয়েও আরো বেশী বেদনাদায়ক। ভীমপাল কোন সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় না নিয়ে দুর্গম গ্রামাঞ্চলে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। তাকে যখন জানানো হলো, সুলতান মাহমূদ ভারত ছেড়ে গয়নী চলে গেছেন, তখন রাজা ভীমপাল গোপন আশ্রয়স্থল থেকে বেরিয়ে দুর্গম পথে লাহোর পৌঁছলেন।
ভীমপালের লাহোর ফিরে আসার সংবাদ শুনে দীর্ঘদিন পর গোটা এলাকার রাজা-মহারাজারা এসে লাহোরে একত্রিত হলেন। শুধু রাজা-মহারাজারা নন, ভারতের বিভিন্ন খ্যাতিমান মন্দিরের খ্যাতিমান পুরোহিত পণ্ডিতগণ এসে হাজির হলেন।
ভীমপালের নেতৃত্বে এক বৈঠকে ভারতে ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি রোধের নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হলো। সকল পুরোহিত পণ্ডিত অব্যাহত ব্যর্থতা ও পরাজয়ের জন্য শামরিক শাসক ও নেতাদের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছিলেন। কোন কোন পুরোহিত সুলতান মাহমূদকে হত্যার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা পেশ করলেন। ক্ষীণ আওয়াজে এমনটিও উচ্চারিত হলো, সুলতান মাহমূদকে সিন্ধু নদের ওপারেই আটকে রাখতে হবে। পেশোয়ারে প্রবেশের সুযোগ দেয়া যাবে না। আর এখানে তার রেখে যাওয়া সৈন্যদেরকে ঘেরাও করে আহার-সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে ক্ষুৎপিপাসায় ধুকেধুকে মারার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু যে যতো যুৎসই প্রস্তাবই উত্থাপন করুক না কেন, রাজা-মহারাজা ও পুরোহিত-পণ্ডিতদের এই বৈঠকে স্থির কোন যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হলো না। অনেকটা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই শেষ হলো কনফারেন্স।
মূলত অনৈক্য ও সিদ্ধান্তহীনতার মূল কারণ ছিল প্রত্যেক রাজা-মহারাজা ও পুরোহিত পণ্ডিতের নিজ নিজ কর্তৃত্ব ও রাজত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা। এক পর্যায়ে লাহোরের প্রধান পুরোহিত কণ্ঠ চড়িয়ে বললেন, সবাই এখন মুসলমানদের ভয়ে আততি। অথচ সংখ্যায় কিন্তু মুসলমানরা সব সময়ই সামান্য। মুসলমানরা এতোটা দূর থেকে এখানে এসে যুদ্ধ করছে। এখানকার প্রতিজন মানুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই মুসলমানদের শত্রু। এখানকার মাটি-মানুষ সবই মুসলিম সৈন্যদের বৈরী। তারপরও মুসলমানরাই একের পর এক রাজ্য দখল করে নিচ্ছে। আমাদের সবাইকে এ বিষয়টি ভাবতে হবে। কেন এমন হচ্ছে? সুলতান মাহমূদ কি কোন দৈত্য? জিন? না দানব? আসলে সে আপনাদের মতোই একজন মানুষ। তথাপি আপনাদের সবাইকে পরাজিত করছে। এর প্রধান কারণ হলো সে তার ধর্মের অনুশাসন মেনে চলে, সে তার ধর্মের পূজারী, ধর্মের প্রতি সে নিবেদিত। ধর্মের প্রতি এই নিবেদিতপ্রাণ হওয়াকেই মুসলমানরা বলে ঈমান। ধর্মে নিষ্ঠাই তাদের বিজয়ের প্রধান শক্তি। ধর্মের প্রতি আপনাদের এতোটা নিষ্ঠা নেই। ধর্মের চেয়ে আপনারা নিজেদের ক্ষমতা, মর্যাদা ও রাজত্ব নিয়ে বেশী ব্যস্ত।
