“আমার জীবন নিয়ে আমার কোন ভয় নেই। আমার ভয় হচ্ছে, ইতোমধ্যে আমরা যেসব লোককে ইসলামে দীক্ষিত করেছি, তারা আবার ইসলাম থেকে পৌত্তলিকতায় ফিরে যাবে।” বললেন ইমাম।
ওখানকার অধিবাসীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তারা যেহেতু হিন্দুত্ব ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাই তাদের উপর দেবদেবীদের গযব আপতিত হচ্ছে। এজন্যই তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য আসমানী মাখলুক জমিনে নেমে এসেছে।”
চৌকির সৈন্যদের মধ্যেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, সুলতান এখানে ক্ষমতাবলে মানুষকে ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন, এজন্যই এসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে। বললো সৈনিক। কমান্ডার যুবায়ের জামালীর জমিনে দেবে যাওয়ার ঘটনাটি এমনই প্রভাব সৃষ্টি করেছে যে, যেই শোনে, তার চেহারাই বিবর্ণ হয়ে যায়। চৌকির সকল সৈন্যই এখন নানা সংশয় ও কুসংস্কারে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।”
“তোমাদের মধ্যে কি এমন সাহসী কেউ ছিল না যে কমান্ডার যে জায়গায় জমিনে দেরে গেছে, সেই জায়গাটিতে গিয়ে বিষয়টির কারণ অনুসন্ধান করবে? পাহাড়ী এলাকায় ঘাস ও ঝোঁপ ঝাড়ের মধ্যে অনেক গভীর গর্ত থাকে। তাছাড়া এমনটিও তো হতে পারে, ওখানে গর্ত তৈরী করে রাখা হয়েছে আর এই দুই তরুণী স্রেফ হিন্দু যোগী-সন্ন্যাসীদের যাদুর অংশ হিসেবেই এমন মোহময় আচরণ করেছে?
সম্মানিত ইমাম, আপনি কি ঈমানের শক্তি সম্পর্কে জ্ঞাত নন? আপনি কি জানেন না, ঈমান শক্তিশালী হলে তার উপর কোন যাদুটোনাই কার্যকর হতে পারে না?
দুর্গশাসকের এ কথায় ইমাম নীরব হয়ে গেলেন, সিপাহীর কণ্ঠেও আর কোন কথা উচ্চারিত হল না।
“ঠিক আছে, আমি আপনাদের সাথেই যাচ্ছি। এখানে সুলতান আমাকে শুধু শাসনকাজ চালানোর জন্য নয়, ইসলামের প্রচার-প্রসার ও ইসলামের পাহারাদার নিযুক্ত করেছেন। বললেন দুর্গশাসক সারওয়াগ।
এটা কোটলী কাশ্মীরের ঘটনা। দক্ষিণ কাশ্মীরের এই এলাকাটিতে তখন ছিল কোটলী রাজাদের রাজত্ব, যা পুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজুরী এলাকায় লোহা কোট নামের একটি সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। পাহাড়ের উপর অত্যন্ত মজবুত এই দুর্গ ছিল বহিরাক্রমণ থেকে অত্যন্ত সুরক্ষিত। সেই দুর্গের রাজা ছিল নন্দরায়। পাঞ্জাবের যে কোন রাজা যুদ্ধে পরাজিত হলে কোটলীর লোহাকোট দুর্গে গিয়ে আশ্রয় নিতো। কারণ, এই দুর্গটি ছিল অজেয় ও অস্বাভাবিক মজবুত। রাজা জয়পাল সুলতানের কাছে শেষবারের মতো পরাজিত হয়ে এই দুর্গেই এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জয়পালের ছেলে আনন্দপালও সুলতান মাহমূদের হাতে পরাজিত হয়ে এই দুর্গেই এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। রাজা ভীমপালকে টোল্লাযুগিয়া নামক স্থানে সুলতানের সৈন্যরা পরাজিত করার পর সেও কাশ্মীরের কোন অঞ্চলে এসেই আশ্রয় গ্রহণ করে।
পূর্বেই বলা হয়েছে, সুলতান মাহমূদ রাজা ভীমপালকে তাড়া করে কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। কাশ্মীরের রাজা নন্দরায়ের এক সেনাপতি তংগা সুলতান মাহমুদের প্রেরিত-অগ্রগামী দলকে ঘেরাও করে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ক্ষতির জন্য তংগাকেও চড়ামূল্য পরিশোধ করতে হয়। সুলতান নিজে তংগাকে তার দলবলসহ পাকড়াও করে যুদ্ধবন্দী করে ফেলেন। তংগার এই ক্ষয়ক্ষতিতে সুলতান এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তংগা ও তংগার সকল সহযোদ্ধাকে হত্যা করে তাদের মরদেহ ঝিলম নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এর পর বিজিত এলাকায় সুলতান ফরমান জারী করেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করবে না, তাদের গ্রাম ছাড়া করা হবে। ইসলাম গ্রহণ করলে তাদেরকে সকল নাগরিক সুবিধাসহ সরকারীভাবে তাদের ধন-জন ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা দেয়া হবে।
দুর্গ থেকে বাইরে এসে সুলতানের মোকাবেলা করার সাহস হয়নি রাজা নন্দরায়ের। তার সামরিক শক্তি অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সুলতান মাহমূদ নন্দরায়ের এলাকায় পৌঁছে রাজা নন্দরায়ের কাছে পয়গাম পাঠালেন, তিনি যেন রাজা ভীমপালের মতোই তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে খিরাজ দিতে স্বীকারোক্তিমূলক সন্ধিচুক্তি করেন। রাজা নন্দরায় সুলতানের বশ্যতা
স্বীকার করে নিয়ে তাকে খাজনা দিতে সম্মতি জানান। ফলে সুলতান ও রাজা নন্দরায়ের মধ্যে সন্ধিচুক্তি স্থাপিত হয়। চুক্তিতে শর্ত ছিল, নন্দরায়ের নিয়ন্ত্রিত যে কোন জায়গায় সুলতান ইচ্ছে মতো দু’তিনটি সেনাচৌকি স্থাপন করতে পারবেন এবং একজন শাসকের অধীনে গোটা এলাকার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রিত হবে। নাগরিক ট্যাক্স রাজা নন্দরায়ই আদায় করবেন। কিন্তু তিনি সুলতানের সৈন্যদের সার্বিক ব্যয় নির্বাহ করবেন এবং বার্ষিক একটি মোটা অংকের সম্মানী বিজয়ী সুলতানকে দিতে বাধ্য থাকবেন।
সুলতান মাহমূদ বিজিত এলাকার সকল সাধারণ মানুষকে ইসলামে দীক্ষা নেয়ার নির্দেশ জারী করেন। সেই সাথে এই নোটিশও জারী করেন, পেশোয়ার, লাহোর, মুলতান ও বেরায় ইসলাম শিক্ষা দেয়ার মতো পারদর্শী কয়েকশত শিক্ষককে যেন কাশ্মীর এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং এখানকার নওমুসলিমদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয়। এসব জরুরী নির্দেশনা দেয়ার পর কেন্দ্রের গোলযোগের খবর পেয়ে তিনি দ্রুত রাজধানী গযনীতে ফিরে যান।
একাধিক ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন, সুলতান মাহমুদ বলেছিলেন, কারো উপর কোন ধর্মমত চাপিয়ে দেয়া যায় না। আমি যদিও কাশ্মীরের সকল মানুষকেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছি, কিন্তু আমি অমুসলিমদের এই অভিযোগ প্রমাণ করতে চাই না যে, বিজিত রাজ্যের নাগরিকদের উপর সামরিক শক্তিবলে ইসলাম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
