ইমাম আরো বললেন, এসব কথা শুনে আমি তাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি, দেবদেবীদের কোন অস্তিত্ব নেই, এসব দেখে তোমাদের ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। তোমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করবে। কিন্তু বুঝতে পারলাম, আমার আশ্বাসবাণীতে তারা আশ্বস্ত হতে পারছে না। এই ঘটনার চার/পাঁচ দিন পর পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে চারজন লোক ভীত-বিহ্বল অবস্থায় আমাদের গ্রামে এলো। তারা এসে জানাল, তাদের গ্রাম সংলগ্ন একটি পাহাড় কেটে গেছে। ফাটা পাহাড় থেকে একটু পর পর আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। মাঝে মধ্যে ভেঙ্গে পড়ছে পাহাড়ের অংশবিশেষ। ভাঙ্গা পাহাড়ের আশপাশে অদ্ভুত আকৃতির মানুষের আনাগোনা তারা দেখতে পেয়েছে।
এসব ভীতিকর কাহিনী শুনে আমার গ্রামের লোকজন এতটাই ভীত হয়ে পড়ল যে, তারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে গেল। আমি যতই তাদের কিছু হবে না বলে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করি; কিন্তু তারা ততই ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমি গ্রামের মুরুব্বীদের বোঝাতে চেষ্টা করি, যা শোনা যাচ্ছে, এগুলো হিন্দু যোগী সন্ন্যাসীদের কারসাজী। এরা সাধারণ লোকজনকে ইসলাম গ্রহণ থেকে ফেরানোর জন্য এসব যাদুটোনা করছে।
সম্মানিত দুর্গশাসক! আমি যতই আশ্বাসবাণী শোনাই না কেন, কিছু ঘটনা আসলে এমনও ঘটেছে, যেগুলোর কোন ব্যাখ্যা নেই। কোন অবস্থাতেই এগুলোকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। যেমন ধরুন, রাতের বেলায় পরিষ্কার মেঘহীন আকাশে বিজলী চমকানোর বিষয়টি মানুষকে বোঝানো মুশকিল। মানুষকে কি বোঝাবো, আমার নিজের কাছেই এই বিষয়টির কোন ব্যাখ্যা নেই। তাছাড়া আরো এমন ঘটনাও ঘটেছে, এ সৈনিকের মুখে আপনি তা শুনুন।
“আমাদের সেনাচৌকির অবস্থান নদীর পাড়ে।” বললো সৈনিক। হঠাৎ এক রাতে আমরা নারীকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। একাধিক নারীর কান্নার আওয়াজ শুনে চৌকির কমান্ডার যুবায়ের সাহেব আমাকে এবং অপর একজন সিপাহীকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। যেদিক থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এসেছিল, আমরা সেদিকে অগ্রসর হলে আওয়াজ থেমে গেল। অপর দিক থেকে দু’জন পুরুষকে আমরা আসতে দেখলাম। কমান্ডার যুবায়ের জামালী তাদের জিজ্ঞেস করলেন, নারীকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ কোন দিক থেকে এসেছে? তারা জানালো, কোন নারীর কান্নার আওয়াজ তারা শোনেনি।
ঠিক সেই সময় নারীদের কান্নার আওয়াজ আবার শোনা গেল। কমান্ডার তখন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এই তো কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এই মহিলারা কারা? তারা বললো, কোথায়, আমরা তো কারো কান্নার আওয়াজই শুনছি না? আমরা বিস্মিত হলাম, যে আওয়াজ আমরা দিব্যি শুনতে পাচ্ছি, একই আওয়াজ অন্যেরা শুনতে পাচ্ছে না কেন?
সেই দুই ব্যক্তি আমাদের জানালো, এই এলাকায় মাঝে মধ্যে দুজন তরুণীকে দেখা যায়। যারাই দেখতে পায়, তাদেরকেই ওরা কাছে যেতে ডাকে, কিন্তু কাছে গেলে আর ওদের পাওয়া যায় না। তরুণীরা অদৃশ্য হয়ে যায় । লোক দু’জন আরো কিছু কথা বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু কমান্ডার জামালী আর কথা না বাড়িয়ে আমাদের নিয়ে চৌকিতে ফিরে এলেন। পরদিন সন্ধার পর যুবায়ের জামালী আমাকে ও অপর এক সাহসী সৈনিককে সাথে নিয়ে বের হয়ে বললেন, তিনি গতরাতের কান্নার রহস্য উদ্বাটন করতে চান। আমাদের চৌকির ধারে-কাছে কোন জনবসতি ছিল না। গোটা এলাকাটি ছিল খুবই সুন্দর। আমরা দুটি টিলাসম পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় একটি পাহাড়ের ঢালে আমরা দু’জন তরুণীকে দেখতে পেলাম। ওদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আসমানী রঙের এমন পাতলা কাপড় জড়ানো ছিল যে, ওদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তরুণীদ্বয়ের মাথা ছিল খোলা, তাদের চুলগুলো ছিল আজানু প্রলম্বিত। ওরা পরস্পর কথা বলছিল আর আমাদেরকে ইশারায় কাছে যেতে আহ্বান করছিল। ওরা যেখানটায় দাঁড়ানো ছিল, সেই জায়গাটি ছিল অসম্ভব সুন্দর। চারদিকে ঘন ঘাস আর বাহারী রঙের লতাগুল্ম ও সুশোভিত ফুলগাছের ঝোঁপঝাড়। জায়গাটি ঘন গাছ গাছালীতে ভরা ছিল। গাছের ডালপালা পরস্পর মিলেমিশে পুরো জায়গাটায় ছাতার মতো আচ্ছাদন তৈরী করেছে। সূর্যের আলো ঘনগাছের পত্রপল্লব ভেদ করে মাটিতে পৌঁছাতে পারতো না। দাঁড়ানো দু’জনকে মনে হচ্ছিল এই প্রাকৃতিক পরিবেশেরই যেন অংশ। দুই তরুণীকে দাঁড়ানো দেখে আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। তরুণীদ্বয় তাদের অবস্থানেই দাঁড়িয়ে রইল। কমান্ডার যুবায়ের জামালী বললেন, তিনি সামনে এগিয়ে যাবেন। আমরা তাকে বাধা দিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের বাধা মানলেন না। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম. তরুণী দু’জনের একজন হাতের ইশরায় যুবায়ের জামালীকে কাছে ডাকল। আমাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কমান্ডার এগিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি তরুণীদের কাছে যাওয়ামাত্রই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
সে কি বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল? দুর্গশাসক সারওয়াগ জানতে চাইলেন।
“না, বাতাসে মিলিয়ে যায়নি- খুব দ্রুত জমিনে তলিয়ে গেল। বললো সিপাহী।
“আমরা তাকে জমিনে তলিয়ে যেতে দেখে যখন তরুণীদের দিকে তাকালাম, তখন আর তরুণীদ্বয়কে ওখানে দেখতে পেলাম না। এই অবস্থা দেখে আমরা ভয়ে ওখান থেকে পালিয়ে এলাম। এই ব্যক্তি আমাদের এলাকার ইমাম। আমরা এসে তাকে এই ঘটনা জানালাম। মনে হলো, ইনি এসব ঘটনায় আগে থেকেই ভীত।”
