বালনাথ দুর্গে সুলতান মাহমূদের সৈন্যদের অবস্থান কয়েক মাস হয়ে গেল। মাকরানের অধিবাসী সারওয়াগ নামের ডেপুটি সেনাপতি ছিলেন বালনাথের দুর্গপতি। হঠাৎ একদিন বালনাথ দুর্গে দু’জন অশ্বারোহী এলো। আগন্তুকদের একজন একটি মসজিদের ইমাম আর অপরজন গযনী বাহিনীর একজন সৈনিক। তারা কাশ্মীরের সীমান্ত এলাকা থেকে এসেছে। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আসায় তারা ছিল পরিশ্রান্ত। তাদের চেহারা ধুলোবালি মাখা আর শীতের তীব্রতায় ঠোঁট ফেটে চৌচির।
তাদের চেহারা ছবিই বলে দিচ্ছিল, তারা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এসেছে এবং পথিমধ্যে কোন বিশ্রাম ও পানাহার করেনি। এরা বালনাথ দুর্গে এসেই দুরক্ষক সরওয়াগের কাছে চলে এলো।
“আপনারা খুবই ক্লান্ত। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন, এরপর আমি আপনাদের কাছ থেকে ওখানকার খোঁজ খবর জানবো।”
“ওখানকার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তার চেয়ে আমাদের চেহারা মোটেও খারাপ হয়নি সম্মানিত দুর্গপতি।” বললেন আগন্তুক ইমাম।
“তাই! কী হয়েছে। হিন্দুরা কি আমাদের লোকজনকে বন্দী করে রেখেছে। উদ্বিগ্নকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন সারওয়াগ! হিন্দুরা কি আপনাদেরকে ইসলামের প্রচার কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে? সুলতানের নির্দেশ বাস্তবায়নে হিন্দুরা আপনাদেরকে বাধা দিচ্ছে?”
“না, এমন কিছুই হয়নি। আমি বাধ্য হয়েই এই সিপাহীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সে ঘটনা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছে।… আমি নিজেও সৈনিক, শুধু ইমাম নই। আপনার এমনটি ভাববার অবকাশ নেই যে, আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওখান থেকে পালিয়ে এসেছি। কাশ্মীর যাদুগরদের স্বর্গরাজ্য। এছাড়া ওখানে এক প্রকার অস্বাভাবিক অদৃশ্য শক্তি রয়েছে, যারা মানুষকে নানাভাবে ধোকা দেয়। এই অস্বাভাবিক শক্তি জিনও হতে পারে, মানুষের প্রেতাত্মাও হতে পারে।” বললেন ইমাম।
“মনে হচ্ছে, আপনারা হিন্দুদের যাদুটোনার শিকার হয়েছেন। বললেন দুর্গপতি সারওয়াগ। আপনি যা বলছেন, এসব কথা এতো সহজে আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন। সুলতান ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বহু যাচাই-বাছাই করে দুর্গপতির দায়িত্বে নিযুক্ত করেছেন। তাকে আমার সম্পর্কে বলা হয়েছিল, সেনাপতি সারওয়াগ কুসংস্কার ও অপপ্রচারে প্রভাবিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার মতো ব্যক্তি নয়। আপনি হিন্দুস্তানে জন্মগ্রহণকারী মানুষ। হিন্দুদের নানা কুসংস্কার ও ভৌতিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী পরিবেশে বড় হয়েছেন। অথচ এখন আপনি মুসলমানদের ইমাম। একজন ইমামকে অবশ্যই বাস্তববাদী ও দূরদর্শী হওয়া উচিত। কারণ, আপনি সমাজের পরিচালক। সাধারণ মানুষ আপনাকে অনুসরণ করবে।
“সম্মানিত দুর্গপতি! এতদূর থেকে নাওয়া-খাওয়া, ঘুম-বিশ্রাম ত্যাগ করে অবিরাম সফর করে আপনার কাছে ছুটে এসেছি, আপনাকে বুঝতে হবে ব্যাপারটি সাধারণ কোন ঘটনা নয়। আপনার পক্ষে ঘটনার ভয়াবহতা কল্পনা করাও কঠিন। তাই আপনি আমার সবকথা শোনার আগেই বলে দিয়েছেন আমি বাস্তববাদী নই। বললেন ইমাম।
আমি একথা এজন্য বলেছি যে, আপনারা ওখানকার ঘটনা বলতে গিয়ে যাতে আবেগাপ্রবণ হয়ে বাড়িয়ে না বলেন।” বললেন দুর্গপতি। যা হোক, এখন আপনি যা বলতে চাচ্ছিলেন বলুন।
“প্রকৃতিগতভাবেই কাশ্মীর এমন শোভামণ্ডিত অঞ্চল যে, মনে হয় কাশীর দুনিয়ার কোন ভূখণ্ড নয়, যেন এটা মানুষ নয়- জিন্নাতের আবাসস্থল। কখনো মনে হয়, এ ভূখণ্ড হয়তো মর্তের মানুষের আবাসস্থল নয়, এখানে ওইসব মানুষের রুহেরা বাস করে, যারা সবাই জান্নাতী।” বললেন ইমাম।
‘রূহ আল্লাহ তায়ালার একটি আমানত। মানুষ মরে গেলে রূহ আল্লাহর দরবারে চলে যায়। বললেন, দুর্গশাসক সারওয়াগ। কোন রূহ জমিনে বসবাস করে না। আপনি কল্পনা আর স্বপ্নের কথা বলবেন না সম্মানিত ইমাম। আসলে আপনি ওখানে কী দেখে এসেছেন, হুবহু সেই কথা বলুন।
“আমরা ওখানে গিয়ে মানুষকে ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অবহিত করছিলাম। আমরা তাদেরকে নামায পড়াতে শুরু করি এবং মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে তাদের জানাতে থাকি। এ কথাও বুঝাতে চেষ্টা করেছি, আল্লাহর সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক কী? ওখানকার লোকজন সুলতানের নির্দেশে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল বটে; কিন্তু আমরা তাদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিলে তারা মনে প্রাণে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।
কিছুদিন পর সেখানে রাতের বেলায় বিস্ময়কর এক আলোর ঝলকানী দেখা দেয়। অথচ তখন আসমানে না কোন মেঘ ছিল, না বৃষ্টি-বাদলের লক্ষণ ছিল। আমি যে গ্রামে ছিলাম এক পর্যায়ে ওই গ্রামেও অদ্ভুত বিজলী দেখতে পাওয়া যায়। একদিন রাতের বেলায় সেই গ্রামের মাঠে ঘোড়া দৌড়ানোর আওয়াজ শোনা যায়। এমন নয় যে, আওয়াজটি কাছে থেকে শুরু হয়ে দূরে মিলিয়ে যেত, বরং কাছে থেকেই আওয়াজটি শোনা যেত এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তা হারিয়ে যেত।
একদিন দিনের বেলায় কাঠুরিয়া লোকজন জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহে গেলে তারা জঙ্গলের মধ্যে নারীকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়ে পালিয়ে এলো। তারা এসে এই খবর শোনালে অন্য লোকজন জঙ্গলে কোন বিপদাপন্ন নারীর কান্না কি-না তা যাচাই করতে গিয়ে কোন জনমানুষের অস্তিত্বই জঙ্গলে খুঁজে পায়নি।
একদিন রাতের বেলায় বিপন্ন নারীকণ্ঠের কান্না শোনা গেল। নারীর কান্না থেমে যাওয়ার পর জলদগম্ভীর কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো… ‘দেব-দেবীদের অভিশাপ পতিত হবে… পাহাড় ফেটে যাবে… বনে আগুন জ্বলবে… সাবধান! দেব-দেবীদের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের অসন্তুষ্ট করো না।
