এক্ষেত্রে সুলতান মাহমুদের গুপ্ত আক্রমণকারীদের নির্বাচন করা হতো সৈন্যদের দৈহিক ও মানসিক দৃঢ়তা এবং ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে। ঝটিকা বাহিনীর সদস্যের সাথে সুলতান মাহমূদ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। সুলতান মাহমূদের ঝটিকা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থা এমন হতো যে, তাদের জীবন-মরণে কবরস্থ হওয়া এবং কাফন দাফন হওয়ার সম্ভাবনাও থাকতো না।
পরদিন রাতের বেলায় সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা পাহাড়ী অঞ্চলে পৌঁছে গেলো। ঝটিকা বাহিনীর সদস্যরা রাতের অন্ধকারে আরো এগিয়ে গেলো । প্রত্যেক দলে ছিলো দশ-বারজন দুর্ধর্ষ সৈন্য আর তাদের সাথে থাকতো একজন করে স্থানীয় গাইড। প্রত্যেক দলের টার্গেট ছিলো সেই পাহাড় চূড়া, যেখানে ভীমপাল অবস্থান করছে। সময়টা ছিলো ডিসেম্বরের শুরু এবং শীতের প্রচণ্ডতা। এমন বরফশীতল রাতে শত্রুপক্ষ থেকেও কোনো জঙ্গী তৎপরতার সম্ভাবনা নেই মনে করে ভীমপালের সৈন্যরা বাংকারে বাংকারে মাথা গুঁজে শুয়ে ছিলো।
সুলতানের ঝটিকা বাহিনী পা টিপে টিপে বরফশীতল রাতের অন্ধকারে পাহাড়ে ও টিলার চূড়ায় উঠে গেলো। হিন্দু তীরন্দাজ সৈন্যরা তখন বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। প্রতি বাংকারে মাত্র একজন করে প্রহরী পাহারা দিচ্ছিলো। এই একজন পাহারাদারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তেমন কঠিন হলো না। কয়েকটি চৌকিতে হিন্দু সৈন্যরা জাগ্রত থাকার কারণে প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো আর অধিকাংশ চৌকিতেই সুলতানের বাহিনী ঘুমন্ত সৈন্যদেরকে নিঃশেষ করে দিলো। জাগ্রত সৈন্যদের সাথে কঠিন মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হওয়ার কারণে চতুর্দিকে শোরগোল পড়ে গেলো। শোরগোলের আওয়াজ ভীমপালের কানে পৌঁছুলে পরিস্থিতি জানার জন্য ভীমপাল লোক পাঠালো। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ করে কেউই আর ফিরে এলো না।
রাত শেষে প্রত্যূষেই সুলতান মাহমুদ তার গেরিলা দলের সাফল্যের সংবাদ পেলেন। অতঃপর তার সৈন্যদের একটি অংশকে তিনি চুপিসারে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ভীমপালের রণকৌশল সুলতান মাহমুদের বুঝতে মোটেও বেগ পেতে হলো না। ভীমপাল ভেবেছিলো, সুলতানের বাহিনী পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে অতিক্রম করবে। এ জন্য সে পাহাড়ের পাদদেশে সৈন্যদের ছড়িয়ে দিয়েছিলো।
দুপুরের আগেই সুলতানের সৈন্যরা ক্ষুধার্ত সিংহের মতো গর্জন দিয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে পাহাড়ের উপর থেকে নীচের দিকে তুফানের মতো ধেয়ে এলো। ভীমপালের সৈন্যরা আকস্মিক এই আক্রমণে প্রতিরোধের অবকাশই পেলো না। ওঁৎ পেতে ফাঁদ তৈরি করে রাখা হিন্দু সৈন্যরাই ফাঁদে আটকে গেলো। অবস্থা বেগতিক দেখে দাদা জয়পালের মতো ভীমপালও নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে সে নির্দেশ দিলো, সকল সৈন্য বাংকার থেকে বেরিয়ে লাহোর রক্ষার চেষ্টা করো।
ভীমপালের ভাগ্য প্রসন্ন ছিলো যে, সে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড নিঃশেষ হয়ে গেলো। হিন্দু বাহিনীর পতাকাও গায়েব হয়ে গেলো। পতাকা গায়েব ও কেন্দ্রীয় কমান্ড না থাকায় হিন্দু বাহিনী দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করলো আর সুনিয়ন্ত্রিত ও লক্ষ্যভেদী গজনী বাহিনীর সৈন্যরা অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা এলাকা শত্রুমুক্ত করে ফেললো।
যুদ্ধ শেষে গজনী বাহিনীর হাতে হিন্দু যুদ্ধবন্দিরা জানিয়েছে, রাজা ভীমপাল পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কাশ্মীরের দিকে পালিয়ে গেছে। সুলতান মাহমুদ ভীমপালের প্রতি এতোটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তিনি একটি সেনা ইউনিট নিয়ে ভীমপালের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। কাশ্মীরে ঝিলাম নদীর তীরে অবস্থানরত হিন্দু সৈন্যরা সুলতানের অগ্রবর্তী দলকে ঘেরাও করে সবাইকে হত্যা করে। এই সাফল্যে হিন্দু বাহিনীর সেনাপতি সামনে অগ্রসর হয়ে সুলতানের বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে তারা বুঝতে পারে, জীবনের সবচেয়ে ভুল কাজটিই তারা করেছে। কিছুক্ষণ ব্যর্থ মোকাবেলা করে অবশেষে তাদের সবাইকে সুলতানের কাছে পরাজয়বরণ করতে হয়।
বিজয়ের পর সুলতান মাহমূদ ঘোষণা করলেন, এখানকার সকল অধিবাসী যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করে, তাহলে সকল বসতি উজাড় করে দেয়া হবে। সুলতানের ঘোষণায় লোকজন দলে দলে ইসলামে দীক্ষা নিতে লাগলো। সেখানকার যুগিরটিলা নামক স্থানের একটি মন্দিরে একটি মূর্তি ছিলো খুবই পুরনো। হিন্দুরা বিশ্বাস করতো, চল্লিশ হাজার বছরের পুরনো এই মূর্তিটি। সুলতান মাহমূদ পুরনো মূর্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মন্দিরটি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেললেন। ১১১৪ সালের জুলাই মাসে বিজয়ীবেশে সুলতান মাহমূদ পুনরায় গজনীতে ফিরে এলেন।
৩.২ অজেয় দুর্গ
অজেয় দুর্গ
১০১৪ হিজরী সনের শেষ ভাগের ঘটনা। ঝিলম নদীর তীরবর্তী পাহাড়ের ঢালে সাধারণ একটি দুর্গে সুলতান মাহমুদের কিছুসংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছিল। পাঞ্জাবের মহারাজ ভীমপালকে পরাজিত করে সুলতান মাহমূদ এ দুর্গ তার অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। পাঞ্জাবের বিজিত এলাকায় সুলতান মাহমূদ তার নিজস্ব শাসনব্যবস্থা চালু করতে পারেননি। কারণ, গযনীতে গণ্ডগোল দেখা দেয়ায় তাকে তড়িঘড়ি করে গয়নীতে ফিরে যেতে হয়েছিল। পা বের পরাজিত মহারাজার সাথে সুলতানের কৃতচুক্তি অনুযায়ী তিনি পাঞ্জাবের যে কোন স্থানে তার সেনাবাহিনীর দু’-একটি শিবির স্থাপনের ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। চুক্তি মোতাবেক সেনাদের সর্বময় খরচ ভীমপালের বহন করার কথা ছিল।
