সন্ন্যাসী, জাদুকর ও পুরোহিতদের উদ্দেশ্যে সুলতান বললেন, “আমি তোমাদের দেবদেবীদের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেছি। ওদেরকে বলো না, আমার উপর তাদের অভিশাপের মুসীবত চাপিয়ে দিতে।”
বিস্ময় ও হতবাক হয়ে বুগরা খান ও আলাসতুগীন সবকিছু দেখছিলো। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তখন তাদের দেমাগ থেকে নেশার প্রভাব অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। সুলতান আবেগময় সম্মোহনী ভাষায় বক্তৃতা করছিলেন। ঠিকই সেই সময়ে মন্দির চূড়া থেকে ভেসে এলো আযানের সুমধুর মনোমুগ্ধকর ধ্বনি ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’। সুলতান থেমে গেলেন। বুগরা খান ও আলাসতুগীনের শরীর ততোক্ষণে পাপের অনুভূতিতে নিঝরে কাঁপতে শুরু করেছে, আর তাদের দু’চোখে গড়িয়ে পড়ছে অনুশোচনার পাপানল।
আযান শেষ হলে সুলতান সাবেক দুই সেনা কমান্ডারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমাদের আজ আমি কোন শাস্তি দেবো না। তোমরা জীবন নিয়ে স্বাধীনভাবেই বেঁচে থাকো। সকল মুসলমানকে জানিয়ে দাও যে, আমাদের শক্ররা তোমাদের মতো তুখোড় যোদ্ধাদেরকে শুধু তলোয়ার দিয়েই আঘাত করে না, ওদের হাতে এমন ধারালো অস্ত্র রয়েছে যা দিয়ে তারা কোন মুসলিম সেনাপতির অন্তর কেটে দিতে পারে, ঈমান নষ্ট করে দিতে পারে, ইসলাম-মুসলিম জাতীয়তা ও ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিয়ে বাতিলের সেবাদাসে পরিণত করতে পারে।“
* * *
সাপ স্বর্ণ ও মানুষ
ঐতিহাসিক ফারিশতা লিখেন, ৮০২ হিজরী মোতাবেক ১০১১ খৃস্টাব্দে সুলতান মাহমূদ থানেশ্বর মন্দির জয় করে যখন গজনী ফিরে এলেন, তখন গজনীকে দেখে হিন্দুস্তানের কোন শহর মনে হতো। কারণ, গজনীর অধিবাসী ও সৈন্য সংখ্যা খুব বেশি ছিলো না। কিন্তু প্রতিবারই অভিযান শেষে হিন্দু যুদ্ধবন্দীদের গজনী নিয়ে আসতেন সুলতান। কিন্তু থানেশ্বর যুদ্ধে হিন্দু যুদ্ধবন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখের উপরে। সে সময় যুদ্ধবন্দিদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করা হতো এবং সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনীমতের) মতোই পদ অনুযায়ী তাদের বন্টন করে দেয়া হতো।
গজনী ফিরে সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ মালে গনীমত বণ্টনসহ যুদ্ধবন্দিদের বণ্টন করে দেয়ার পর সুলতান সকল সেনা সদস্যের উদ্দেশ্যে বললেন, যুদ্ধবন্দি গোলামদের সাথে কেউ এমন ব্যবহার করো না যে, এরা বাকি জীবন নিজেদেরকে জন্তু-জানোয়ারের মতোই কাটাতে বাধ্য হয়। ওদেরকে ইসলামী রীতি-নীতি সম্পর্কে অবহিত করো। ওদের ভাগ্যকে তোমরা সদোত্তর দিয়ে এভাবে বদলে দাও যাতে তারা শুধু আপনজন ও জাতি-ধর্মকেই ভুলে যায় না, সাগ্রহে ইসলামে দীক্ষা নেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে তখন যুদ্ধবন্দির সংখ্যা দুলাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। ফলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে গোলামে পরিণত করে না রেখে ওদেরকে মুসলিম সমাজের মূল ধারায় লীন করে দেয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ জারি করলেন। এর ফলে অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, অল্প দিনের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক হিন্দু গোলাম ইসলাম গ্রহণ করে স্বাধীনতা লাভ করলো।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতানের দূরদর্শী এই সিদ্ধান্তের ফলে গোলামী থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দুদেরকে নওমুসলিম হিসেবে সমাজের মূল ধারায় মিশে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো। এক পর্যায়ে সুলতান নওমুসলিমদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনীর আলাদা একটি রেজিমেন্ট গঠন করেন। তাছাড়া সুলতানের অধীনে একটি হিন্দু রেজিমেন্টও ছিলো। যার কমান্ডারও ছিলো হিন্দু। সুলতান মাহমূদের প্রশাসনিক কাজেও হিন্দুদেরকে অফিসার পদে নিযুক্ত করেছিলেন এবং মুসলমানদের তুলনায় হিন্দু আমলাদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতেন। হিন্দু সেনাদেরকে তিনি কখনো ভারত অভিযানে ব্যবহার করতেন না। পার্শ্ববর্তী মুসলিম শাসকদের মোকাবেলায় হিন্দু রেজিমেন্টকে ব্যবহার করতেন সুলতান।
থানেশ্বর বিজয়ের পর বিপুল সংখ্যক বন্দী নিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসার পর সেই রাতে গজনীতে প্রথম রাতের বেলায় সৈন্য ও সাধারণ নাগরিকরা আনন্দে মেতে উঠলো। রাতে গজনীর রেসকোর্স ময়দানে সমবেত সৈন্য ও শহরবাসী আতশবাজি পোড়ালো। মানুষ পরম বিজয় উৎসবে মেতে নাচতে লাগলো। শহরের অলিগলি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো আনন্দের বন্যা। অবস্থা এমন হলো যে, গজনীতে যেনো রাত নামেনি। চতুর্দিকে আলোকসজ্জা ও আতশবাজিতে রাতের গজনী কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠলো।
থানেশ্বর মন্দিরের সবচেয়ে বড় বিষ্ণু মূর্তিকে ঘোড়ার টানা গাড়িতে তুলে শহরময় প্রদর্শনী করা হলো। লোকজন মূর্তিতে থু থু ছিটিয়ে দিলো আর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মূর্তির সুন্দর গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করছিলো। এরপর বিশালাকার বিষ্ণু মূর্তিকে রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে আসা হলো। সেখানে সমবেত হাজার হাজার সৈনিক-জনতার সামনে সেটিকে ভেঙ্গে ফেলা হলো। সে সময় সকল হিন্দু বন্দিকেও ময়দানে নিয়ে আসা হলো, যাতে দর্শকদের সাথে তারাও তাদের দেবতার করুণ পরিণতি স্বচোখে দেখতে পারে। বন্দিদের উদ্দেশ্যে এক ঘোষক বললো, দেখো, এটা নিছক একটা পাথরের তৈরি বিগ্রহ মাত্র। এটা কোন মতেই দেবতা হতে পারে না। এটা তোমাদের ধর্মের পুরোহিতদের তৈরি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। এসব মূর্তির মধ্যে যদি কোন দেবতার শক্তি থাকতো তাহলে এতোক্ষণে আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতো।
