সুলতান মাহমুদ তার একান্ত নিরাপত্তা রক্ষীদের নিয়ে ঝড়ের বেগে থানেশ্বরের দিকে আসছিলেন। সুলতানের নিরাপত্তা রক্ষী দলের কমান্ডার পথিমধ্যে কয়েকজন সন্ন্যাসীরূপী লোককে দাঁড়ানো দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কেন পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে? কাছে এসে কমান্ডার দেখতে পেলো, এই সন্ন্যাসীরা আর কেউ নয়, তাদেরই গোয়েন্দা কমান্ডার উবায়দের দল। ইতিমধ্যে সুলতান সেই জায়গায় পৌঁছে গেলেন।
উবায়দ প্রথমেই সুলতানকে জানালো, থানেশ্বরে বাইরে থেকে কোন সেনাবাহিনী আসেনি এবং থানেশ্বর সেনা শিবিরের সৈন্যরা ছাড়াও শহরের বসিন্দারাও তাদের সাথে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সেই সাথে জানালো, আমাদের সাবেক এই দুই কমান্ডারকে সুলতানকে হত্যার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিলো। সুলতানকে এদের আদিঅন্ত পুরো কাহিনী শোনালো উবায়দ।
“এদেরকে যেভাবে রেখেছে সেভাবেই রাখো। তবে কোন অবস্থাতেই ওদের কোন কিছু পানাহার করতে দিও না।ক্ষুধায় চেতনা হারালেও খেতে দিও না। তাহলে ওদের নেশা দূর হয়ে যাবে। তারপর ওদেরকে আমি সঠিক বাস্তবতা দেখাবো।” বললেন সুলতান।
সাবেক কমান্ডার দু’জন চোখ বড় বড় করে হতবাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। সুলতান উবায়দের কাছ থেকে সার্বিক পরিস্থিতির রিপোর্ট নিয়ে সৈন্যদের নিয়ে এগিয়ে চললেন।
গতির প্রতিযোগিতায় সুলতান বিজয়ী হলেন। থানেশ্বর মন্দিরের সেনা কমান্ডাররা দেখলো রাজা-মহারাজাদের বাহিনী পৌঁছার আগেই সুলতান তার সৈন্যদের নিয়ে থানেশ্বর পৌঁছে গেছেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান মাহমূদের ক্ষিপ্র গতিময়তায় থানেশ্বরের সকল হিন্দু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো । আসলে গতিময়তা ছিলো সুলতান মাহমুদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রেও তিনি হিন্দু সৈন্যদের আগে পৌঁছার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সুলতান থানেশ্বর পৌঁছে আগে হিন্দুদের প্রতিরোধ কৌশল পর্যবেক্ষণ করে অবরোধ না করে সরাসরি আঘাত হানার নির্দেশ দিলেন। সুলতানের নির্দেশে গজনী বাহিনীর তীরন্দাজ ইউনিট শহর প্রাচীরের উপর এমন তীব্র তীরবৃষ্টি বর্ষণ করলো যে, প্রতিরোধকারী সৈন্যরা আর মাথা তোলার সুযোগ পেলো না। শহর প্রাচীরের প্রধান ফটক ভেঙ্গে ফেললো গজনী বাহিনীর দুঃসাহসী বীর সৈন্যরা। হিন্দু বাহিনীর মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সুলতান শহরে ত্রাস সৃষ্টির নির্দেশ দিলেন। মুসলিম সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করেই ব্যাপক ভাংচুর করে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করলো। হিন্দু নাগরিক তো দূরের কথা, সৈন্যরা জীবন বাঁচানোর জন্য দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করলো।
সুলতান মাহমূদ মন্দিরের সকল মূর্তি বাইরে বের করে প্রকাশ্য রাস্তার উপর ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু থানেশ্বর মন্দিরের সবচেয়ে বড় মূর্তি ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বিষ্ণু মূর্তিকে না ভেঙ্গে অক্ষত রাখার নির্দেশ দিলেন সুলতান। এই বিষ্ণু মূর্তির জন্যই সারা হিন্দুস্তানে থানেশ্বর মন্দির বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলো। সুলতান বিষ্ণু মূর্তিকে অক্ষত অবস্থায় গজনী নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। থানেশ্বর বিজয়ের পর গজনী ফেরার সময় বিষ্ণু মূর্তিকে গজনীর সৈন্যরা বহন করে নিয়ে গেলো। সমকালীন একজন ঐতিহাসিকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, গজনীর রেসকোর্স ময়দানে থানেশ্বর মন্দিরের অহংকার বিষ্ণু মূর্তিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। আর ঘোড়ার পায়ের আঘাতে আঘাতে তা গজনীর ধূলো-বালির সাথে মিশে যায়।
থানেশ্বর মন্দির ও শহরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ার পর সুলতান গোয়েন্দা কমান্ডার উবায়দকে নির্দেশ দিলেন ধৃত বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে তার কাছে নিয়ে আসতে।
বুগরা খান ও আলাসতুগীনসহ সকল যুদ্ধবন্দীকে সুলতানের সামনে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলো। বন্দীদের প্রথম সারিতে ছিলো ধৃত দুই সাবেক কমান্ডার, মন্দিরের পুরোহিত দল ও সন্নাসী-জাদুকরদের শীর্ষ ব্যক্তিসহ সেই তরুণীদ্বয় এবং মন্দিরের নর্তকী-সেবিকারা।
সুলতান বন্দী বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে নির্দেশ দিলেন, তোমাদের পূজনীয় এই দুই তরুণীকে দেখো। আর ওদের থেকে তোমাদের দেবীদের আলাদা করে ফেলল। উভয়েই হতবাক হয়ে দেখলো। তারা যে দুই তরুণীর প্রেমে পড়ে ওদেরকে স্বর্গের অপ্সরা ভেবে পূজা করতে শুরু করছিলো, এরা দিব্যি সশরীরে তাদের সামনে বন্দী অবস্থায় দণ্ডায়মান। সুলতান জাদুকরকে নির্দেশ দিলেন, এই তরুণীদ্বয়কে তোমার জাদু দিয়ে চৌবাচ্চার মধ্যে গায়েব করে দাও। এরপর গায়েব থেকে এদেরকে আবার বাস্তবে হাজির করো।
দু’টি চৌবাচ্চা নিয়ে আসা হলো। এক জাদুকর এগিয়ে এসে তরুণীদ্বয়কে ধরে এনে চৌবাচ্চার মধ্যে বসিয়ে দিলো এবং একটু পর সবাই দেখলো চৌবাচ্চা সম্পূর্ণ খালি, সেখানে কিছু নেই। একটু পর সেই জাদুকর খালি চৌবাচ্চা থেকেই আবার তরুণীদ্বয়কে বের করে আনলো।
“এটা হিন্দুস্তানের হাজারো জাদুর মধ্যে খুবই সাধারণ একটা জাদু।” বললেন সুলতান। “হিন্দুদের ধর্ম টিকেই আছে জাদু ও রহস্যময়তার অন্ধকারে। আসলে এই পৌত্তলিক ধর্মটার মূল জিনিসই শরীর কেন্দ্রিক। আত্মার সাথে পৌত্তলিকতার কোন সম্পর্ক নেই। ভোগবাদিতা ও রমণলীলা হিন্দু ধর্মের প্রধান উস।”
