‘আল্লাহু আকবার, ইসলাম জিন্দাবাদ, পৌত্তলিকতা মুরদাবাদ’ শ্লোগানে শ্লোগানে রাতের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো আর হিন্দু কয়েদীরা মর্মজ্বালা নিয়ে নীরবে তাদের দেবতার করুণ পরিণতি প্রত্যক্ষ করলো। সেই রাতে গজনী শহরে যে আনন্দ-উল্লাস ও হৈ-হুঁল্লোড়ে বিজয় উৎসব অনুষ্ঠিত হলো, গজনী শহরে এমনটি আর কখনো ঘটেনি। মুসলমানদের বাড়িঘরও ছিলো উল্লাসমুখর। কিন্তু এতোসব আনন্দ উৎসব সত্ত্বেও একটি মহল ছিলো সম্পূর্ণ নিস্তরঙ্গ। সেই মহলে যিনি অবস্থান করছিলেন, এতো আনন্দ-উৎসবেও তিনি ছিলেন চিন্তাৰিত। আনন্দ-উৎসবে যোগ না দিয়ে তিনি নিজের একান্ত কক্ষে একাকী বসে ছিলেন। দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তায় তার চেহারা ছিলো মলিন। এমন সময় তার কক্ষে উপস্থিত হলো দুই লোক। তারা তাকে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করে পাশে উপবেশন করলো। এরা ছিলো গজনী বাহিনীর দুই গোয়েন্দা প্রধান আর মহলে অবস্থানকারী ব্যক্তিটি ছিলেন বিজয়ের প্রধান নায়ক সুলতান মাহমুদ। তিনি বিজয় উৎসবে যোগ না দিয়ে তার দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ডেকে গজনীর প্রতিবেশী মুসলিম শাসকদের কর্মতৎপরতার খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন।
দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত
৩.১ এলিখ খান
ভারত অভিযান (মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান) (তৃতীয় খণ্ড) / এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ – শহীদুল ইসলাম
সুলতান মাহমুদ গজনবীর ঐতিহাসিক সিরিজ উপন্যাস।
.
উৎসর্গ
তাকিয়া তাবাসসুম (যীবা) গল্প উপন্যাস তার পড়া হয়ে ওঠে না কিন্তু আব্বর নতুন বই এলেই দখলে নেয়ার জন্যে মরিয়া।
……………আর অভিযোগ কেন যে আমি ছোট হলাম! ছোট না হলে আব্দুর ছদ্মনাম আবুশিফা না হয়ে আবুযীবা হতো। সত্যি, অনিষ্পন্ন অভিযোগ। অতএব, এ উৎসর্গ তার নামে। বইপ্রিয়তা তাকে আলোকিত মানুষ করুক, এই দু’আ।
–অনুবাদক
.
প্রকাশকের কথা
আলহামদুলিল্লাহ! এদারায়ে কুরআন’ কর্তৃক প্রকাশিত সুলতান মাহমূদ এর ভারত অভিযান সিরিজের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি এবং পাঠক মহলকে জানাচ্ছি মোবারকবাদ। নিয়মিত বিরতি দিয়ে এর প্রতিটি খণ্ড প্রকাশের ব্যাপারে আমাদের চেষ্টার কোন ক্রটি ছিল না কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মুদ্রণ সামগ্রির উচ্চমূল্য আমাদের টুটি চেপে ধরেছে। ফলে কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে এই সিরিজের প্রকাশনা।
আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে রবিউল আউয়াল ‘০৮ এর বইমেলা উপলক্ষে এই সিরিজের তৃতীয় খণ্ডটি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে সুখানুভব করছি।
নানাবিধ সীমাবদ্ধতার পরও আমরা এ খণ্ডটি আগেরগুলোর চেয়ে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করেছি। তবুও মুদ্রণ প্রমাদ ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। বিজ্ঞমহলের কাছে যে কোন ক্রটি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করার বিনীত অনুরোধ রইল।
প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের মতো তৃতীয় খণ্ডটিও পাঠক-পাঠিকা মহলে আদৃত হলে আমাদের সার্বিক প্রয়াস সার্থক হবে।
–প্রকাশক
.
লেখকের কথা
“মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান” সিরিজের এটি তৃতীয় খণ্ড। উপমহাদেশের ইতিহাসে সুলতান মাহমুদ গজনবী সতের বার ভারত অভিযান পরিচালনাকারী মহানায়ক হিসেবে খ্যাত। সুলতান মাহমূদকে আরো খ্যাতি দিয়েছে পৌত্তলিক ভারতের অন্যতম দু ঐতিহাসিক মন্দির সোমনাথ ও থানেশ্বরীতে আক্রমণকারী হিসেবে। ঐসব মন্দিরের মূর্তিগুলোকে টুকরো টুকরো করে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন মাহমুদ। কিন্তু উপমহাদেশের পাঠ্যপুস্তকে এবং ইতিহাসে মাহমূদের কীর্তির চেয়ে দুষ্কৃতির চিত্ৰই বেশী লিখিত হয়েছে। হিন্দু ও ইংরেজদের রচিত এসব ইতিহাসে এই মহানায়কের চরিত্র যেভাবে চিত্রিত হয়েছে তাতে তার সুখ্যাতি চাপা পড়ে গেছে। মুসলিম বিদ্বেষের ভাবাদর্শে রচিত ইতিহাস এবং পরবর্তীতে সেইসব অপইতিহাসের ভিত্তিতে প্রণীত মুসলিম লেখকরাও মাহমূদের জীবনকর্ম যেভাবে উল্লেখ করেছেন তা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের বোঝার উপায় নেই, তিনি যে প্রকৃতই একজন নিবেদিতপ্রাণ ইসলামের সৈনিক ছিলেন, ইসলামের বিধি-বিধান তিনি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন। জাতিশত্রুদের প্রতিহত করে খাঁটি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও দৃঢ় করণের জন্যেই নিবেদিত ছিল তার সকল প্রয়াস। অপলেখকদের রচিত ইতিহাস পড়লে মনে হয়, সুলতান মাহমূদ ছিলেন লুটেরা, আগ্রাসী ও হিংস্র। বারবার তিনি ভারতের মন্দিরগুলোতে আক্রমণ করে সোনা-দানা, মণি-মুক্তা লুট করে গজনী নিয়ে যেতেন। ভারতের মানুষের উন্নতি কিংবা ভারত কেন্দ্রিক মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তার কখনো ছিলো না। যদি তকালীন ভারতের নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য করা এবং পৌত্তলিকতা দূর করে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়ার একান্তই ইচ্ছা তার থাকতো, তবে তিনি কেন মোগলদের মতো ভারতে বসতি গেড়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেন না? ইত্যাকার বহু কলঙ্ক এঁটে তার চরিত্রকে কলুষিত করা হয়েছে।
মাহমূদ কেন বার বার ভারতে অভিযান চালাতেন মন্দিরগুলো কেন তার টার্গেট ছিল? সফল বিজয়ের পড়ও কেন তাকে বার বার ফিরে যেতে হতো গজনী? ইত্যাদি বহু প্রশ্নের জবাব; ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ সৈনিক সুলতান মাহমূদকে তুলে ধরার জন্যে আমার এই প্রয়াস। নির্ভরযোগ্য দলিলাদি ও বিশুদ্ধ ইতিহাস ঘেটে আমি এই বইয়ে মাহমূদের প্রকৃত জীবন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রকৃত পক্ষে সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর মতোই মাহমূদকেও স্বজাতির গাদ্দার এবং বিধর্মী পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে একই সাথে লড়াই করতে হয়েছে। যতো বার তিনি ভারত অভিযান চালিয়েছেন, অভিযান শেষ হতে না হতেই খবর আসতো, সুযোগ সন্ধানী সাম্রাজ্যলোভী প্রতিবেশী মুসলিম শাসকরা গজনী আক্রমণ করছে। কেন্দ্রের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বাধ্য হয়েই মাহমূদকে গজনী ফিরে যেতে হতো। একপেশে ইতিহাসে লেখা হয়েছে, সুলতান মাহমুদ সতের বার ভারত অভিযান চালিয়েছিলেন, কিন্তু একথা বলা হয়নি, হিন্দু রাজা-মহারাজারা মাহমূদকে উৎখাত করার জন্যে কতো শত বার গজনীর দিকে আগ্রাসন চালিয়ে ছিল।
