***
এদিকে বাগানে উবায়দের সাথে কথা বলে বুগরা খান ও আলাসতুগীন যখন মন্দিরে ফিরে গেলো, তখন দেখতে গেলো মন্দিরের লোকজন ব্যস্ত ও ভীতিকর পরিস্থিতি। জিজ্ঞেস করলে তাদের জানানো হলো, গজনীর সৈন্যরা থানেশ্বর মন্দির আক্রমণের জন্য আসছে। মন্দিরের পুরোহিত ও অন্যান্য লোকেরা মহারাজা আনন্দ পাল ও অন্যান্য হিন্দু রাজাদের সেনা দলের আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলো। কিন্তু কোন হিন্দুরাজের সৈন্যদের এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে না।
থানেশ্বর মন্দিরের পুরোহিতদের জানা ছিলো না যে, সব রাজাদের কাছেই খবর পৌঁছে গেছে, সুলতান মাহমূদ থানেশ্বর মন্দির আক্রমণের জন্য আসছে। মুসলিম বাহিনী এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সুলতানের অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পৌঁছে যাওয়ার কথা তারা ভাবতেই পারেনি।
সুলতান ঝড়ের গতিতে সফর করছিলেন। থানেশ্বর মন্দির সাধারণ কোন পূজাশ্রম ছিলো না। এটি বেষ্টিত ছিলো বিশাল দুর্গ ও সেনা ছাউনী দ্বারা। সেনা শিবিরটিতে পরিপূর্ণ একটি সুসজ্জিত বাহিনী অবস্থান ছিলো। সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। থানেশ্বর মন্দিরের পৃথক গোয়েন্দা বিভাগ ছিলো। গোয়েন্দারা প্রধান পুরোহিতকে খবর দিলো, সুলতান মাহমূদ চলমান গতিতে অগ্রসর হলে আগামী একদিন এক রাতের মধ্যে থানেশ্বর পৌঁছে যাবে।
বুগরা খান ও আলাসতুগীন মন্দিরে গিয়ে জানালো, সুলতান মাহমুদের এক গোয়েন্দার সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। ওর সাথে আরো কয়েকজন রয়েছে। আগামীকাল আবার এদের একজন তাদের সাথে বাগানে দেখা করতে আসবে।
মন্দিরের সেনাপতি তাদেরকে বললো, তোমরা আগামীকাল সেই গোয়েন্দার সাথে দেখা করবে এবং ওদের সাথে গিয়ে ঠিকানা দেখে আসবে। যাতে ওদের ধরে শেষ করে দেয়া যায়। বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে এ কথাও বলা হলো যে, তোমরা গোয়েন্দাদের ঠিকানা জেনে মুসলিম বাহিনীর দিকে চলে যাবে এবং নিজেদেরকে গোয়েন্দা পরিচয় দিয়ে বলবে, আমরা হিন্দুদের কয়েদখানা থেকে পালিয়ে এসেছি, সুলতানের সাথে একান্ত সাক্ষাতে আমাদের কথা আছে।
প্রায় এক বছর সময়কালে বুগরা খান ও আলাসতুগীন মুসলিম সালতানাতের সুরক্ষায় জিহাদী চেতনা লালনকারীর অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ হয়ে গিয়েছিলো। এই বিচ্যুতি ছিলো হিন্দুয়ানী চেতনার উপযোগী। এরা প্রশিক্ষিত জন্তুর মতোই অনুগত হয়ে গিয়েছিলো। হিন্দু পুরোহিতদের পাশবিক ভোগবাদিতা, মদ, নেশা, জাদুর প্রভাবে এরা মানবিকতার মর্যাদা থেকেও বিদ্যুৎ হয়েছিলো। তাদেরকে সেই দু’সুন্দরী তরুণীর মূর্তি দেখিয়ে ওদেরকে দেবীতে রূপান্তরিত করে মূর্তিপূজারীতে পরিণত করেছিলো। এরা কল্পনাও করতে পারেনি যে, সেই দু’তরুণীকেই চৌবাচ্চার মধ্যে মূর্তিরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। চৌবাচ্চার চারপাশে ধূপ লোবান ও আগরবাতি এমনভাবে জ্বালানো হয়েছিলো যে, এসবের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর কারণে তারা বুঝতেই পারেনি যে এরা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে।
এ পর্যায়ে তাদেরকে যখন বলা হলো, সুলতান মাহমূদ থানেশ্বর মন্দির লুট করতে ও ভাঙ্গতে আসছে। তখন বুগরা খান ও আলাসতুগীন ক্ষোভে অগ্নিরূপ ধারণ করলো।
এদিকে থানেশ্বর মন্দির সংলগ্ন সেনা শিবিরে হৈচৈ পড়ে যায়। তারা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা মোর্চা ঠিক করতে শুরু করে। মন্দিরের ভেতরে-বাইরে সেনাদের দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। শহরের মানুষের মধ্যে ভীতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং শহরের সাধারণ লোকজনও তরবারী ও বর্শা নিয়ে মন্দির রক্ষার জন্য মন্দিরের প্রধান ফটকে জমায়েত হতে থাকে। সেনাবাহিনীর লোকেরা তাদের করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে এবং তাদেরকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেয়।
এ দুর্যোগ মুহূর্তেও পরদিন বুগরা খান ও আলাসতুগীন উবায়দের সাথে সাক্ষাৎ করতে বাগানে চলে গেলো। তারা উভয়েই উবায়দকে মিথ্যা কাহিনী এবং অসত্য কার্যক্রমের গল্প শোনালো এবং প্রস্তাব করলো, আমাদেরকে তোমাদের আস্তানায় নিয়ে চলো। অবশ্য উবায়দ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যে, ওদেরকে ফুসলিয়ে হলেও আস্তানায় নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন তারা নিজেরাই উবায়দের ইচ্ছা পূরণে আগ্রহী হয়ে উঠলো। তাতে উবায়দের লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়ে গেলো। সে তাদের নিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেলো।
উবায়দ আগেই সহকর্মীদের দিক-নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলো, বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে এখানে নিয়ে এলে তাদের আটকে ফেলতে হবে। পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো উবায়দ তাদের নিয়ে আস্তানায় পৌঁছা মাত্রই কয়েকজন তাদের ঝাঁপটে ধরে রশি দিয়ে হাত-পা বেধে ফেললো।
উবায়দ আশংকা করছিলো, গতকালের মতো আজও হয়তো ওদের অনুসরণকারী থাকতে পারে। তাই দ্রুত তারা সেই আস্তানা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়াটাকেই নিরাপদ মনে করলো। স্থান ছেড়ে আসার জন্য উবায়দের দল কমান্ডার বুগরা খান ও আলাসতুগীনের হাত বেঁধে পা খুলে দিলো এবং উভয়কে একই রশিতে বেঁধে একজন ধরে রাখলো যাতে পালাতে না পারে। আর হিন্দু গোয়েন্দাকে জঙ্গলের মধ্যে মেরে ফেললো।
খুব বেশি দূরে তাদের যেতে হয়নি। কয়েক মাইল পথ অগ্রসর হলেই গজনী বাহিনীর অগ্রবর্তী দলের দেখা পেলো। উবায়দ অগ্রবর্তী দলের কমান্ডারকে তাদের অপারেশনের কথা এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করলে কমান্ডার উবায়দকে জানালো, তোমাদের আর অগ্রসর হওয়ার দরকার নেই। সুলতান কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে পৌঁছে যাবেন। উবায়দ আর অগ্রসর না হয়ে সেই স্থানেই অপেক্ষা করলো।
