“এখানেও কি সুলতান মাহমূদ আসবে?” অবাক হয়ে জানতে চাইলো বুগরা খান।
“যদি এসেই পড়ে!” বললো পুরোহিত।
“ওকে আসতে দাও। এখানে এলে সে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না।” বললো বুগরা খান।
টানা চার-পাঁচ মাসে ওদের মধ্যে এমন পরিবর্তন ঘটলো, এরা নেশার যোরে কিংবা জাদুর প্রভাবে অবচেতন মনে হিন্দুদের অনুসারী হয়ে গেছে এমন ছিলো না। ওরা এখন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতোই মন্দিরের বাইরেও ঘুরে বেড়াতো। তাদের মধ্যে কোন নেশাগ্রস্তের বাতিক ছিলো না। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতোই ওরা হিন্দুত্ববাদে দীক্ষিত হয়ে গেলো।
একদিন বিকেল বেলায় একটি বাগানে পায়চারি করছিলো দু’জন। এমন সময় দূর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো, “আলাসতুগীন…!”
নাম ধরে ডাক শোেনার কারণে উভয়েই চারপাশ তাকিয়ে দেখলো। এক সন্ন্যাসীরূপী সোককে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো। তার কালে সিঁদুর দিয়ে ওম’ লেখা। সন্ন্যাসীর মাথায় হিন্দু সন্ন্যাসীদের মতোই জটা আর সিঁদুরের আপনা আঁকা। সন্ন্যাসী কাছে এসে বললো, “আরে, তোমাদের ব্যাপারে তো আমাদের কিছুই বলা হয়নি। তোমরা এখানে কখন এলে, কোথায় থাকছে?”
“ওহ!” কিছুটা বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললো আলাসতুগীন। “তুমি উবায়দ না?”
এক সময় উবায়দ ও আলাসতুগীন একই সেনা ইউনিটে কর্মরত ছিলো। সেই সুবাদে একজন অপরজনকে চিনতো। উবায়দ ছিলো অভিজ্ঞ গেরিলা যোদ্ধা। সেই সাথে খুবই মেধাবী ও দুঃসাহসী। উবায়দ বুগরা খানকে চিনতে না। আলাসতুগীন বুগরা খানকে উবায়েদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। কিন্তু একথা বললো না, তারা এখানে কিভাবে এসেছে, কি করছে এবং কোথায় আছে। উবায়দকে পরবর্তীতে গোয়েন্দা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। এদের দেখেও উবায়দ মনে করলো এদেরকেও হয়তো গোয়েন্দা কাজে পাঠানো হয়েছে।
“সুলতান কাছেই এসে গেছেন।” বললো উবায়দ। “তোমরা কি তার কাছে কোনো সংবাদ পাঠিয়েছে।”
“তুমি কি খবর পাঠিয়েছে?” জবাব এড়িয়ে গিয়ে পাল্টা উবায়দকে জিজ্ঞেস করলো আলাসতুগীন।
“আমাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো, আগের মতো এই মন্দির রক্ষার জন্যও হিন্দুস্তানের অন্যান্য রাজা-মহারাজারা এখানে সৈন্য সমাবেশ ঘটাবে। কিন্তু যতোটুকু দেখতে পাচ্ছি এখনো অন্য জায়গা থেকে এখানে কোনো সৈন্য আসেনি। এখানে আগে থেকে যে সেনাবাহিনী ছিলো তাই রয়েছে।” বললো উবায়দ।
আলাসতুগীন আর উবায়দ গজনীর স্থানীয় ভাষায় কথা বলছিলো। সে উবায়দকে জানালো, বুগরা খানের সাথে সে মন্দিরের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে এবং আপাদত মন্দিরের ভেতরেই অবস্থান করছে। ওরা যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে এ ব্যাপারটি উবায়দকে মোটেও টের পেতে দিলো না। উবায়দকে তাদের ব্যাপারে অন্ধকারে রেখেই তারা জায়গা ত্যাগ করে মন্দিরের দিকে রওয়ানা হলো। আলাসতুগীন আরো জানালো, তারা উভয়েই হিন্দু সেজে মন্দিরের পুরোহিতদেরও ভক্ত বানিয়ে ফেলেছে।
উবায়দ যখন বাগান থেকে বেরিয়ে ফিরে যেতে লাগলো, তখন এক লোক তার মুখোমুখি হয়ে জানতে চাইলে, তুমি কো কোত্থেকে এসেছে? উবায়দ লোকটিকে একটি হিন্দুয়ানা নাম বলে দিলো এবং জানালো, আমরা কয়েকজন সন্ন্যাসী লাহোর থেকে এসেছি। জঙ্গলের মধ্যে আমরা তাঁবু টেনেছি, ওখানেই থাকি।
কিন্তু লোকটি উবায়দের কথা বিশ্বাস করতে পারলো না। তাকে সন্দেহ করতে লাগলো। সে ছিলো হিন্দুদের গোয়েন্দা বিভাগের লোক। বুগরাখান ও আলাসতুগীনকে দূর থেকে পাহারা দিতে এই গোয়েন্দা। গোয়েন্দা যখন দূর থেকে উবায়দকে আলাসতুগীনের সাথে কথা বলতে দেখলো, তখনই তার সন্দেহ হলো। তাই ওকে জানার জন্য তারা বাগান ছেড়ে যেতেই উবায়দের দিকে এগিয়ে এলো গোয়েন্দা।
উবায়দ যখন বললো, আমরা জঙ্গলে তাঁবু ফেলেছি, তখন লোকটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের তাঁবু দেখার জন্য প্রস্তাব করলো। উবায়দ তাকে সাথে নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলো। জঙ্গলের ভেতরে ঠিকই চার-পাঁচজন যোগী-সন্ন্যাসীরূপী লোক একটা তাবুতে অবস্থান করছিলো। কিন্তু উবায়দ এই গোয়েন্দাকে দেখাতে নিয়ে গিয়ে আর ফিরে আসতে দিলো না। তাঁবুতে পৌঁছা মাত্রই অন্যান্য সন্ন্যাসীরূপী লোকেরা উবায়দের ইঙ্গিতে লোকটিতে হাত-পা বেঁধে ফেললো। এরপর খঞ্জর বুকে ধরে উবায়দ জিজ্ঞেস করলো, কি কারণে আমার প্রতি তোর সন্দেহ হয়েছিলো, বল?
হিন্দু গোয়েন্দা কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানালো। এরপর ওর পায়ে দড়ি বেঁধে একটি গাছের সাথে ঝুলিয়ে নীচে আগুন ধরিয়ে দিলো। আগুনের তাপ গায়ে লাগতেই চিৎকার শুরু করলো হিন্দু গোয়েন্দা। সবকিছু বলবে বলে স্বীকার করলো। দড়ি খুলে নীচে নামালো ওকে। ধীরে ধীরে ওর সন্দেহ, গোয়েন্দাবৃত্তি এবং বুগরা খান ও আলাসতুগীন সম্পর্কেও সব কাহিনী বলে দিলো। গোয়েন্দা আরো জানালো, যেহেতু ওরা দু’জন গজনী বাহিনীর কমান্ডার এ জন্য তাদের পক্ষে সহজেই সুলতানের ধারে-কাছে যাওয়া সম্ভব। তারা হঠাৎ একদিন সুলতানের কাছে গিয়ে বলবে, তারা হিন্দুদের বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এসেছে, তাই সুলতানের সাথে তাদের একান্ত জরুরী কথা আছে। এভাবে সুলতানের একান্ত সান্নিধ্যে গিয়ে তাকে হত্যা করবে।
হিন্দু গোয়েন্দার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধারের পর ওকে বেঁধে রাখলো উবায়দের গোয়েন্দা দল। তারা জঙ্গলের আরো ভেতরের দিকে চলে গেলো।
