এরা দৃষ্টিগোচর হতেই সমবেত সকল হিন্দু দু’হাত জোড় করে প্রণাম করলো। বুগরা খান ও আলাসতুগীন হাত প্রসারিতও করেনি, প্রণামও করেনি। তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওদের দিকে তাকিয়ে আত্মহারা হয়ে গেলো। তরুণীদ্বয় ধীরে ধীরে পায়চারি করতে লাগলো, তাদের পা যেনো মাটি থেকে উপরেই উঠছিলো না। সব মানুষ ওদের প্রণাম শেষে মাথা সোজা করে ওদের দিকে হাত প্রসারিত করে করজোড় নিবেদনের ভঙ্গিতে বসে রইলো। তরুণীরা ধীরে ধীরে রঙিন কাপড়ের আসন দুটিতে বসতেই তাদের অর্ধেক কাপড়ের আড়ালে চলে গেলো। দেখতে দেখতে তরুণীদ্বয় সেই আসনের মধ্যেই গায়েব হয়ে গেলো।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তাদের উদ্দেশ্যে বললো, “যাও, কাপড়ের আসনে তাদের দেখো।”
বুগরা খান ও আলাসতুগীন আসনের দিকে অগ্রসর হয়ে চার-পাঁচ কদম থাকতেই দুটি কবুতর সেখান থেকে উড়ে চলে গেলো। তারা কাছে গিয়ে শূন্য গালিচা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না।
“এরা তো দেবী। শুধু তোমাদের জন্যই মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলো।” বললো এক পুরোহিত। “তারা তোমাদের আশীর্বাদ দিয়েছে। আজ থেকে তোমরা আমাদের রাজা আর আমরা তোমাদের দাস মাত্র। তোমাদের আগের জীবনের কথা স্মরণ করো, কোথায় ছিলে তোমরা, কি ছিলো তোমাদের মর্যাদা ও সম্মান! আর আজ কোথায় এসেছে তোমরা। দেবীরা বলে গেছেন, তোমাদের সেবার জন্য তাদের মতোই দুই রূপসী সুন্দরী মানুষ তোমাদের কাছে পাঠাবেন।”
“এরা কি আমাদের সামনে দেখা দেবে?” জানতে চাইলো বুগরা খান।
“দেব-দেবীরা তো আর আমাদের ইচ্ছাধীন নন।” বললো প্রধান পুরোহিত। “তোমরা নগরকোট মন্দিরের মূর্তি ভাঙ্গনে শরীক ছিলে না বলেই দেবীরা তোমাদের উপর খুশি। মূর্তির অবমাননাকারী সুলতান থেকে তোমরা দূরে ছিলে।… এই দেবীরাও মূর্তির মতোই সুন্দরী। এদেরকেই পাথরের মতো মনে ৪ হবে। আমি তোমাদেরকে তাদের আসল রূপও দেখাবো।”
দেবীর প্রদর্শনী দেখে বুগরা খান ও আলাসতুগীন যখন তাদের কক্ষে এলো, তখন আলাসতুগীন বুগরা খানের উদ্দেশ্যে বললো, “আমরা জানতাম হিন্দুরা ভূত ওঁ পূজা করে, ওদের ধর্ম বাতিল ধর্ম। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে এরা ইলমে গায়েব জানে।… আচ্ছা আমরা কিসের ইবাদত করি।”
যোগী-সন্ন্যাসী ও জাদুর প্রভাবে ইসলামের তাওহীদ সম্পর্কেই ওদের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়। এরা হিন্দুদের দেব-দেবীকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। মানুষ তখনই পথভ্রষ্ট হয় যখন মনোদৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধুই দৈহিক তৃপ্তির মধ্যে ডুবে যায়। তখন শারীরিক প্রয়োজন পূরণের জিনিসকেই মানুষ মহা সত্য বলে বিশ্বাস করতে থাকে। এমন পর্যায়ে মানুষ জাদুটোনাকেই মুজিযা ভাবতে থাকে এবং ধোকা, প্রতারণা ও ফাঁকিবাজিকেই সত্যের মাপকাঠি বলে বিশ্বাস করে। মানুষ যে পরিমাণ প্রবৃত্তিপূজারী হয়, সেই পরিমাণে তার জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেতে থাকে এবং ভ্রান্তির মধ্যেই আত্মতৃপ্তি লাভ করে।
* * *
“অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, ওদের দেশে জাদুটোনা নেই।” সঙ্গীদের বললো থানেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। নয়তো এরা এই কাজ দেখে এতোটা বিস্মিত হতো না। আমাদের দেশে কাউকে এভাবে গায়েব করে ফেলা খুবই সাধারণ ঘটনা।… এদেরকে আরো কিছু বিস্ময় দেখাও। আমার মনে হচ্ছে, এদেরকে এখন আমরা নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারবো। এদের হাতে সুলতান মাহমূদকে খুন করাতে না পারলেও নগরকোটে অবস্থানকারী সেনাপতি ও অন্যান্যদের ঠিকই হত্যা করানো সম্ভব হবে।”
“জাদুর সাথে আমাদের ওষুধপত্রও কার্যকর ভূমিকা রাখবে”- বললো নেশাদ্রব্যের অভিজ্ঞ কবিরাজ। “ওদের এখন মেয়েদেরকে প্রেতাত্মারূপে দেখাবো।”
মন্দিরের বেদীতে দুটি চৌবাচ্চা ছিলো। এগুলোতে ফুলের নকশা করা কাপড় বিছিয়ে দেয়া হলো। চৌবাচ্চার পাশে লোবানের বাতি জ্বলছে। জ্বলন্ত লোবানের ধোয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে একেবেঁকে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আর মূর্তিগুলোকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। বাতিগুলো রাখা ছিলো মূর্তির নীচে ও পেছনে। তাতে মূর্তিগুলো আরো ঝকমকে মনোহরী দেখাচ্ছিলো।
সেই দুই তরুণী সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় চৌবাচ্চার মধ্যে দাঁড়ানো ছিলো। ওদের চোখ বন্ধ। কোন নড়াচড়া নেই। ঠিক মূর্তির মতোই ঠায় স্থির হয়ে দাঁড়ানো। লোবানের ধোয়ার কুণ্ডলী অপসারিত হয়ে ওদের চেহারা পরিষ্কার হয়ে উঠলে পুরোহিত সবাইকে মাথা নিচু করে মূর্তিকে সিজদা করার নির্দেশ দিলো। অন্যদের সাথে বুগরা খান ও আলসতুগীনও সিজদায় লুটিয়ে পড়লো।
সেই মূর্তি দর্শনের পর কুগরা খান ও আলাসতুগীনের ঈমানের শেষ চিহ্নটিও বিলীন হয়ে গেলো। তাদেরকে মদ-নারী ও নেশায় ডুবিয়ে রাখার সকল ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। জাদুটোনা আর শারীরিক আমোদ-ফুর্তির মধ্যে ওদের মাতিয়ে রাখা হলো। সন্ন্যাসী ও জাদুকররা যখন নিশ্চিত হলো, হিন্দুদের এসব ছলচাতুরীর রহস্য ভেদ করে ওদের পক্ষে তাওহীদের বিশ্বাসে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখন মন্দিরের পুরোহিতরা তাদের মনে সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াতে লাগলো।
“সুলতান মাহমূদ একটা ডাকাত, ধুনী, সন্ত্রাসী। সে হিন্দুস্থানে সুন্দরী নারী আর ধন-রত্ন লুট করতে আসে।” বলতে শুরু করলো পুরোহিত। বুগরা খান ও আলাসতুগীনের উদ্দেশ্যে বললো, “তোমরাই বলল, যে দেবীদের তোমরা দেখেছো, তোমরা কি তাদের অসম্মান করতে পারবে? যে দেবীরা তোমাদেরকে খুনাখুনি ও কঠিন জীবন থেকে উদ্ধার করে এমন শাহী জীবন দান করেছে, তাদের মূর্তিকে কি তোমরা নিজ হাতে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে? এখন তোমাদের জন্য এ আনন্দময় জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো সেই পাষণ্ড ডাকাত। সে যদি এখানে এসে মূর্তি ভাংতে শুরু করে, তাহলে তোমাদের শরীরে আগুন ধরে যাবে। যদি দেবদেবীর একটি অঙ্গ ভেঙ্গে যায়, তাহলে তোমাদের শরীরেরও অঙ্গ ভেঙ্গে যাবে। দেবদেবীদের কোন মৃত্যু নেই, তাই তোমাদেরও মরণ হবে না। কিন্তু তোমরা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাবে। আর সেই দিনের মতো জঙ্গলে পড়ে পড়ে যন্ত্রণায় ধুঁকতে থাকবে, যেখান থেকে এ দেবীরা তোমাদের তুলে এনে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুলেছিলো।”
