রাজা আনন্দ পাল যখন মণি-মুক্তা ও খিরাজের লোভ দেখিয়েও থানেশ্বর আক্রমণ থেকে সুলতান মাহমূদকে নিবৃত করতে পারলো না, তখন দিল্লী, আজমীর, কনৌজেও রাজা-মহারাজাদের কাছে এই বলে দূত পাঠালো যে, গজনীর সুলতান বিনা উস্কানিতে থানেশ্বর মন্দির আক্রমণের জন্য ভারতের সীমানায় প্রবেশ করেছে। বানেশ্বরের বিষ্ণু মন্দির ধ্বংস করাই তার এবারের আক্রমণের উদ্দেশ্য।
***
এদিকে থানেশ্বরে সুলতান মাহমূদ গযনবীকে হত্যার সব ব্যবস্থা পাকাঁপোক্ত হয়ে গেছে। ১০১১ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ৮০৬ হিজরী সন। সুলতান নগরকোট থেকে গজনী ফিরে যাওয়ার এখনও বছর পূর্ণ হয়নি। এতো দিনের মধ্যে তার দু’কমান্ডার বুগরা খান ও আলাসতুগীন রাজধানীতে ফিরে না আসায় তাদের পরিবারে সংবাদ দেয়া হলো, তাদের নিহত হওয়ার কোন প্রমাণ সেনাবাহিনীর হাতে নেই। সম্ভবত তারা হিন্দুদের হাতে বন্দী রয়েছে।
ওরা তো আসলে হিন্দুদের বন্দী ছিলো না। ছিলো শাহজাদা হিসেবে। জাদুটোনা ও নেশাগ্রস্ত করে এদেরকে থানেশ্বর মন্দিরে এনে দুটি রাজকীয় আসবাবপত্রে সাজানো কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের সেবার জন্য দেয়া হয়েছে উদ্ভিন্ন যৌবনা সেবিকা।
বুগরা খানের পায়ের যখম ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। সে এখন রীতিমতো হাঁটা-চলা ও সওয়ার হতে পারছে। বুগরা খান স্থানীয় হিন্দুদের ভাষা জানতো। এ জন্য সে-ই তাদের মেজবানের সাথে কথাবার্তা বলতো। দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দিয়ে গল্পগুজব করে আর মদ ও নারীর মদির নেশায় সময় কাটিয়ে দিতো।
যে দুই তরুণী ওদের দুজনকে পথ ভুলিয়ে প্রেমের ছলনা ও নেশাদ্রব্য খাইয়ে থানেশ্বর মন্দিরে নিয়ে আসে, ওদের থানেশ্বর পৌঁছে দিয়ে এই তরুণীদ্বয় ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। কয়েকদিন ওদের জায়গায় নতুন তরুণীদের দেখে অবশেষে বুগরা খানকে তার বন্ধু আলাসতুগীন বললো, ওদের জিজ্ঞেস করো, আগের সেই তরুণীরা কোথায়। ওদের না পেলে আমি এখানে থাকবো না, আমাদের সেনাবাহিনীতে ফিরে যাবো।
যে জাদুকর দরবেশের বেশ ধারণ করে বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে বিভ্রান্ত করে থানেশ্বর নিয়ে এসেছিলো, একদিন বুগরা খান তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমাদেরকে যে দুটি মেয়ে আগে সেবাযত্ন করতো তারা কোথায়?
“তোমরা কি দেবীদেরকে তোমাদের মনোরঞ্জনের জন্য পেতে চাও। তারা তো মানুষ ছিলো না। তোমরা যেহেতু নগরকোট মন্দিরের মূর্তি ভাঙ্গায় শরীক ছিলে না, এ জন্য দেবীরা তোমাদের অসহায়ত্বের সময় মানুষের রূপ ধারণ করে তোমাদের সেবা করেছেন।
মানুষের মতোই তোমাদের সাথে ব্যবহার করেছেন।… তোমরা যখন তাদের ভালোবাসা চেয়েছে, তারা তোমাদেরকে প্রেম দিয়েছেন। কিন্তু তোমাদেরকে অসৎ উদ্দেশ্য থেকে বিরত রেখেছেন। তোমরা যখন তাদের কাছে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কথা বলেছে, তখন তারা হাসি-তামাশা করে তা এড়িয়ে গেছেন। তারাই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমাদেরকে যেমন সেনাবাহিনী থেকে বের করে এনে হত্যা, খুনাখুনি ও যুদ্ধবিগ্রহ থেকে আলাদা করে রাজকীয়ভাবে সেবাযত্ন করা হয়।”
“আরে না, তোমার কথা ঠিক নয়। ওরা ঠিকই মানুষ ছিলো” দৃঢ়তার সাথে বললো বুগরা খান।
বুগরা খানের চোখে চোখ রেখে জাদুকর সন্ন্যাসী বললো, “না, তারা মানুষ ছিলেন না। তোমরা তাদের ভক্ত। তোমাদের হৃদয় তাদের প্রেমে পাগল।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তাদের ভক্ত। তাদের পূজারী।… আমার হৃদয় তাদের হৃদয়ের পিঞ্জিরায় আটকানো।” উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বলতে লাগলো বুগরা খান।
ততদিনে বুগরা খানের দেমাগ সন্ন্যাসী জাদুকর সম্পূর্ণই বদলে দিয়েছে। বুগরা খানের স্বাভাবিক বিবেকবোধ চাপা পড়ে গিয়েছিলো। এখন জাদুকর যা বলতো এবং যা ভাবতো, বুগরা খান তাই সত্য ভাবতো। শুধু বুগরা খান নয়, আলাসতুগীনও বুগরা খানের মতোই জাদুকরী প্রভাব ও মদের ক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিলো।
বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে মন্দিরে রাজার হালে প্রতিপালন করা হচ্ছিলো। তারা যখন বাইরে বের হতো, তখন সাধারণ হিন্দুরা তাদের দেখে মাথা নীচু করে তাদের কুর্নিশ করতো। এতে এরা নিজেদেরকে রাজা রাজা ভাবতো। টানা দু’তিন মাস এদের উপর চললো জাদুকর ও সন্ন্যাসীদের কারসাজি। এক পর্যায়ে যখন সন্ন্যাসীরা বুঝলো যে, এদের নিজস্ব বিবেক বোধ আর অবশিষ্ট নেই, নিজেদের মতো করে কোনকিছু ভাবার মতো বুদ্ধি এদের লোপ পেয়েছে, তখন তাদেরকে একদিন বলা হলো, দেবীরা তাদেরকে ডেকেছে। দেবীর ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য এদেরকে থানেশ্বর মন্দির সংলগ্ন বাগানে নিয়ে গেলো পুরোহিতরা। রাতের অন্ধকারে বাগানের দৃশ্য ছিলো মনোরম। তাদেরকে একটি রাজকীয় মসনদে বসানো হলো। তাদের আসনের চারপাশে জ্বালানো হলো রঙ-বেরঙের ঝাড় বাতি। তাদের বসার জায়গা থেকে পনের-বিশ হাত দূরে দু’টি কাপড়ের গালিচা বিছিয়ে দেয়া হলো। রঙিন বাতির আলোয় গালিচাগুলো তারার মতো ঝলমল করছিলো।
এদিকে ধীরে ধীরে সেতারের বাজনা শুরু হলো। সেই সাথে ভেসে এলো বাঁশির সুর। বাঁশি ও সেতারের মিলিত আওয়াজে রাতের পরিবেশটা হয়ে উঠলো স্বপ্নিল। স্বপ্নিল সুরের মূর্ঘনার মধ্যে হঠাৎ সামনে চলে এলো সেই দুই তরুণী। কেউ বলতেই পারলো না এরা কী ফুলেল কাপড়ের আড়াল থেকে বের হয়েছে, না ফুলের ভেতর থেকেই প্রকাশ পেয়েছে। এদের পরনে এমন পাতলা সূক্ষ্ম কাপড় যে ওদের দেহবল্লরী উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। তাদের মাথায় কোন ধরনের নিকাব ছিলো না। তাদের রেশমী চুলগুলো আলুথালুভাবে ঘাড়ের উপর ও বুকের উপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিলো। রাতের স্নিগ্ধ সমীরণে উড়ন্ত রেমশী চুলগুলো গুদের রূপ-সৌন্দর্যকে আরো শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিলো।
