সেদিনের সূর্য ডোবার আগেই সূরীদের সূর্য চিরদিনের জন্য ডুবে গেলো। মুহাম্মদ বিন সূরী পালানোর অবকাশ পেলো না। একটি খাদের আড়াল থেকে দু’জন অনুচরসহ মুহাম্মদ বিন সূরীকে পাকড়াও করে সুলতানের সামনে হাজির করা হলো।
মুহাম্মদ! মাত্র একদিন আগে আমি তোমাকে যা লিখেছিলাম, তা আজ বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। তোমাকে পরাজিত করে আমি মোটেও উফুল্ল নই। এই লড়াইয়ে যে রক্তক্ষয় হয়েছে সেই রক্ত অন্য কাজে ব্যবহার করা উচিত ছিলো। আল্লাহর এই বিষয়টা আমি বুঝতে পারি না, শাসকের পাপের প্রায়শ্চিত্ত নিরপরাধ নাগরিকদের কেন ভোগ করতে হয়!
সুলতান মাহমূদ বলছিলেন আর এদিকে মুহাম্মদ বিন সূরীর শরীর নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ছিলো। প্রথমে তার মাথা হাঁটুর ফাঁকে ঝুঁকে পড়লো। এরপর গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে এবং একটা কাঁপুনী দিয়ে শরীরটা নিথর হয়ে গেলো। প্রহরীরা তাকে ধরে উঠাতে গেলো। দেখা গেলো, তার চোখ উল্টে গেছে এবং তার শরীর থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে।
মুহাম্মদ বিন সূরীর সাথে তার যে দু’জন অনুচর ছিলো তারা জানালো, সূরীর হাতের আংটিতে একটি বিষাক্ত হীরা ছিলো। পরাজয় ও পাকড়াও অনিবার্য হয়ে পড়ায় সে আংটির হীরাটি খুলে গিলে ফেলে। ঠিক সেই সময়ই সৈন্যরা আমাদের পাকড়াও করে এখানে নিয়ে আসে।
১০১০ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ৮০১ হিজরী সনের গ্রীষ্মকালে সংঘটিত হয়েছিলো এই যুদ্ধ।
হিন্দুস্তান থেকে গজনী ফিরে আসার মধ্যে ছয়-সাত মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে সুলতান মাহমূদের কাছে খবর আসতে লাগলো, দিল্লী থেকে ত্রিশ-চল্লিশ মাইল দূরে থানেশ্বরে একটি বিশাল মন্দির রয়েছে। সেখানে নানা ধরনের মূর্তি রয়েছে। বিশেষ করে বিষ্ণু দেবতার মূর্তিকে মানুষ আদমের চেয়েও বেশি পুরনো মনে করে। সেটির বেদীতে পূজা দেয়ার জন্য বহু দূর থেকে পূজারীরা আসে এবং বিষ্ণুকে পূজা দিতে পারলে হিন্দুরা মুসলমানদের কাবা জিয়ারতের মতো পুণ্যলাভ করে বলে সুখানুভব করে।
পৌত্তলিকতা বিরোধী আকীদা ও বিশ্বাসের কারণেই সুলতান মাহমূদ সকল মূর্তি ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সাথে তার গোয়েন্দারা তার কাছে রীতিমতো খবর পাঠাচ্ছিলো যে, নগরকোট ও খিদরের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর হিন্দুরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছে। চোখের সামনে তাদের দেব-দেবীদের এহেন দুর্গতি ও ধ্বংসের পরও মুসলমানদের কোন ক্ষতি না হওয়ায় অনেকেই হতাশ। সেই সাথে মুসলিম সৈন্যরা তাদের সামনে অসংখ্য গরুকে জবাই করে খেয়ে ফেলে। যে গরুকে হিন্দুরা গো-মাতা বা গো-দেবতা হিসেবে পূজা করে এবং তারা গরুর গোশত খাওয়া হারাম মনে করে।
সুলতানের সৈন্যরা তার কাছে খবর পাঠাতে লাগলো, গোটা হিন্দুস্তানের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গোটা জাতিই ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা এমনই ভয়াবহ যে, আকাশের গর্জন শুনেও এরা মূর্তির সামনে হাত জোড় করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয় নিরাপত্তা কামনা করে। এই পরিস্থিতিটা সুলতান মাহমূদের সহায়ক ছিলো। সূরীকে চিরদিনের জন্য নিঃশেষ করে দীর্ঘ বিশ্রাম না নিয়েই তিনি পেশোয়ারের দিকে অভিযানের নির্দেশ দিলেন। পেশোয়ার পৌঁছেই তিনি বেরা ও নগরকোটে দু’জন পয়গাম বাহক আর দূতকে পাঠালেন। নগরকোটের সৈন্যদের বলা হলো সম্পূর্ণ রণপ্রস্তুতি নিয়ে রাখতে। কারণ, সুলতান থানেশ্বর অভিযান চালাতে আসছেন।
বিশেষ দূতকে রাজা আনন্দ পালের রাজধানী পাঞ্জাবে পাঠানো হলো এই সংবাদ দিয়ে যে, সুলতানের বাহিনী পাঞ্জাবের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করবে। চুক্তি অনুযায়ী রাজা আনন্দ পালের কর্তব্য হলো, সুলতানের বাহিনীর নিরাপদে পথ অতিক্রম করার ব্যবস্থা করা। তাদের গমন পথে যেনো কেউ বাধা বিপত্তি সৃষ্টি না করে। সেই সাথে আনন্দ পাল অন্যান্য হিন্দুরাজ্যের সৈন্য একত্রিত করে যেনো মৈত্রী বাহিনী গঠনের চেষ্টা না করে। আনন্দ পাল এ ধরনের কিছু করলে বোঝা যাবে রাজা চুক্তি ভেঙ্গে দিয়েছেন। তাহলে সুলতানের কর্তব্য হয়ে পড়বে বাটান্ডা ও পাঞ্জাবে অভিযান চালিয়ে লাহোর ও পাঞ্জাবের দ্বিতীয় রাজধানী বাটান্ডার প্রতিটি ইট খুলে ফেলা।
রাজা আনন্দ পাল তার এক ভাইয়ের নেতৃত্বে দু’হাজার অশ্বারোহী সৈন্য সজ্জিত একটি বাহিনীকে পাঠায় সুলতান মাহমূদকে অভ্যর্থনার জন্য। সেই সাথে দলনেতার কাছে এই পয়গাম লিখে পাঠালো যে, এ আমার ভাই এবং দূত। একে আপনার কাছে এই অনুরোধসহ পাঠাচ্ছি যে, “থানেশ্বর আমাদের একটি পবিত্র মন্দির ও বড় পুণ্যস্থান। আপনার ধর্ম যদি আপনাকে অন্যদের ধর্মালয় ধ্বংসের নির্দেশ দিয়ে থাকে, তবে নগরকোট ধ্বংস করে আপনি সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, থানেশ্বরের ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন। এর পরিবর্তে আপনাকে আমি প্রতি বছর খাজনা দেবো। তাছাড়া আপনার বাহিনীর থানেশ্বর আসা-যাওয়ায় যতো খরচ হতো সবই আমি অগ্রিম দিয়ে দেবো। এর বাইরেও আমি আপনাকে পঞ্চাশটি হাতি ও মূল্যবান মণিমুক্তা উপঢৌকন দেব।”
ঐতিহাসিক ফারিতা লিখেন, সুলতান মাহমূদ আনন্দ পালের প্রস্তাবে লিখেন- “আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে আমার প্রতি নির্দেশ হলো, যেখানেই মূর্তিপূজা হয় সেখানে যাও এবং মূর্তি ধ্বংস করে দাও। এক্ষেত্রে আমার রাসূলের দৃষ্টিভঙ্গী হলো, মূর্তি ভাঙ্গার প্রতিদান আখেরাতে আল্লাহ দেবেন। মূর্তি না ভাঙ্গার অঙ্গীকার করে আপনার কাছ থেকে আমার পক্ষে কোন উপঢৌকন নেয়া সম্ভব নয়। থানেশ্বর মন্দিরের মূর্তিগুলো ধ্বংস না করার পক্ষে আমার কাছে কোন যৌক্তিক কারণ নেই।”
