সুলতানের দূত যখন মুহাম্মদ বিন সূরীর কাছে পয়গাম নিয়ে গেলো, সূরী রাজকীয় ভঙ্গীতে দূতের কাছ থেকে পয়গাম নিয়ে বললেন, “মৈত্রী চুক্তির জন্য পয়গাম নিয়ে এসেছো?” সূরীর প্রশ্নে দূত নীরব রইলো।
এক নিঃশ্বাসে মুহাম্মদ বিন সূরী সুলতানের পয়গাম পড়ে অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ে বললো, “তোমাদের সুলতান কি আমাকেও আনন্দপ লি আর বিজি রায় মনে করেছে! যাও, ওই ভূতটাকে বলো, মুহাম্মদ বিন সূরী তোমার কথায় রাজি নয়। যদি সাহস থাকে তাহলে তুমি এসো। আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য এখানে আসিনি।”
মুহাম্মদ বিন সূরী এক পর্যায়ে হুংকার দিয়ে দূতকে বললো, “যাও! ওই গোলামের পুত্র গোলামকে বলল, সে যেনো তাড়াতাড়ি এখানে এসে আমার সাথে দেখা করে এবং আসার সময় গজনী সালতানাতকেও যেন একটি পাত্রে করে নিয়ে আসে।”
সূরীদের কাছ থেকে সুলতান মাহমূদ এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করেননি। যুদ্ধ জয়ের চেয়ে এরা বেশি পারদর্শী ছিলো লুটতরাজে। সুলতান মাহমূদের পিতা সুলতান সুবক্তগীনের শাসনামলেও গোরীরা গজনীর আশপাশের এলাকায় লুটতরাজ করতো। এ পর্যায়ে সুলতান মাহমূদ এদেরকে চূড়ান্ত শিক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এর আগে কোনদিন গোরীরা গজনীর আশপাশে এসে সৈন্য সমাবেশ করার সাহস করেনি। এবারই প্রথম মুহাম্মদ বিন সূরী দশ হাজার গোরী সৈন্য নিয়ে গজনীর পার্শ্ববর্তী ময়দানে তাবু গাড়লো । সুলতান মাহমূদ তার দুই সেনাপতি জেনারেল আলতুনতাস ও জেনারেল আরসালান জাযেবকে বললেন, আমি গোরী শাসকদেরকে চূড়ান্ত শিক্ষা দিতে চাই। আপনারা এ জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিন।
সুলতান মাহমূদ বেশভূষা বদল করে সূরীদের ক্যাম্প পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। তিনি সূরীদের ক্যাম্প নির্মাণের কৌশল ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে মনে মনে ওদের প্রশংসা করলেন। সেই সাথে ওদের শিবিরকে কবরস্তানে পরিণত করার বিষয়টিও ভাবতে লাগলেন। কিন্তু সূরীদের শিবির উজাড় করার বিষয়টি তার দৃষ্টিতে মোটেও সহজসাধ্য মনে হচ্ছিলো না।
অনুরূপ একটা শিবির সুলতান খিদরী নামক স্থানে স্থাপন করেছিলেন। সে সময় শত্রুবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করে বটে কিন্তু তাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারেনি বরং শত্রুবাহিনীই নাস্তানাবুদ হয়। সূরীদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ এবং শিবির স্থাপন কৌশল দেখে সুলতান চিন্তান্বিত হলেন। তিনি পর্যবেক্ষণ শেষে শিবিরে পৌঁছে সেনাধ্যক্ষদের বললেন, শত্রুবাহিনী মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করে শিবির স্থাপন করেছে, ওদেরকে শিবির থেকে বের করে আনা সহজ হবে না।
সারারাত চললো সামরিক কৌশল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা। অবশেষে শেষরাতের মধ্যেই সৈন্যদের যাত্রা শুরুর নির্দেশ দিলেন তিনি। সৈন্যদেরকে শত্রু শিবির থেকে কিছুটা দূরে পূর্ণ রণপ্রস্তুতিতে থাকার নির্দেশ দিলেন। সকাল বেলা তিনিও গিয়ে সৈন্যদের সাথে যোগ দিলেন। সেখানে পৌঁছার সাথে সাথেই আক্রমণের হুকুম দিনে সুলতান। কিন্তু সূরী সৈন্যরা সুলতানের বাহিনীকে ওদের ক্যাম্পের ধারে কাছে যেতেও দিলো না। শেষ পর্যন্ত যে অংশে পরিখা নেই সেই অংশে একযোগে হামলে পড়ার নির্দেশ দিলেন। সূরীর সৈন্যরা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। তারা সুলতান মাহমূদের সৈন্যদের নাজেহাল করতে লাগলো।
সূরীরা ছিলো সুবিধা মতো স্থানে। তারা শিবির থেকে বেরিয়ে এসে সংঘর্ষে লিপ্ত হতো। কঠোর আক্রমণের মুখে পিছু চলে যেতো। মুখোমুখি ছাড়া আর কোন দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ করা সম্ভব ছিলো না। কারণ, তাদের শিবিরটি ছিলো তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত, সেই সাথে তাদের শিবিরগুলো পরিখা দিয়ে সুরক্ষিত।
দিনের প্রথম প্রহরে সহযোদ্ধা দুই জেনারেলকে নতুন একটি চালের কথা বললেন সুলতান। সেই কৌশল মতো যুদ্ধের কায়া বদলে ফেললেন। সুলতান নিজেও সেনাদলের মধ্যভাগে আক্রমণে শরীক হলেন। মুহাম্মদ বিন সূরী সুলতানকে এগিয়ে আসতে দেখে তার আক্রমণ প্রতিহত করতে আরো দুটি ইউনিটকে শিবিরের বাইরে গিয়ে আক্রমণ করতে নির্দেশ দিলো। তখন পর্যন্ত সূরীরা প্রাধান্য বজায় রেখেছিলো আর সুলতানের বাহিনী ছিলো অনেকটা চাপের সম্মুখীন।
তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে গেলো গজনী ও সূরী বাহিনীর মধ্যে। এক পর্যায়ে সুলতান ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি এমন নির্দেশ দিলেন যে, তার সৈন্যদেরকেও এ নির্দেশ হতবাক করলো। হঠাৎ তিনি নিজেই চিৎকার দিয়ে বললেন, “বন্ধুরা সবাই পালাও, সূরীরা নয়তো কাউকে জীবিত রাখবে না।” এ কথা বলে তিনি নিজেও ঘোড়া ঘুরিয়ে পিছু ছুটলেন। তার সারি থেকে আরো কয়েকজনের কণ্ঠে এ ধরনের আহ্বান শোনা গেলো।
সূরীদের কানেও গেলো এই আওয়াজ। মুহাম্মদ বিন সূরী সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো। অবস্থাদৃষ্টে সে গজনী বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দিলো । বললো, ওদের কাউকেই গজনী ফিরে যেতে দিও না। মাহমূদকে আমার সামনে জীবিত ধরে আনন, আর গজনীর প্রতিটি ইট খুলে ফেলো।
বিজয়ের আতিশয্যে সকল সূরী সৈন্য শিবির থেকে বেরিয়ে পড়লো। শিবির হয়ে পড়লো সৈন্যশূন্য। প্রায় মাইল তিনেক দূরে গিয়ে সুলতান মাহমূদ পিছুহটা মুলতবী করে পূর্ব নির্দেশ মতো পলায়নপর সৈন্যদেরকে পশ্চাদপসরণ না করে ঘুরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেন। সুলতানের সকল কমান্ডারের জানা ছিলো, এই পশ্চাদপসারণ সুলতানের একটা রণচাল। সুলতান ঘুরে দাঁড়িয়েই তাকে ধাওয়াকারী সূরী সৈন্যদের উপর বজ্র আক্রোশে হামলে পড়লেন। শুরু হলো তুমুল মোকাবেলা। এদিকে জেনারেল আরসালান এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিলেন। তিনি পেছন ঘুরে সূরীদের একপাশে আক্রমণ করলেন, আর অপরজন সূরীদের শিবিরে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, রণকৌশলে অনভিজ্ঞ সূরী বাহিনী সুলতানের দূরদর্শী ফাঁদে আটকে যায়। বস্তুত এবার গজনী বাহিনীর হাতে সূরী বাহিনী কচুকাটা হতে লাগলো।
