বুগরা খান ও আলাসতুগীনের জন্য মন্দিরের পাতালপুরীতে দুটি কক্ষ সাজানো হলো। কক্ষ দুটিকে রাজমহলের আদলে খুশবো ও বাহারী আসবাবপত্রে সাজানো হলো। তুলতুলে নরম বিছানার উপর গেলাফ বিছানো হলো। ছাদে ঝুলিয়ে দেয়া হলো রঙিন ফানুস। দুই কমান্ডার সেখানে পৌঁছলে তাদেরকে রাজকীয় অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হলো। অভ্যর্থনাকারীরা তাদের গমন পথে মাথা অবনত করে কুর্নিশ করলো। তাদের সাজানো কক্ষে পৌঁছে দেয়ার সাথে সাথেই কিছু মহিলা সেবার জন্য এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু এরা তরুণী নয়, বয়স্ক মহিলা।
কাফেলা থানেশ্বর পৌঁছার পরই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিন্দুদের আলাদা করে তাদের জানালো, সুলতান মাহমুদ গজনী চলে গেছে। সামান্য কিছু সংখ্যক সৈন্য নগরকোট রেখে গেছে। এটা জানা সম্ভব হয়নি, তাড়াতাড়ি সে ফিরে আসবে নাকি দীর্ঘ সময় সেখানে থাকবে। এমতাবস্থায় এদেরকে এখানে রাখার মধ্যে কোন লাভ আছে বলে মনে হয় না।
“সুলতান অবশ্যই আসবে পণ্ডিত মহারাজ!” বললো দুই আমলা। “এই দুই লোক আমাদের হাতে এসে গেছে। এদেরকে আমরা নিজেদের মতো করে তৈরি করতে পারবো। এরা আমাদের উপকারে আসবে। এদের দিয়েই আমরা মাহমূদকে খুন করাতে পারবো।”
দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর হিন্দু পুরোহিত ও সন্ন্যাসী জাদুকর ও আমলাদ্বয় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, বুগরাখান ও আলাসতুগীনকে থানেশ্বর মন্দিরেই রাখা হবে এবং এদের দিয়ে সুলতান মাহমুদকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
সুলতান মাহমূদ জরুরী খবর পেয়ে গজনী চলে এলেন। গজনীর পশ্চিমে গৌড় নামের একটি পাহাড়ী এলাকা শাসন করতো মুহাম্মদ বিন সূরী। মুহাম্মদ বিন সূরী সুলতান মাহমূদকে হিন্দুস্তানে ব্যস্ত দেখে দশ হাজার সদস্যের এক সৈন্য বাহিনী নিয়ে গজনীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এসে তাঁবু গাড়লেন। তাঁবুর চারপাশে পরিখাও খনন করলেন তিনি। তাছাড়া তার তাবুর তিনদিকেই ছিলো উঁচু পাহাড়। শুধু একদিকে পরিখা ও পাহাড় ছিলো না। চতুর্দিকে প্রাকৃতিক পাহাড়ী প্রতিরক্ষার কারণে মুহাম্মদ সূরীর তাবুটি দুর্গের মতো সুরক্ষিত প্রমাণিত হলো। ফলে তাবু থেকে কিছু সংখ্যক সৈন্য বেরিয়ে গজনী বাহিনীর উপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে দ্রুতগতিতে তাঁবুতে ফিরে যেতো। এভাবে তারা গজনী বাহিনীর চৌকিগুলোতে একের পর এক আক্রমণ করে বিপর্যস্ত করে তুলে।
দুদিন গজনী সেনাদের দুটি দল আক্রমণকারীদের তাড়া করে তাঁবু পর্যন্ত নিয়ে গেল কিন্তু তাঁবুর চতুর্দিকে পরিখা থাকায় আর সামনে অগ্রসর হতে পারলো না। যে পথটা ছিলো সেদিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতেই সেখানে থাকা তীরন্দাজরা তাদের উপর তীরবৃষ্টি বর্ষণ করলো। কিছুক্ষণ তীর নিক্ষেপের জবাবে তীর নিক্ষেপ করে ফিরে আসা ছাড়া কোন উপায় ছিলো না। গজনীর সৈন্যরা পেরেশান হয়ে গেলো সূরীদের আক্রমণে। সূরী বাহিনী গজনী বাহিনীর শক্তি ক্ষয় করে দুর্বল করার পর এক সময় আক্রমণ করে গজনী দখল করার চিন্তা করছিলো। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে গজনীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাপতি সুলতানকে বিষয়টি অবহিত করা জরুরী মনে করলেন।
সূরীদের গজনী আক্রমণের সংবাদ সুলতান মাহমুদের কাছে যখন পৌঁছল, তখন তিনি নগরকোট মন্দির ও সেনা শিবির অবরোধ করেছেন মাত্র। গজনী আক্রান্তের খবর শুনে সুলতানের মাথায় বাজ পড়লো। তিনি নগরকোটে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। প্রচণ্ড আক্রমণের কারণে নগরকোট দুর্গবাসীরা প্রতিরোধে টিকতে না পেরে হাতিয়ার ফেলে আত্মসমর্পণ করলো। দ্রুত মন্দির থেকে সব মূর্তি ফেলে দিয়ে দুর্গ দখল শেষে সেনাবাহিনীকে দু’ভাগে ভাগ করে একটি অংশ নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা করলেন আর একটি অংশ নগরকোট দুর্গের প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োগ করলেন।
এমনিতেই সুলতান মাহমূদের যাত্রা হতো অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে। কিন্তু সে দিনের মতো আর কখনো সুলতান মাহমূদকে এতোটা ক্ষুব্ধ দেখা যায়নি। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে সুলতান মাহমুদ গজনীতে পৌঁছে গেলেন। রাস্তায় তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, আমাদের সফর হবে খুবই দ্রুত। তাই তোমরা চলাবস্থায়ই সওয়ারীগুলোকে ফসলের ক্ষেতের মধ্যদিয়ে ছেড়ে দিও। উট, ঘোড়া, হাতিগুলো যাতে চলতে চলতে কিছুটা খেয়ে নিতে পারে। আর পদাতিক সৈন্যদেরকে তিনি বলে দিয়েছিলেন, তোমরা পথিমধ্যে কোন বসতি পেলে তাদেরকে খাবার দিতে নির্দেশ দিবে।
সুলতান মাহমূদ যুদ্ধ করতেন প্রতিপক্ষের সৈন্যদের সাথে। শাসকরাই হতে তার প্রতিপক্ষ। সাধারণ নাগরিকদের জন্য তিনি কখনো কষ্টের কারণ হননি। বরং তার সৈন্যরা বেসামরিক নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি গজনী আক্রান্তের কথা শুনে স্বজাতি গাদ্দার ও পরাজিত আনন্দ পালের মৈত্রী চুক্তিবিরোধী তৎপরতায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দ্রুত গজনী পৌঁছানোর জন্য তার সৈন্য ও সওয়ারদের এর বিকল্প ছিলো না।
সূরীদের ধারণার চেয়ে অনেক আগে সুলতান মাহমুদ গজনী পৌঁছে গেলেন। গজনী পৌঁছেই তিনি মুহাম্মদ বিন সূরীকে দূতের মাধ্যমে এই বলে পয়গাম পাঠালেন যে, “জাতির গাদ্দারদের পরিণতি কখনো ভালো হয় না। ইসলামী সালতানাতকে টুকরো টুকরো করে শাসনকারী ক্ষমতালিন্দুদের পায়ের তলা থেকে শুধু ক্ষমতার মসনুদই দূরে সরে যায় না, মাটিও থাকে না। জাতিকে প্রতারিত করে স্বজাতির মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে লিপ্তকারীদের শাস্তি দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে হাতে কুরআন নিয়ে অঙ্গীকারকারী শাসকদের রাজমহলই এক সময় জাহান্নামে পরিণত হয়।… নিজের আখেরাত ও জাগতিক মঙ্গল চাইলে শক্রতা না করে আমাকে সহযোগিতা করো। চলো আমার সাথে হিন্দুস্তানে। সেখানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আযাদ করা মুসলিম বসতিগুলো এখন মূর্তি পূজারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। চলো সেখানে গিয়ে পরিত্যক্ত বিরান মসজিদগুলোকে আবাদ করি এবং বিভ্রান্ত মুসলমান ও হিন্দুদেরকে সিরাতে মুস্তাকিমের পথ দেখাই।… আমি তোমাদের কাছে আবেদন করছি না। বেঈমানী ও ঈমানের সওদাগরী তোমাকে যেদিকে ঠেলে দিচ্ছে, আমি এর অশুভ পরিণতি দেখতে পেয়ে তোমাকে সতর্ক করছি। ক্ষমতার মোহ তোমাদের এমন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে যে, কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ তোমাদের নামে অভিশাপ বর্ষণ করবে। আমি তোমাকে দুদিনের অবকাশ দিচ্ছি। আমার সহযোগী হতে চাইলে এসো। নয়তো সৈন্যদের নিয়ে গজনী ছেড়ে চলে যাও।”
