হীরের টুকরো থেকে বিচ্ছুরিত রঙ আর সন্ন্যাসীর কথার মধ্যে এমন জাদু ছিলো যে বুগরা খান আত্মহারা হয়ে যেতে লাগলো। অর্ধ অবচেতন তো সে শরাব পান করেই হয়েছিলো। এবার সন্ন্যাসীর কথা ও জাদুকরী হীরের ঝিলিকে সে সম্পূর্ণ আত্মহারা হয়ে গেলো। সে মোটেও আন্দাজ করতে পারেনি যে, সন্ন্যাসী নিষ্পলক তার চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সন্ন্যাসী হীরের টুকরোটিকে উপরের দিকে তুলে তার চোখের সামনে রাখলো। বুগরা খান হীরার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। একসময় সন্ন্যাসী হীরের টুকরোটিকে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেললো। কিন্তু বুগরা খান তা মোটেও টের পেলো না। এবার বুগরা খান এক পলকে সন্ন্যাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সন্ন্যাসী এখন যা বলছে, চোখের দৃষ্টির মাধ্যমে তা বুগরা খানের ভেতরে প্রবেশ করছে। তার মধ্যে সৃষ্টি করছে স্বপ্নালুতা। সন্ন্যাসীর বলার ধরনও ছিলো মোহনীয়। সন্ন্যাসী এভাবে কথা বলছিলো যে, সে কোনো স্বপ্নিল জগতে বিচরণ করছে।
এক পর্যায়ে বুগরা খান বলতে শুরু করলো, “হ্যাঁ হ্যাঁ, এইতো আমি জান্নাত পেয়ে গেছি। আমার কাছ থেকে এ জান্নাত কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। হ্যাঁ, আমিই গজনীর বাদশাহ। আমি খুন করে ফেলবো। আমার তরবারী অনেক দিন কাউকে হত্যা করে না…।”
পাশে বসে আলাসতুগীন দেখছিলো সন্ন্যাসীর কর্মকাণ্ড। কিন্তু সে এসবের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলো না। শুধুই অবাক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলো।
এবার বুগরা খানকে ছেড়ে দিয়ে আলাসতুগীনকেও অনুরূপ পরীক্ষার নামে জাদুকরী প্রভাবে স্বপ্নিল জগতে বিচরণ করালো সন্ন্যাসী। কিছুক্ষণ পর সেও বুগরা খানের মতোই স্বপ্নিল জগতে বিচরণ করতে লাগলো।
মানুষ যখন অপরাধ ও পাপের মাধ্যমে নিজের কর্তব্যকে চেপে রাখে তখন ভোগবাদিতার স্বপ্নিল জগতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করে না। পাপাচার ও মদের বিস্ময়কর কার্যকারিতা হলো এসব মানুষের আত্মশক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। অমুসলিমরা শত শত বছর আগে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে যে স্বপ্নময় পাপাচারের দ্বারা আকৃষ্ট করতো, কৌশলের ধরন পরিবর্তন হলেও আজও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
ইসলাম একটি আদর্শ, সৎ চরিত্রের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে ইসলামের ভিত্তি। কিন্তু ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের পদানত করার জন্য পাপাচারের মনোহরি দিকটাকেই ব্যবহার করে। পাপাচারের মধ্যে এমন দুর্বিনীত আকর্ষণ রয়েছে যে, তা মানুষের দুর্বলতাগুলো উস্কে দেয় এবং আত্মশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। মুসলমানদের দুর্বলতা ও মূল শক্তির উৎসকে অগ্নিপূজারী পৌত্তলিক ও ইহুদীবাদীরা চিহ্নিত করে এগুলো নিঃশেষ করার নব নব কৌশল উদ্ভাবন করছে।
ইহুদীরা মুসলিম মেধা ও শক্তিগুলোকে ধ্বংস করার জন্য তাদের সুন্দরী ললনাদের ব্যবহার করেছে। খৃস্টানরা মুসলিম তরুণদের বিভ্রান্ত করতে আজও তাদের সুন্দরী কন্যা-জায়াদের ব্যবহার করে। মুসলিম তরুণদেরকে আজও চক্রান্তকারী ইহুদী-খৃস্টান-পৌত্তলিকরা মদের নেশা, নারী আর ধন-সম্পদের টোপ দিয়ে আদর্শচ্যুত করছে। ওদের মনোলাভা ফাঁদে পড়ে মুসলিম মিল্লাতের বহু বাঘা বাঘা সমাজপতিও ধ্বংস হয়ে গেছে।
বুগরা খান ও আলাসতুগীনের দেমাগ দুই রূপসী শরাব খাইয়ে আগেই কজা করে নিয়েছিলো। ওরা আক্ষরিক অর্থেই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। উভয়েই আত্মশক্তি ও বোধ হারিয়ে ফেলেছিলো। যোগী সন্ন্যাসীদের জাদুকরী তৎপরতা আজও বহাল রয়েছে। জাদুকরী প্রভাব প্রয়োগ করে এরা লাঠিকেও সাপে পরিণত করতে পারে। সমবেত বহুজনকে জাদু করে এরা বিভ্রান্ত করতে পারে। এখন তো জাদু একটি শিল্প হিসেবে সারা দুনিয়া জুড়ে আদৃত।
এই জাদুকরদের নিয়ে আসার জন্য দু’আমলাকে এখানে রেখে তারা অজ্ঞাত স্থানে চলে গিয়েছিলো। শুরুতে পুরোহিত তরুণীদের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে। তরুণী দুজন বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে উভয়েই তা প্রত্যাখ্যান করলো। এরপরই এদেরকে জাদু করে অন্ধভক্তে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয় পুরোহিত। মদ ও নারীর প্রভাব আগেই তাদেরকে আদর্শচ্যুত করে ফেলেছিল, বাকিটা যোগী এসে জাদু প্রয়োগ করে পূর্ণ করলো।
ভোরের আলো বিকশিত হওয়ার আগেই রওয়ানা হয়ে যাওয়া এই কাফেলা নগরকোট থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছিলো। বুগরা খান ও আলাসতুগীন ঘোড়ার পিঠে আর অন্যরা উটের পিঠে আরোহণ করেছে। হিন্দু পুরোহিত ও তার দুই আমলা সঙ্গীসহ জাদুকরও কাফেলার সহযাত্রী। বুগরা খান ও আলাসতুগীন রাজপুত্রের মতো মাথা উঁচু করে রাজকীয় চালে অশ্বের উপর উপবিষ্ট। ওরা তো
আনন্দে আত্মহারা আর যারা ওদেরকে জাদুকরী প্রভাবে গোলামে পরিণত করেছে, ওদের মুখে হাসি নেই; ওরা কার্য সিদ্ধি চূড়ান্ত করণের চিন্তায় মগ্ন।
কাফেলা চলতে চলতে মাঝে-মধ্যে পথে থামতে, আবার চলতো। আর বিশ্রামের সুযোগে বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে পানীয় ও খাবারে নেশাদ্রব্য খাওয়ানো অব্যাহত রাখলো। ধীরে ধীরে এরা নিজেদের ধর্ম-দেশ ও আদর্শ ভুলে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে লাগলো।
এক সময় কাফেলা থানেশ্বর পৌঁছলো। সেই যুগে থানেশ্বর মন্দির ছিলো ভারতের বিখ্যাত মন্দিরগুলোর শীর্ষ দুটির একটি। হিন্দুরা থানেশ্বর মন্দিরকে মুসলমানদের কাবার মতোই সম্মান করতো। থানেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের জানা ছিলো, গজনী বাহিনীর দু’কমান্ডারকে নেশাগ্রস্ত করে থানেশ্বর নিয়ে আসা হচ্ছে। এদের হাতে মাহমূদ গযনবীকে হত্যা করানো হবে। কেননা, নিজ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি ছাড়া কারো পক্ষে সুলতান মাহমূদের ধারে-কাছে যাওয়া সম্ভব নয়।
