“আপনি কি কখনো শরাব পান করেছেন? শুনেছি মুসলমানরা শরাব পান করে না।”
“হু, শরাবকে অভিশম্পাত করি আমি। তোমরা থাকতে আমার শরাবের কোনো প্রয়োজন নেই।” বললো বুগরা খান।
“আমি আপনাকে শরাবই তো পান করিয়েছি। বলুন তো এমন শরাবকে কেনো আপনারা হারাম মনে করেন?
বুগরা খান শরাব পানের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে যায় এবং ভাবনায় পড়ে গেলো। তরুণী বুগরা খানের আরো ঘনিষ্ঠ হতে থাকলো এবং বুগরা খানের চোখের সামনে নিজেকে মেলে ধরলো। খানের চোখে চোখ রাখতেই বুগরা খান ভুলে গেলো হালাল-হারামের বিধি-বিধান।
“আলাসতুগীন!” বন্ধুকে ডাকলো বুগরা খান।
আলাসতুগীন ছিলো ঝুপড়ির অপর কক্ষে। সে বন্ধুর ডাকে চলে এলো। বুগরা খান তাকে পেয়ালা দেখিয়ে বললো, “দেখো! সুন্দরীরা কী চমৎকার পানীয়কে শরাব বলছে। নাও, আমি পান করেছি, তুমিও পান করো। ভারী মজার জিনিস।”
আলাসতুগীন বন্ধুর কথায় পেয়ালা হাতে তুলে নিলো এবং পেয়ালার অবশিষ্টটুকু গলাধঃকরণ করলো। কিছুক্ষণ পর বুগরা খানের মতো সেও স্বপ্নীল জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলো।
গজনী বাহিনীর দু’কমান্ডার নিজেদের জন্য শরাব হালাল করে নিলো। তারা এটিকে শরাব বলতেই নারাজ। পরদিন দু’তরুণী তাদের ঘরে প্রবেশ করে দু’জনকে তাদের মুখোমুখি বসিয়ে বলতে লাগলো, “আমরা এ গ্রামের অধিবাসী নই। আমাদের অভিভাবকরা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। আপনাদের সৈন্যরা যখন নগরকোট মন্দির অবরোধ করে তখন আমরা মন্দিরে পূজা দিতে যাচ্ছিলাম। অবরোধের কথা শুনে আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং নিজ বাড়িতে না গিয়ে এই পল্লীতে নিয়ে আসে। গ্রামের লোকজনকে বলে, গজনী বাহিনী নগরকোট দুর্গ অবরোধ করে এমতাবস্থায় তরুণী মেয়েদের নিয়ে যাতায়াত করা ঝুঁকিপূর্ণ। আপনারা আমাদের মেয়েদেরকে হেফাজত করুন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা মেয়েদের নিয়ে যাবো। আমাদের সাথে অপর যে মেয়েটিকে দেখছেন, ও আমাদের প্রতিবেশী। আমাদের অভিভাবক আমাদের নিতে এসেছেন। আপনারা দু’জন আমাদের সাথে চলুন। আমরা বললে আপনাদেরকে নিতেও রাজি হয়ে যাবে।”
বুগরা খানকে তরুণীদ্বয় বললো, আপনি আপনার বন্ধুকেও ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলুন।
বুগরা খান তরুণীদের প্রস্তাবের কথা আলাসতুগীনকে নিজের ভাষায় জানালে সে বললো, “আমরা সেনাবাহিনীর লোক। ওদের সাথে আমাদের যেতে দেখা অবস্থায় আমরা ধরা পড়লে আমরা গাদ্দার ও পক্ষত্যাগী সৈনিক হিসেবে চিহ্নিত হবো। সেনা আইনে আমাদের মৃত্যুদণ্ড হবে। এই তরুণীরা যদি আমাদের সাথে থাকতে চায় তাহলে ওদের এখানেই থাকতে বলল। এদেরকে আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থার কথা চিন্তা করবো। ওদের উচিত আমাদের সাথে থাকা।”
তরুণীদ্বয় হতাশ হয়ে চলে গেলো। একটু পর তাদের ঝুপড়িতে প্রবেশ করলো দুই প্রবীণ। তারা বললো, “আমরা দুজন এ মেয়েগুলোর অভিভাবক। ওরা হয়তো আমাদের পরিচয় দিয়েছে। এই যুবতী মেয়েদেরকে নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আপনারা যদি আমাদের সাথে থাকেন তাহলে রাস্তায় মেয়েদের কেউ অপহরণ করার চিন্তাও করবে না। আপনারা এর বিনিময়ে যা চান তাই দেয়া হবে।”
“আমরা তোমাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি কিন্তু পুরস্কার হিসেবে এই মেয়ে দুটোকে চাই। এ প্রস্তাব যদি তোমাদের পছন্দ না হয় তাহলে একাই চলে যেতে পারো।” বললো বুগরা খান।
“এদের জন্যই তো আমরা এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি হয়েছি আর এতটা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি।” বললো একজন। “আমরা মেয়েদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেবে কোন্ যুক্তিতে!”
“রাখো তোমাদের যুক্তি। তোমরা মেয়েদেরকে এখান থেকে নিতেই পারবে না।” ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো বুগরা খান।
***
সেদিন রাতের ঘটনা। উভয় তরুণী বুগরা খান ও আলাসতুগীনের পাশে বসে তাদেরকে শরাব পান করাচ্ছিলো। শরাবের নেশায় উভয়েই ছিলো নেশাগ্রস্ত। ঝুপড়ির দরজা ছিলো খোলা। রাতের প্রথম প্রহরের পর ঝুপড়িতে সন্ন্যাসীর মতো এক লোক প্রবেশ করে। লম্বা চুল ও চোয়াল ভরা দাড়ি। লোকটি চোগা পরিহিত। হাতে লম্বা লাঠি। লাঠির মাথায় কাঠের তৈরি সাপের প্রতিকৃতি। তরুণীদ্বয় সন্ন্যাসীকে দেখেই চকিতে ওঠে এসে তার পায়ে হাত রেখে প্রণাম করে এবং বুগরা খান ও আলাসতুগীনকে জানায়, “ইনি একজন সন্ন্যাসী। এপথে হঠাৎ করে আসেন। কেউ তার ঠিকানা জানে না এবং তার ধর্মের কথাও বলতে পারে না। এই সন্ন্যাসী ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। জঙ্গলের সাপও তার কথা শুনে। রাজা-মহারাজা তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে কিন্তু তিনি দুনিয়ার কোনো সুখ-আহ্লাদ ভোগ করেন না। জঙ্গলেই থাকেন।”
“তোমার তো জীবিত থাকার কথা ছিলো না। এতোটাই উপর থেকে তুমি পড়েছিলে যে মৃত্যুর আশংকা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। এসো, আমার কাছে এসো।” বললো সন্ন্যাসীরূপী লোকটি।
সন্ন্যাসী বুগরা খানকে তার সামনে বসিয়ে প্রদীপটি কাছে টেনে নিলো। সে পকেট থেকে একটা হীরার মতো কিছু বের করে বুগরা খান ও তার মাঝখানে এমনভাবে প্রলো যে, প্রদীপের আলো পড়তেই সেটি থেকে বিভিন্ন রঙ বিচ্ছুরিত হতে থাকে। রঙের এই খেলা ছিলো খুবই মনোহরি।
সন্ন্যাসী বুগরা খানকে বললো, “এদিকে তাকাও এবং হীরাটি দেখতে থাকো। লক্ষ্য করো, এর মধ্যে তুমি জীবন-মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখতে পাবে। আমি পরীক্ষা করে দেখবো, কোন্ ঘরে আছে তোমার আত্মা- মৃত্যুর ঘরে না জীবনের ঘরে।”
