বুগরা খান বন্ধু আলাসতুগীনকে জানালো, তার ব্যথা অনেকটাই কমেছে। আলাসতুগীন দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলো। বুগরা খানের বুঝতে বাকি রইলো না বন্ধু কিসের জন্য দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তরুণীর বদলে ঘরে প্রবেশ করলো তাদের চিকিৎসক দুই বৃদ্ধ। এদের দু’জনকে গ্রাম্য অশিক্ষিত মনে হলেও হাবভাব দেখে মনে হলো পেশাগত কাজে তারা খুবই দক্ষ। তারা ঘরে প্রবেশ করে বুগরা খানের ক্ষতস্থান থেকে পট্টি খুললো, ভাঙ্গা পা দেখলো এবং শেষে দু’জন রায় দিলো, সম্পূর্ণ সেরে উঠতে আরো দিন দশেক লাগবে।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে আরেকটি ঝুপড়ি ঘরে দুহিন্দু কর্মকর্তার সামনে তিন তরুণী উপবিষ্ট। এক কর্মকর্তা তরুণীদের উদ্দেশে বললো, “তোমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। দু’তিন দিন ওদের কাছে বেশিক্ষণ থাকবে না। তাহলে ওদের সন্দেহ হতে পারে। দুধ নিজেরা পান করে পরীক্ষা করে নিও। স্বাদে কোনো তারতম্য ঘটলে তাতে আরো দুধ দিয়ে বেশি করে মধু মিশিয়ে নিও।”
“নেশা ধরানোর ব্যাপারে তোমরাই তো যথেষ্ট। দুধে নেশা মেশানো ছাড়া তোমরাই ওদের নেশাগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট।” বললো অপর কর্মকর্তা।
খেয়াল রেখো, তোমরা যেনো আবার নেশায় আক্রান্ত না হয়ে যাও।” বললো অপর কর্মকর্তা। কারণ উভয়েই কিন্তু তাগড়া যুবক।”
“হয়তো এর চেয়েও আরো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে তোমাদের।” বললো এক কর্মকর্তা। নিজের দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তোমাদের এই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। এখন তোমাদের কর্তব্য হলো, পণ্ডিত মহারাজের আসা পর্যন্ত ওদেরকে এখানে আটকে রাখা। পণ্ডিতজী একজন দক্ষ ঋষিকে সাথে নিয়ে আসবেন। তিনি এসে এদেরকে ভক্তে পরিণত করবেন। এরপর দেখো, এদের হাতেই আমরা সুলতানকে হত্যা করাবো।”
সুলতান মাহমুদের দুই খ্যাতিমান কমান্ডার হিন্দুদের চক্রান্তের ফাঁদে আটকে গেলো। দু’তিন দিনের মধ্যেই এরা তাদের কর্তব্য, দায়িত্ব ও অভিষ্ট লক্ষ্যের কথা বিস্তৃত হয়ে গেলো। তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, দুধ ও মধুর সাথে মিশিয়ে তাদেরকে প্রতিদিন নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করানো হচ্ছে। এরা যেহেতু শরাব পানে অভ্যস্ত ছিলো না, তাই দুধ ও মধুর সাথে মেশানো সামান্য শরাবেই ওরা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতো। সেই সাথে রূপসী তিন তরুণীও ওদের মধ্যে সৃষ্টি করে প্রচণ্ড কামনার নেশা।
এভাবে যখন প্রায় সপ্তাহ চলে গেলো। একদিন এক তরুণী বুগরা খান এবং আরেক তরুণী আলাসতুগীনের গায়ে গা মিশিয়ে আবেগ ও বিনয়ী কণ্ঠে নিবেদন করলো, তাদেরকে যেনো সাথে করে গজনী নিয়ে যাওয়া হয়। দু’কমান্ডার এ কথাও ভাবতে পারেনি যে, এই এলাকার মানুষই তো সব কালো। এর মধ্যে সুন্দরী তরুণী আসলো কিভাবে। ওদের জন্মদাতাই বা কে?
দুই বৃদ্ধ বুগরা খানের সেবা-শুশ্রূষা করছিলো আর চিকিৎসা অব্যাহত রাখছিলো। এরই মধ্যে বুগরা খান অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠে। সে এখন নিজে নিজে হাঁটা-চলাফেরা করতে পারে। তবুও এ গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার কথা একবারও ভাবনায় আসেনি। কমান্ডার আলাসতুগীনের মনও ঝুপড়ির বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেছে। একদিন উভয় বন্ধু তরুণীদের বললো, রাতের বেলায় তারা যেনো এ ঘরে একবার আসে। তরুণীরা বললো, রাতের বেলায় এদিকে পা বাড়ালে মা-বাবা তাদের প্রাণে রাখবে না। তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে শুধু সেবা-শুশ্রূষা করতেই দিনের বেলা আসতে দেয়।
আসলে প্রশিক্ষিত এই তরুণীরা গজনী বাহিনীর দুই কমান্ডারের সুপ্ত কামনাকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছিলো। যুদ্ধক্লান্ত দুই কমান্ডারের জন্য তরুণীরা মরিচীকা হয়ে দেখা দিলো। তারা যেভাবে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে দু’কমান্ডারের প্রতি ভালোভাসা ও মমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতো, তাতে কমান্ডারদের মধ্যে প্রেমের দুর্বিনীত আকর্ষণ সৃষ্টি করে। যৌবনে উদ্দীপ্ত দুই যুবক কমান্ডার যখন রূপসী-তরুণীদের নাঙ্গা কাঁধের উপর বিক্ষিপ্ত রেশমী চুলগুলো নিয়ে খেলা করতো, তখন ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে কামনার দানব তর্জন-গর্জন শুরু করে দিতো। তারা আবেগে কাঁপতো। আন্দোলিত হতো তাদের দেহ-মন।
এদিকে এদের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি বিশাল মন্দির মূর্তিশূন্য করে সেখানে আযান চালু করেছিলেন সুলতান মাহমূদ। আর এখানে তারই দুই কমান্ডার হিন্দুদের চক্রান্তে পড়ে জ্যান্ত-মূর্তির পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে।
একদিন বুগরা খান তার সেবারত তরুণীকে বললো, “তোমরা আমাকে লাশের দুর্গন্ধ আর রক্তের হোলিখেলা থেকে তুলে এমন পরিবেশে নিয়ে এসেছে, এখানকার ঝুপড়িটাও আমার কাছে রাজমহলের মতো সুখ দিচ্ছে।”
“আপনি চাইলে আমরা আপনাকে সত্যিকার মহলেই নিয়ে যেতে পারব।” তরুণী বললো। “কিন্তু আমরা যা-ই করি তাতে আপনি আপত্তি করবেন না।” এ কথা বলেই তরুণী চলে যায়। পুনরায় একটি পেয়ালা হাতে নিয়ে এলো এবং বুগরা খানের সামনে রেখে বললো, “পান করুন। এটি এই মাটির বুনো ফলের রস। এই এলাকা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না।”
বুগরা খান পেয়ালা হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পান করতেই তরুণী পেয়ালা ছিনিয়ে নিয়ে বললো, “এই রস এক সাথে বেশি পান করা ঠিক নয়।”
জীবনে এমন স্বাদের কোনো জিনিস বুগরা খান পান করেনি। কিছুক্ষণ পরই তার মধ্যে একটা ফুরফুরে আনন্দ দোল খেয়ে যায়। হঠাৎ সে তরুণীকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বলে, “এখন আমি চলাফেরা করতে পারি কিন্তু তোমাদের ছেড়ে যাবো না। সুলতান যদি আমাকে তোমাদের ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়, তাও আমি মানবো না।”
