আলাসতুগীন ও বুগরা খানের জন্য একটি ঝুপড়ির মতো ঘর খালি করে সেটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হলো। গ্রামের লোকজনের কাছে সবচেয়ে উন্নত যে বিছানা ছিলো, তাই তাদের জন্য বিছিয়ে দেয়া হলো। রাতে শুয়ে শুয়ে আলাসতুগীন বুগরা খানকে বললো, প্রত্যূষে সে সেনা ক্যাম্পে গিয়ে বুগরা খানকে এখানে থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু বুগরা খান তাতে আপত্তি করে বললো, তাকে একাকী ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। একাকীত্বের সুযোগে গ্রামের লোকজন তাকে গায়েব করেও দিতে পারে, নয়তো ক্ষতস্থানে বিষ প্রয়োগ করে ক্ষতি করতে পারে।
দীর্ঘ ক্লান্তি, ক্ষুধা, পিপাসায় কাতরতার কারণে দু’কমান্ডার কিছুক্ষণ পরই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। কিন্তু তাদের ঘর থেকে কিছুটা দূরেই অপর একটি ঘরে হিন্দু পুরোহিত, কর্মকর্তা ও চিকিৎসক ক্ষীণ আওয়াজে সলাপরামর্শ করছিলো। পুরোহিত অন্যদের বললো, এই দু’সেনা অফিসারকে আমরা নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারি। সেই কৌশল আমাদের জানা আছে। যার দ্বারা কোনো কাপুরুষকেও বাহাদুর আর বাহাদুরকে কাপুরুষে পরিণত করা যায়। সুলতানকে যদি তার নিজের লোকজনের দ্বারা হত্যা করানোর ব্যবস্থা করা যায়, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে উত্তম। বললো এক কর্মকর্তা। কারণ, আমরা অনেক চেষ্টা করে দেখেছি, সুলতানের কাছে যাওয়া অপরিচিতের জন্য খুবই কঠিন।
“তোমরা দু’জন শোন!” বৃদ্ধ দু’চিকিৎসককে বললো পুরোহিত। “এ দু’কমান্ডারকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে দেয়া যাবে না। আমাকে একটি ঘোড়া দাও, আমাকে এখনই থানেশ্বর যেতে হবে। ঘোড়াটা এমন সামর্থবান হতে হবে, যেনো দ্রুত আমি সেখানে যেতে পারি এবং দ্রুত ফিরে আসতে পারি।” দুকর্মকর্তাকে পুরোহিত বললো, “তিন কুমারীকে আমি তোমাদের কাছে রেখে যাচ্ছি। এদের করণীয় সম্পর্কে আমি ওদের বুঝিয়ে বলে যাবো। তোমরা অন্যান্য দিকে খেয়াল রেখো।”
গ্রামের এক লোককে ইশারা করলে তিন তরুণীকে কমান্ডারদের ঘরে নিয়ে আসা হলো। পণ্ডিত তরুণীদের করণীয় কর্তব্য বুঝিয়ে দিলো। এরই মধ্যে ঘোড়া প্রস্তুত করে নিয়ে আসা হলো। পুরোহিত অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে দ্রুত চলে গেলো।
ভোরবেলায় আলাসতুগীন ঘুম থেকে ওঠে দেখলে বুগরা খান ব্যথায় কোকরাচ্ছে। আলাসতুগীন বৃদ্ধ চিকিৎসকদের ডাকার জন্য ঘর থেকে বের হতে যাবে, তখনই দরজার পাশে দেখলো দু’তরুণী দাঁড়ানো। আলাসতুগীনকে দেখে ওরা সলজ্জ হাসলো। সুন্দরী তরুণীদের দেখে আলাসতুগীনের চোখ ছানাবড়া। এক তরুণী তার উদ্দেশে কিছু বললেও সে পূর্ববৎ দাঁড়িয়ে রইলো। তার চেহারা দেখেই মনে হলো সে কিছুই বুঝেনি। অপর তরুণী মাথা ঝুঁকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলো এবং উভয়েই ভেতরে প্রবেশ করে বুগরা খানের পাশে গিয়ে বসলো।
এক তরুণী বুগরা খানের মাথা হাতে নিয়ে বললো, খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি? অপরজন তার হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলো। বুগরা খান ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক হয়ে গেলো। তার মুখ থেকে কোনো কথাই বের হলো না। ব্যথায় সে যে কুঁকাচ্ছিলো, তাও ভুলে গেলো।
“এদের কেউই আমাদের ভাষা বুঝে না।” তরুণী অপর সঙ্গীকে বললো।
“না না, আমি তোমাদের ভাষা বুঝি। কিন্তু আমি তামাদের মতো এমন সুন্দরী তরুণীদের দেখে ভেবে পাচ্ছিলাম না এই জঙ্গলে তোমাদের মতো রূপসী কোত্থেকে এলো? মনে হয় তোমরা এই গ্রামের বাসিন্দা নও।”
“এ জঙ্গলেই আমাদের জন্ম। বললো এক তরুণী। এই জঙ্গলে কেউ বিপদে পড়লে, কেউ কোনো আঘাতপ্রাপ্ত হলে আমরা তার সেবা-শুশ্রূষা করে থাকি। আচ্ছা, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছিলাম, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে
‘ব্যথা খুব বেশি।” জবাব দিলো বুগরা খান এবং তরুণীর হাত তার হাতে তালুবদ্ধ করে নিলো।
“খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন। ঠিক আছে, আমরা আপনার খাবার নিয়ে আসছি।” এই বলে উভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
তরুণীরা যখন খাবার নিয়ে প্রবেশ করলো, তখন ওরা তিনজন। একজনের হাতে হাত-মুখ ধোয়ার পানি, অপর দু’জনের হাতে পানাহার সামগ্রী। খাবারের মধ্যে অন্যতম ছিলো মধু মেশানো দুধ।
এক তরুণী বুগরা খান ও আলাসতুগীনের হাত-মুখ ধুইয়ে দিলো। উভয়েই দুধপান করলো এবং খাবার ও ফলফলাদি আহার করলো। তরুণীরা খাবারের শূনপাত্র তুলে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই বুগরা খানকে উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠতে শোনা গেলো। আলাসতুগীন বুগরা খানের হাসি শুনে গভীরভাবে তার চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেও হেসে ফেললো। দীর্ঘদিন পর দু’বন্ধু এভাবে প্রাণখোলা হাসলো। কারণ, হাজারো রণাঙ্গনে তাদের পরাজয় যখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিলো তখন গজনী বাহিনীর কারো বেঁচে থাকার আশা ছিলো না। কিন্তু রাজা আনন্দপালের হাতির চোখে তীরবিদ্ধ হলে সেটি যখন বিকট আর্তচিৎকার দিয়ে ওদের বাহিনীকেই পদপিষ্ট করতে শুরু করলো আর রাজার ঝাণ্ডা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো; তখন হিন্দু বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পালাতে শুরু করে।
আলাসতুগীন ও বুগরা খানের প্রতি শত্রু বাহিনীকে তাড়া করার নির্দেশ হলে তারা নিজ নিজ ইউনিটকে নিয়ে শত্রু বাহিনীর পিছু ধাওয়া করে। সেই যুদ্ধে তাদের বহু সহযোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেছে। ফলে তাদের হৃদয় থেকে হাসি উধাও হয়ে গিয়েছিলো। সেই যুদ্ধে কোনো বিরতি না দিয়ে সকলকে নগরকোটের দিকে অগ্রাভিযানের নির্দেশ হলো। সেখানে পৌঁছেও কঠিন যুদ্ধ করতে হলো। মৃত্যু যখন চোখের সামনে থাকে, তখন মানুষ কাঁদে। কিন্তু এই দু’কমান্ডার কাদার লোক ছিলো না। তারা গজনী থেকে পাহাড়, নদী, জঙ্গল, সমতল ভূমি এবং শত্রু বাহিনীর বাধা ডিঙ্গিয়ে বিজয়ের বেশে নগরকোট পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখন বিজিত এলাকার এই ঝুপড়িতে বসে বুগরা খান যখন অট্টহাসিতে মেতে উঠলো, তখন বন্ধুর তাৎপর্যপূর্ণ হাসি দেখে আলাসতুগীনও হেসে ওঠে । আলাসতুগীন বুগরা খানের উচ্ছাসিত হাসিতে আন্দাজ করে, দীর্ঘ ক্লান্তিকর যুদ্ধ তাদের হৃদয় থেকে হাসি কেড়ে নিয়েছিলো, চাপা দিয়ে রেখেছিলো তাদের প্রাণোঙ্গল আবেগ। যুদ্ধ আর খুনাখুনিই নয়, এখন তাদের ইচ্ছে করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠতে, জীবনকে উপভোগ করতে।
