“সুলতান মাহমূদ মানুষ হলেও তাকে হত্যা করা সহজ ব্যাপার নয়।” বললো একজন কর্মকর্তা। “আপনার হয়তো জানা নেই আমি দরবেশের বেশ ধারণ করে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম, কিন্তু মধ্যে কয়েক জায়গায় আমার পথরোধ করা হয়েছে। আমাকে ঘাটে ঘাটে যাচাই করা হয়েছে। প্রত্যেকবার আমি ওদের বলেছি, ভাই! আমি একজন দরবেশ মানুষ, দুনিয়া ত্যাগী। সুলতানকে মোবারকবাদ জানাতে এসেছি। অনেক অনুরোধের পর সিপাহীরা আমাকে তাদের কমান্ডারের কাছে নিয়ে গেলো। কমান্ডার আমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর আমার শরীর তল্লাশি করে চোগার ভেতর লুকিয়ে রাখা খঞ্জর বের করে এনে বললো, দরবেশের পরিচয় দিচ্ছে, তাহলে সাথে অস্ত্র কেন? আমি বললাম, যে ধর্মের একজন সুলতান দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক রাজ্য দখল করে এতোদূর পর্যন্ত মূর্তিপূজা বন্ধ করতে এসেছেন, সেই ধর্মের একজন অনুসারীর কাছে কি এই অস্ত্রটুকুও থাকবে না, তা কি করে হয়? আমি একজন খাঁটি মুসলমান। আর প্রত্যেক মুসলমানের কাছে আত্মরক্ষামূলক হাতিয়ার থাকা অলংকার। এতো কৌশলে কথা বলার পরও সে আমাকে এক দারোয়ানের হাতে তুলে দিলো। আমি তখন অনুভব করলাম, গজনীর সুলতানের কাছে পৌঁছা মোটই সহজ কাজ নয়, তাকে হত্যা করা তো দূরের কথা। ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আমাকে ফিরে আসতে হয়েছে।”
“আমরা এখন এখানেই থাকবো।” বললো অপর কর্মকর্তা। এখানে থেকে আমরা অপেক্ষা করবো। সুলতান অবশ্যই বিজিত এলাকা দেখার জন্য বের হয়ে এখানে আসবেন। তখন হয় দূর থেকে তীর মেরে হত্যা করবো, নয়তো কাছে গিয়ে খঞ্জর দিয়ে তাকে হত্যা করবো। আমরা নিজেদের জীবনের মায়া করি না মহারাজ। যদি আমাদের দুজনের জীবনের বিনিময়েও হয়…।”
‘এটা করতে পারলে তোমরা পরজনমে এদেশের মহারাজা হবে।” বললো পুরোহিত। “ব্রাহ্মণ ও রাজপুতরাও তোমাদের পায়ে মাথা ঠেকাবে।” পণ্ডিত একটু গম্ভীর হয়ে ভেদকথা বলার মতো করে বললো, “আমিও এ কথাই ভাবছিলাম, কিভাবে ওই একটি মাত্র লোককে হত্যা করা যায়। আমার সাথে যে তিন তরুণী এসেছে তোমরা কি তাদের সৌন্দর্য দেখেছে? আমি ভাবছি, কি করে ওদেরকে উপঢৌকন হিসেবে সুলতানের কাছে পৌঁছানো যায়। ওরা সেখানে পৌঁছতে পারলে তার খাবারে বিষ প্রয়োগ করতে পারতো।”
“অসম্ভব।” বললো এক কর্মকর্তা। “আমাদের বলা হয়েছে, এই সুলতান নাকি পাথরের মতো কঠিন। মদ ও নারীর প্রতি তার মোটেও আসক্তি নেই। এ জন্য তার সৈন্যরা কোনো অঞ্চল জয় করলেও সেখানকার কোনো নারীর ইজ্জতের উপর কোনো আঘাত হানে না। কোনো নারীর সমহানির ঘটনা ঘটে না। সুলতান মাহমূদকে নারীর ফাঁদে ফেলা সম্ভব নয়। অন্য কোনো পথ ভাবতে পারেন।”
“অথচ নারী আর মদই আমাদের মহারাজাদের ডুবিয়েছে।” বললো পুরোহিত। “আর মুসলমানদের বিজয়ের মূল কারণ হলো তারা মদ ও পরনারী ভোগকে ঘৃণা করে। তদুপরি আমাদের কিছু একটা করতেই হবে। আমাদের আরো ভাবতে হবে। আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। জীবনভর যে কৃষ্ণমূর্তির পূজা করে কাটিয়েছি, নিজের চোখের সামনে তাদের অমর্যাদা হতে দেখেছি। এ জন্য এদেশের উপর ভগবানের অভিশাপ পড়বে, আমার উপর পড়বে, তোমাদের উপরও পড়বে।”
নগরকোট মন্দির সুলতানের বাহিনী পদানত করেছে প্রায় ৮/১০ দিন হয়েছে। কদিন ধরে এই হিন্দু কর্মকর্তা ও পুরোহিত পাহাড়ের পাদদেশের এই পল্লীতে আত্মগোপন করে আছে। হিন্দু দু’কর্মকর্তা তাদের বেশ বদল করে দু’-দু’বার পাহাড়ের উপরে অবস্থিত দুর্গে গিয়েছিলো সুলতান মাহমূদকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু সুলতানকে হত্যা করার কোনো সুযোগ তারা পায়নি। এরপরও তারা হতোদ্যম হয়নি। পণ্ডিতের কথাও তাদের হতাশাগ্রস্ত করেনি। সুলতান বিজিত এলাকা পর্যবেক্ষণে বের হলে দূর থেকে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করার মানসে দুকর্মকর্তা দুটি ধনুক, প্রয়োজনীয় সংখ্যক তীর সংগ্রহ করেছে। এলাকাটি ছিলো জঙ্গলাকীর্ণ এবং উঁচু-নীচু অসংখ্য পাহাড়ে বেষ্টিত। আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে লুকিয়ে পড়া কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।
ইত্যবসরে আলাসতুগীন পল্লী থেকে চার যুবককে নিয়ে ফিরে আসে। দূর থেকে পুরোহিত ও দু’কর্মকর্তা ভেবেছিলো, গজনীর এই সেনা হয়তো চার যুবককে বেগার খাটানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর এই তিন হিন্দু দেখতে পেলো, পল্পীর চার যুবক এক ব্যক্তিকে কাঁধে করে নিয়ে আসছে। হিন্দু কর্মকর্তারা আলাসতুগীনকে এবার চিনে ফেলে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে তারা
লুকিয়ে পড়লো । আলাসতুগীন যখন গ্রামে পৌঁছলো তখন গ্রামের অন্যান্য লোকজনও এসে জড়ো হলো। বুগরা খানকে একটি চৌকিতে শুইয়ে দেয়া হলো। গ্রামের দু’বৃদ্ধা তার আঘাত ও ক্ষতস্থান দেখতে লাগলো। একটু পরীক্ষা করে তারা ক্ষতস্থানের চিকিৎসা শুরু করে দিলো।
আলাসতুগীনের বলে দেয়া কথায় বুগরা খান দুই বৃদ্ধকে তাদের ভাষায় বললো, গ্রামের লোকজন যদি তাদের সাথে কোনো ধরনের দুরভিসন্ধিমূলক কিছু করে, তাহলে সারা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাইকে পাইকারী হারে হত্যা করা হবে।
“আপনারা আমাদের শাসক-প্রভু। গোটা গ্রামের মানুষ আপনাদের সেবায় একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। উল্টো-সিধা করার দুঃসাহস কে করবে। আমরা এর চেয়েও বেশি আঘাতের সুচিকিৎসায় দক্ষ। কোনো চিন্তা করবেন না। ৪/৫ দিনের মধ্যে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন।”
