হিন্দু যুবকরা এ কথাও বললো, আমাদের গ্রামে এ ধরনের হাড়ভাঙ্গা ও ক্ষতের চিকিৎসা হয় এবং এখানে প্রচুর দুধ ও মধু পাওয়া যায়, যা আহত ও দুর্বল লোককে দ্রুত সারিয়ে তুলে।
মনের দিক থেকে আলাসতুগীন গ্রামে অবস্থানের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। কারণ, এসব গ্রামের মানুষেরা তাদের বশ্যতা স্বীকার করলেও দুশমন সম্প্রদায়ের। এদের বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু বুগরা খানের অবস্থা ছিলো খুবই নাজুক। এ অবস্থায় তাকে নগরকোট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়েই সে বুগরা খানকে বললো, আপাতত এখানে থেকে যাই।
আলাসতুগীন ছিলো খুবই সতর্ক কমান্ডার। সে হিন্দুদের স্বভাব সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত ছিলো। বুগরা খান তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুর জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে গেলো আলাসতুগীন। পরিশেষে অগ্র-পশ্চাৎ এতো কিছু না ভেবে চার যুবককে নির্দেশ দিলে আহত বুগরা খানকে সবাই মিলে কাঁধে তুলে নিলো।
আলাসতুগীন যখন চার হিন্দু যুবককে গ্রাম থেকে নিয়ে গিয়েছিলো, তখন রাস্তার পাশে তিনজন লোক একটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে উসখুস করছিলো। এদের একজন ছিলো নগরকোট মন্দিরের পুরোহিত আর অপর দু’জন নগরকোট দুর্গের শীর্ষস্থানীয় আমলা। মন্দির পতনের ক’দিন আগেই পুরোহিত পাশের এক গ্রামে এসে আশ্রয় নেয়। আর সামরিক আমলা দু’জন এসেছে একদিন আগে। এদের তিনজনকেই গ্রামের হিন্দুরা লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলো। পুরোহিত ও দু’কর্মকর্তা সুলতানের বাহিনীর হাতে সম্মিলিত বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় আর মন্দির দখল করে মূর্তি ভাঙ্গার জন্য মুসলিম সেনাদের বিরুদ্ধে মনের প্রচণ্ড বিদ্বেষে অগ্নিশর্মা রূপ ধারণ করছিলো। এই গ্রামে মুসলিম সেনার উপস্থিতি দেখে এরা আশংকা করছিলো, এখান থেকেও হয়তো তাদের পালাতে হবে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে মুসলিম সেনাকে ফিরে যেতে দেখে দু’কর্মকর্তার উদ্দেশে পুরোহিত বললো, আমি যদি তোমাদের মতো সৈনিক হতাম তাহলে কাপুরুষের মতো এখানে এসে লুকিয়ে থাকতাম না। মনে হয় না যে তোমাদের শরীরে রাজপুত ধারার রক্ত আছে। তোমরা কি দেখেছিলে ম্লেচ্ছদের ঘোড়াগুলো আমদের মন্দিরের প্রধান ফটক ভেঙ্গে কিভাবে প্রবেশ করেছিলো? তোমরা কি দেখেছিলে, দুশমন সৈন্যরা আমাদের কৃষ্ণদেবীর মূর্তিগুলোকে কিভাবে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলে ঘোড়ার পায়ে পিষে টুকরো টুকরো করেছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি, ম্লেচ্ছ সৈন্যরা আমাদের সরস্বতী ও ভগবতী মূর্তিকে পায়ের নীচে পিষ্ট করেছে। এক মুসলমান সৈন্য আমাদের মন্দির চূড়ায় উঠে আযান দিয়েছিলো, তা কি তোমরা শুনেছিলে? হয়তো শুনে থাকবে। হয়তো পবিত্র গীতা ও মূর্তি মুসলমানদের পদপিষ্ট হতেও দেখে থাকবে। তোমরা রাজপুত হলে শত্রুদের হাতে জীবন বিসর্জন দিতে কিন্তু জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে না। আসলে তোমাদের কাছে ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার চেয়ে জীবনই বেশি প্রিয়।
“না না মহারাজ!” এক কর্মকর্তা পণ্ডিতের পায়ের দিকে হাত প্রসারিত করে বললো। “আমরা কাপুরুষ নই পণ্ডিত মহারাজ।”
“হাত সরিয়ে নাও।” ঘৃণাভরে বললো পুরোহিত। “তোমরাও ম্লেচ্ছ। যে সৈনিক নিজ ধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে না, তার স্বজাতির কোনো পল্লীতে থাকার অধিকার নেই। তোমাদের উচিত জঙ্গলের জীব-জন্তুদের সাথে বসবাস করা। তোমরা কি ধারণা করতে পারো, আমি এই তিন কুমারীকে কিভাবে শত্রু বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্য থেকে বের করে নিয়ে এসেছি। আমি ওদের চেহারায় কালি মাখিয়ে পুরুষের কাপড় পরিয়ে বের করে নিয়ে আসি। আর যারা মন্দিরে রয়ে গেছে তারা কী কঠিন অবস্থার শিকার হয়েছে, তা কি তোমরা জানো!”
“আমরা এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবো মহারাজ।” বললো অপর কর্মকর্তা।
“হু, তোমরা যদি সত্যিই আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন হতে, তাহলে মন্দির থেকে তোমরা পালিয়ে আসতে না, মন্দির থেকে তোমাদের লাশ বের হতো। তোমাদের আত্মা থাকতো আকাশে। আসলে তোমরাও ম্লেচ্ছ, আত্মপরিচয় লুকিয়ে তোমরা হিন্দু সমাজে বসবাস করছে। দেখো, গজনীর এই সুলতান দেশের অন্য মন্দিরগুলোরও একই অবস্থা করবে। আজ নগরকোট ধ্বংস হয়েছে, আগামীকাল থানেশ্বরের পালা। তোমরা কি জানো, থানেশ্বর আমাদের কাছে এতোটাই পবিত্র মুসলমানদের কাছে মক্কা-মদীনা যেমন পবিত্র। হায়, আজ যদি আমার এই বৃদ্ধ শরীরে শক্তির সঞ্চার হতো, আমি যদি গজনীর মুসলতানকে নিজ হাতে হত্যা করতে পারতাম!”
“এ কাজটি করার জন্যই আমরা এখানে অবস্থান নিয়েছি মহারাজ।” বললো এক কর্মকর্তা। “আমরা পেছনে পড়িনি, ইচ্ছা করেই এখানে থেকে গেছি। আমি সৈনিক নই, আমলা। আমরা যা চিন্তা করি, সৈনিকদের দেমাগে তা কখনো আসবে না। আমরা যতোটুকু আত্মমর্যাদাবোধ লালন করি, তা কোনো রাজা-মহারাজও লালন করে না। জানো, রাজা-মহারাজাদের আত্মমর্যাদাবোধ কম কেন? কারণ, তারা ক্ষমতার পূজারী। মন্দিরের সাথে শাসকদের ভালোবাসা এতোটুকু গভীর নয় মহলের প্রতি তাদের আগ্রহ যতোটুকু তীব্র। রাজমহল যার কাছে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে, মন্দির তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যায়। দেখো, সুলতান মাহমূদ কোনো অবতার নয়, একজন মানুষ মাত্র। অথচ নগণ্য একজন মানুষ হয়ে এতোগুলো হিন্দু রাজ্যকে সে পায়ের তলায় পিষ্ট করলো! আমি মনে করি, এই একটি মাত্র মানুষকে যদি শেষ করে দেয়া যায়, তাহলে গোটা গজনী বাহিনী আমাদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইবে।
