প্রচণ্ড আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে চেতনাবোধ প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলো বুগরা খান। অর্ধচেতন অবস্থায় প্রাণ বাঁচানোর জন্য সে কোন্ দিক থেকে কোন্ দিকে পালাতে শুরু করেছিলো কিছুই জানা ছিলো না। কখনো বেহুঁশ হয়ে পড়ে যেতো আবার যখনই হুশ ফিরে পেতে উঠে একদিকে চলতে শুরু করতো। বারবার চেতনা হারিয়ে ফেলতো। অবচেতন দেহে পড়ে থাকা অবস্থায় কারো হুংকারে চেতনা ফিরে পেলো বুগরা খান। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তরবারীর বাটে তার হাত চলে গেলো। কোষমুক্ত করে ফেললো তরবারী। তরবারী মুষ্টিবদ্ধ করে যেই না উঠে দাঁড়াতে চাইলো অমনি ব্যথায় মোচর দিয়ে উঠলো পা। প্রায় ভেঙ্গে গেছে তার একটি পা। তদুপরি ক্ষতস্থান থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ ও টানা কয়েক দিনের অনাহার-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে গেছে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেও ক্ষণিকের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে বুগরা খান।
“আরে বুগরা খান! মাথা ঠিক করো । কি হয়েছে? আমি আলসতুগীন।” বুগরা খানের নিজের ভাষায় কথা বললো লোকটি। “তুমি এখানে কি করে এলে?”
বুগরা খান কথা বলার চেষ্টা করলো কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দই উচ্চারিত হলো না। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। জিহ্বা লেপ্টে গেছে। বুগরা খানের মুখ দেখেই আলাসতুগীন বুঝে নিলো সে খুবই তৃষ্ণার্ত। আলাসতুগীন তার কোমরে বাঁধা পানির পাত্র খুলে তার মুখে ধরলো। কয়েক ঢোক পানি পান করলো বুগরা খান। কিছুক্ষণ পর পুরোপুরি চেতনা ফিরে পেলো। অবস্থার উন্নতি দেখে তার মুখে কিছু খাবার তুলে দিলো আলাসতুগীন।
আলাসতুগীনও বুগরা খানের মতোই একজন সেনা কমান্ডার। সেই সুবাদে বুগরা ও আলাসতুর মধ্যে ছিলো গভীর হৃদ্যতা। সুলতান যখন মন্দির ও দুর্গ অবরোধ করেন, তখন বুগরা খানের যেমন দায়িত্ব ছিলো ইউনিটসহ পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের উপর থেকে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে ভেতরে ও বাইরের আক্রমণ প্রতিরোধ করা। অনুরূপ আলাসতুগীনের দায়িত্বও ছিলো নগরকোট থেকে কিছুটা দূরে হিন্দু সৈন্যদের রসদ সামগ্রী আসার পথ রোধ করা এবং পথিমধ্যেই সাহায্যকারী দলকে আটকে রাখা। আলাসতুগীনের অধীনে ছিলো ছোট একটি তীরন্দাজ ইউনিট। এরা ধাবমান ঘোড়ায় চড়েও লক্ষ্যভেদী তীরন্দাজে পারদর্শী ছিলো এবং ছিলো কুশলী যোদ্ধা। একদিন আলাসতুগীন ইউনিটের চোখে পড়লো একটি হিন্দু বাহিনী। তবে এরা নগরকোটের দিকে যাচ্ছিলো না, যাচ্ছিলো নগরকোটের বিপরীত দিকে। আলাসতুগীনের তীরন্দাজ ইউনিট হিন্দু সেনাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ শুরু করলে ইত্যবসরে এর পাশ দিয়েই অগ্রসরমান একটি পদাতিক সেনাদল দেখা গেলো। ওদের চোখে পড়লো, মুসলিম তীরন্দাজ ইউনিট হিন্দুদের তাড়া করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পলায়নপর হিন্দু অশ্বারোহী আর পদাতিক সৈন্যরা একাকার হয়ে গেলো। অশ্বারোহী আশ্রয় নিলো পলায়নপর পদাতিক সৈন্যদের মাঝে আর পদাতিক সৈন্যরা অশ্বারোহীদের আশ্রয় ভেবে মুসলিম তীরন্দাজদের মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হলো। আলাসতুগীনের জনবল ছিলো হাতেগোনা কয়েকজন। অপরদিকে পলায়নপর হিন্দুরা সংখ্যায় ছিলো অনেক। এরা সবাই জীবন বাঁচানোর তাকিদেই মুসলিম তীরন্দাজদের ঘিরে ফেলে এবং কাবু করে ফেলে। মাত্র কয়েকজন তীরন্দাজ ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে চতুর্দিকের আঘাতে বেসামাল হয়ে পড়লো। অধিকাংশই মারা পড়লো আর অল্প ক’জন জীবন নিয়ে পালাতে সক্ষম হলো। এই পালিয়ে বাঁচাঁদের একজন ইউনিট কমান্ডার আলাসতুগীন। টানা কয়েক দিন সে সাথীদের খুঁজে ফিরছিলো। কিন্তু অচেনা হিন্দুস্তানের বিশাল জঙ্গলে কোন্ দিকে হারিয়ে গেছে কোনো কুল-কিনারা করতে পারলো না। সেই গহীন জঙ্গলে সে অবচেতন অবস্থায় দেখতে পেলো বুগরা খানকে। আর এই বুগরা খান তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তার মতোই সেনা কমান্ডার।
পানি ও খাবার গ্রহণ করার পর স্বাভাবিক জীবনবোধ ফিরে পায় বুগরা খান। কিন্তু তার চলার শক্তি ছিলো না। ততোক্ষণে দিন পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে।
রাত পোহালে কমান্ডার আলাসতুগীন বুগরা খানকে নেয়ার জন্য এবং নগরকোটের রাস্তা দেখিয়ে দেয়ার জন্য কোনো লোক পাওয়া যায় কিনা এ জন্য ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাতেই বুগরা খান তাকে জানিয়ে দিয়েছিলো নগরকোট দুর্গ মুসলমানরা জয় করে নিয়েছে। তাদের অবস্থান থেকে কিছুদূর অগ্রসর হলেই আলাসতুগীন একটি বসতি দেখতে পায়। তাকে লোকালয়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখে কিছু লোক তার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। ওরা ছিলো গ্রামীণ দরিদ্র হিন্দু। মুসলমান সেনা অফিসার দেখে গ্রামের লোকজন তাকে নমস্কার জানাতে থাকে। আলাসতুগীন ইশারা-ইঙ্গিতে ওদের সাথে কথা বলে চারজন যুবককে তার সাথে নিয়ে বুগরা খানের নিকট ফিরে আসে। ততোক্ষণে বুগরা খানের অবস্থার আরো অবনতি ঘটেছে। খানের অবস্থার অবনতি দেখে আলাসতুগীন দুচারটা শব্দ ব্যবহার করে ওদের কাছে জানতে চাইলো, নগরকোট এখান থেকে কত দূর? হিন্দুরা ইশারা ইঙ্গিতে বুঝালো নগরকোট এখান থেকে বহুদূর এবং অসমতল পাহাড়ী পথ।
চার যুবকের একজন তাদের বললো, এমতাবস্থায় এই আহত ব্যক্তির পক্ষে নগরকোট যাওয়া সম্ভব নয় বরং একে গ্রামে নিয়ে যাই। কিছুটা সুস্থ হলে আমরা তাকে নগরকোট পৌঁছে দেবো। বুগরা খান সাহেবের সোক। সে ওদের কথা পুরোপুরিই বুঝতে পারলো এবং বন্ধু আলাসতুগীনকে ওদের প্রস্তাবের কথা তার ভাষায় বুঝিয়ে দিলো।
