সুলতান মাহমূদ মন্দিরে প্রবেশ করে প্রথমেই মূর্তিগুলোকে পাহাড়ের উপর থেকে নীচের দিকে ফেলে দিলেন। সেগুলো ভেঙ্গেচুড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। নগরকোট মন্দিরে ছিলো সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। মন্দির থেকে সাত কোটি স্বর্ণের চাকতি বের হলো। স্বর্ণের অলংকার ছিলো মণকে মণ। হীরা-মতি-পান্নাও মণ হিসেবে ওজন করতে হয়েছিল। সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করার জন্য হিন্দু পণ্ডিত ও রাজা-মহারাজারা প্রজাদের কাছ থেকে এসব ধন-সম্পদ সগ্রহ করেছিলো। হাজরো থেকে নগরকোট পর্যন্ত গোটা অঞ্চল সুলতান ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। সেই যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি সইতে না পেরে রাজা আনন্দ পাল কয়েক দিন পর মৃত্যুবরণ করে।
সুলতান নতুন বিজিত এলাকায় থেকে তার প্রশাসনকে শক্তিশালী করার প্রতি মনোনিবেশ করলেন। ঠিক এ সময় তার কাছে সংবাদ এলো, গৌড় অঞ্চলে মুহাম্মদ নামের এক আফগান শাসক ১০ হাজার সৈন্য সমাবেশ করেছে এবং গৌড়ি সম্প্রদায়ের সব লোক তার সহযোগী হতে রু করেছে। সেটিও ছিলো এক গৃহযুদ্ধের খবর। কালবিলম্ব না করে ১০০৯ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ৪০০ হিজরী সনে সুলতান মাহমূদকে বাধ্য হয়েই গজনী ফিরে যেতে হলো এবং আরেকবার নামধারী মুসলিম বেঈমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হলো ।
২.৪ মানুষ ও শয়তানের লড়াই
নগরকোট মন্দিরের মূর্তি ও হিন্দু আখড়া জয় করে সেখানে ইসলামী শাসন প্রবর্তনের পর সুলতান মাহমূদ গৌড়দের বিদ্রোহ দমনে গজনী ফিরে যাচ্ছিলেন। কারণ, গৌড়ি সম্প্রদায় তার রাজধানী সুরক্ষার প্রশ্নে ঝুঁকি ও হুমকি সৃষ্টি করেছিলো। এটা ছিলো সুলতান মাহমূদের জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। তিনি যতোবার হিন্দুস্তানে এসে বিজয় নিশান উড়িয়ে এখানে ইসলামী শাসনের ভিত মজবুত করতে চেয়েছেন, ততোবারই সুলতানের অবর্তমানে কোনো না কোনো মুসলিম বেঈমান গজনী আক্রমণে প্রলুব্ধ হয়েছে। ফলে সংবাদ পেয়েই সুলতানকে রাজধানী রক্ষার জন্য গজনী ফিরে যেতে হচ্ছিলো। তিনি হিন্দুস্তানে তার প্রশাসনিক ভিত মজবুত করার অবকাশ পেলেন না।
হিংসাপরায়ণ অমুসলিম ঐতিহাসিকরা তার এই অগত্যা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও প্রকৃত সত্য উদঘাটন না করে সুলতান মাহমূদের নামে কলংক লেপন করেছে। তারা বলেছে, সুলতান মাহমূদ ধন-সম্পদ লুটতরাজের জন্য মন্দিরে আক্রমণ করতো, মূর্তি ভেঙ্গে দিতো, মন্দিরে স্বর্ণ-মণিমুক্তা যা থাকতো তা সংগ্রহ করতো। তাই লুটতরাজ শেষ হলেই সে পুনরায় গজনী ফিরে যেতো। হিন্দুস্তানে ইসলামী শাসন প্রবর্তনে এবং মুসলমানদের শাসন প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণে সুলতান মাহমূদ আন্তরিক ছিলো না।
দু’হাজার হিন্দু বন্দীকে সাথে করে গজনী ফিরে যাচ্ছিলেন সুলতান। প্রকৃতপক্ষে এরা বন্দী ছিলো না, তখনকার রীতি অনুযায়ী এরা ছিলো দাস। মহারাজা আনন্দ পাল যুদ্ধে পরাজয়ের পর উপঢৌকন হিসেবে দু’হাজার দাস দিয়েছিলো। তাছাড়া কিছু সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি সুলতান হিন্দু বাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন আর কিছু হাতি হিন্দু রাজা-মহারাজারা পরাজয়ের পর বশ্যতা স্বীকার করে তাকে উপহার দিয়েছিলো।
যে পরিমাণ সৈন্য নিয়ে তিনি গজনী ত্যাগ করেছিলেন, ফেরার সময় সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম ছিলো। বিজিত এলাকার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে কিছু সৈন্যকে ওখানে রেখে আসতে হলো। এছাড়া তার কোনো সৈন্য শত্রুর হাতে বন্দী না হলেও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যুদ্ধে শাহাদাতাবরণ করেছিলো।
এই কঠিন সময়ে তার অন্যতম দু’কমান্ডারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এরা প্রতিপক্ষের হাতে মারাও যায়নি। আবার সুলতান মাহমূদ নগরকোটের প্রশাসনিক কাজেও এ দুজনকে রেখে আসেননি।
এদের একজন কমান্ডার বুগরা খান আর অপরজন কমান্ডার উলস্তগীন। উভয়েই ছিলো আকর্ষণীয় দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী টগবগে যুবক। বুগরাখান ছিলো পেশোয়ার অঞ্চলের অধিবাসী। সে গজনী থেকে মাঝে মধ্যে পেশোয়ার যাতায়াত করতো বলে হিন্দুস্তানের স্থানীয় ভাষা বুঝততা এবং অল্প বিস্তর বলতেও পারতো। সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা যখন নগরকোট দুর্গ জয় করে, তখন বুগরা খান পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় তার ইউনিট নিয়ে মোতায়েন ছিলো। বুগরা খানের সৈন্যরা যখন দেখলো মুসলমানরা দুর্গের প্রধান ফটক ভেঙ্গে ফেলেছে। তখন তার ইউনিটের সৈন্যরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দুর্গের দিকে ঘোড়া ছুটায়। বুগরা খান তার ঘোড়াকে সবার আগে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়া দেয়। হঠাৎ ঘোড়া এমনভাবে লক্ষ দিয়ে ছুটতে লাগলো যে বুগরা খান নিজে তাল সামলাতে না পেরে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলেন। তার ঘোড়াটিও বুগরা খানের এভাবে পড়ে যাওয়ায় ভয় পেয়ে তাকে ফেলে দৌড়ে চলে যায়। পাহাড়ের উপর থেকে পড়ে গিয়ে গড়াতে গড়াতে বুগরা খান নীচে চলে যায়। তার উভয় পা মচকে যায়। শরীরে কয়েক স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তার পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছিলো না। এমতাবস্থায় হিন্দু সৈন্যরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদিক-ওদিক পালাচ্ছিলো। হিন্দুদের পালাতে দেখে বুগরা খান ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালে নিজেকে লুকাতে চেষ্টা করছিলো। কারণ, হিন্দু সৈন্যদের সামনে পড়লে আর তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখতো না।
