শত্রুবাহিনীর ৩০ হাজার অশ্বারোহী ১ হাজার মুসলিম তীরন্দাজের উপর হামলে পড়লো। গুরখা জাতি সেই সময় কোনো ধর্ম-কর্ম পালন করতো না। কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিলো, আদিতে তারাও হিন্দুদের অংশ ছিলো। এই বিশ্বাস থেকে হিন্দুদেরই সহযোগী ছিলো গুরখা সমাজ। এরা এতোটাই লড়াকু ও হিংস্র ছিলো যে, শীত-গ্রীষ্ম, পাহাড়-সমতল সবসময় সব জায়গায় খোলা মাথায় কোনো ঢাল ছাড়াই প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। ঐতিহাসিক কাসিম ফারিশতা লিখেন–
গুরখা সৈন্যরা কয়েক মিনিটের মধ্যে সুলতানের অশ্বারোহী তীরন্দাজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পাঁচশ’ মুসলিম সৈন্যকে শহীদ এবং বহু সেনাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। সুলতানের ক্যাম্পে গুরখারা ঢুকে পড়ে। কিন্তু সুলতানের পরিখা গুরখাদের পেছনে ফেরা অসম্ভব প্রমাণ করে। সুলতান আশংকা করছিলেন, প্রতিপক্ষের গোটা ফৌজ যদি একযোগে আক্রমণ করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দেবে। সুলতান তার সৈন্যদের নিয়ে ক্যাম্পে আটকা পড়ে। আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি তার বাহিনীকে যেভাবে সাজিয়ে রেখেছিলেন এর সুফল দেখা দিলো। ভততক্ষণ পর্যন্ত সুলতানের প্রধান সেনাপতি আবদুল্লাহ আলতাঙ্গ যে পাঁচ হাজার অশ্বারোহী রিজার্ভ সৈন্য নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, এরা তখনো গুরখা বাহিনীর বিরুদ্ধে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হয়নি।
ইঙ্গিত পেয়ে সেনাপতি আবদুল্লাহ আলতাঈ গুরখাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করলেন। শুরু হলো গুরখাদের কচুকাটা করা। ততোক্ষণে গুরখারা ক্ষান্ত হয়ে পড়েছে আর সংখ্যারও যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। গুরখারা জীবন বাঁচানোর জন্য যখন পরিখায় ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো, তখন আলতাঈ’র রিজার্ভ সৈন্যরা তীর ও বল্লমের আঘাতে তাদের ধরাশায়ী করছিলো। যুদ্ধের এই অবস্থা দেখে মুসলমানদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর অবকাশ না দেয়ার লক্ষ্যে সকল সেনাকে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হলো। মুসলমান শিবিরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আনন্দ পালের জানা ছিলো না। সেখানে তখন গুরখারা কচুকাটা হচ্ছিলো। রাজা আনন্দ পাল বিজয় অবশ্যম্ভাবী ভেবে তার হস্তি বাহিনীসহ নিজে সামনে অগ্রসর হয় এবং তার ঝাণ্ডা আরো উঁচু করে তুলে ধরা হয়।
সুলতানের সেনাপতি আবদুল্লাহ আলতাইর দু’হাজার রিজার্ভ সৈন্যের একটি অংশ রাজা আনন্দ পালের বাহিনীর একপ্রান্তে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঐতিহাসিক ফারিশতা লিখেন, লক্ষাধিক শত্রুর মোকাবেলায় মাত্র ৬ হাজার সৈনিক মোটেও উল্লেখ করার মতো নয়। কিন্তু তদুপরি অলৌকিক ঘটনার মতোই বিস্ময়করভাবে মুসলিম বাহিনী রাজার বিশাল বাহিনীর উপর অল্পক্ষণের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে ফেললো। রাজার বাহন হাতির মুখে বিদ্ধ হলো কয়েকটি তীর। হঠাৎ রাজার হাতির চোখে একটি তীর বিদ্ধ হলে সেটি বিকট চিৎকার দিয়ে পেছনে ফিরে নিজ বাহিনীর মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলো। রাজার ঝাণ্ডা মাটিতে পড়ে যায়। হিন্দু বাহিনীর ঝাণ্ডা আর উঁচুতে তুলে ধরা সম্ভব হলো না। রাজার হাতির বিকট চিৎকারে অন্যান্য হাতিও ভড়কে গিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি শুরু করে। ফলে নিজ হস্তি বাহিনীর পায়ের তলায় পিষ্ট হতে লাগলো হিন্দু বাহিনী। রাজার হাতি প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সবকিছু মাড়িয়ে রাজাকে নিয়ে পিছু পালাতে দেখে অন্যান্য হিন্দু রাজ্যের সেনারা মনে করলো, হয়তো সামনে মুসলমানরা জোরদার হামলা করেছে। তাই রাজা পশ্চাদপসরণ করছে। কিছু না ভেবেই তারা পালাতে শুরু করলো। ভেঙ্গে গেলো সম্মিলিত বাহিনীর চেইন অব কমান্ড।
সম্মিলিত বাহিনী হয়ে পড়লো কাণ্ডারীহীন। তখন ছিলো শীতের মওসুম। ডিসেম্বরের শেষ দিন। পাশের পাহাড়গুলো বরফে ঢাকা। শীতের তীব্রতা ছিলো সমতলের হিন্দুদের জন্য অসহনীয়। এই সময়টার জন্যই সুলতান অপেক্ষা করছিলেন। সুলতান যখন দেখলেন, শত্রু বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে, তখন তিনি তার সকল সৈন্যকে সরাসরি আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন এবং শত্রু বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করার হুকুম করলেন। প্রধান সেনাপতির দু’হাজার রিজার্ভ ফোর্স আর ডেপুটি সেনাপতি আরসালানের অধীনস্ত দশ হাজার আফগান, তুকী ও খিলজী সৈন্য হিন্দু বাহিনীর উপর একই সাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তততক্ষণে শত্রুবাহিনী আক্রমণ নয়- আত্মরক্ষা এবং পশ্চাদপসরণে লিপ্ত।
কাসিম ফারিশতা লিখেন- পালাতে গিয়ে হিন্দু বাহিনীর ২০ হাজার সৈন্য নিহত হয়। যারা অস্ত্র সমর্পণ করলো এদের বন্দী করা হলো। সুলতানের নদীর পাড়ের ঝটিকা বাহিনীও ততোক্ষণে এসে মূল বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে। সুলতান ইতিপূর্বে কখনো পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দেননি, কিন্তু এবার শত্রুদের তাড়া করার নির্দেশ দিলেন। শত্রু সেনাদের তাড়া করতে গিয়ে মুসলিম বাহিনী নগরকোটে পৌঁছে গেলে তার গোয়েন্দারা জানালো, নগরকোটের এ মন্দিরকে হিন্দু রাজা-মহারাজারা অন্যতম একটি সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করে রেখেছে। এটিকে রক্ষার জন্য হিন্দু সেনাক্যাম্প স্থাপন করেছে। সুলতান একথা শুনে আর অগ্রসর না হয়ে নগরকোট মন্দির অবরোধের নির্দেশ দিলেন।
রাজা আনন্দ পালের সেনা ও কালিঞ্জরের সৈন্যরা ইচ্ছা করলে নগরকোট মন্দিরকে বাঁচাতে পারতো কিন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওরা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সুলতান মন্দির অবরোধ করে দূর থেকে এর ভেতরে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। মন্দির ও মন্দির রক্ষাকারী সেনাদের অবস্থান ছিলো পাহাড়ের উপর। এ জন্য সুলতানের পক্ষে ওদেরকে সরাসরি আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছিলো না। দুতিন দিন অবরোধ করে প্রধান ফটক ভাঙ্গার জন্য জোরদার আক্রমণ হানলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মন্দিরের লোজন ফটক খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে।
