* * *
গজব আপতিত হচ্ছিলো সুলতান মাহমূদের উপর, তাদের উপর নয়। দৃশ্যত হিন্দুরা এতো বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটাবে, তা সুলতান আগে আন্দাজ করতে পারেননি। বিপুল সেনা সমাবেশ থেকে কিভাবে সুলতান নিজের বাহিনীকে নিরাপত্তা দেবেন তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছেন। সম্মিলিত হিন্দু বাহিনীর দুর্বলতাগুলো ইংরেজ ঐতিহাসিকের লেখায় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ইংরেজ ঐতিহাসিক স্যার ভিএ স্মিথ লিখেন
‘হিন্দু বাহিনীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিলো বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত বিভিন্ন রাজ্যের সেনাদেরকে একই কমান্ডের অধীনে ন্যস্ত করা। অথচ এই কমান্ডার অন্যান্য বাহিনীর রণকৌশল ও যুদ্ধপারদর্শিতা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। দ্বিতীয়ত, হাই কমান্ডের প্রতি অন্যান্য সেনাধ্যক্ষদের আস্থা ছিলো না। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রচণ্ড অভাব ছিলো। তৃতীয়ত, হাজার হাজার বেসামরিক লোককেও এই বাহিনীতে তাদের আবেগ ও দৈহিক সামর্থের বিচারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। অথচ এরা কোনো দিন যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত দেখেনি। রণকৌশল সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিলো না। চতুর্থত, হিন্দু বাহিনী ছিলো। সংখ্যাধিক্যে ও সামরিক সরঞ্জামের প্রতি অতিশয় নির্ভরশীল।
হিন্দু বাহিনীকে মানসিকভাবে শক্তি যোগাতে সেনাবাহিনীর সহগামী হিন্দু পুরোহিত ও তাদের সাথে নিয়ে আসা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। মুসলমান সেনারা দেখেছে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলে হিন্দু পুরোহিতরা সবার আগে এসব মূর্তি ফেলে পালাতে শুরু করে। পক্ষান্তরে সুলতান মাহমূদ তার রণকৌশল ও জানবাজ যযাদ্ধাদের পরিবর্তে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের ভরসা করতেন। প্রত্যেক লড়াইয়ের আগে তিনি দু’রাকাত নফল নামায আদায় করে আম্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। নিজের রণকৌশলের প্রতি তিনি ছিলেন আস্থাশীল। সেই সাথে এ বিষয়টিও তাকে শক্তি যোগাতে যে, নিজের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে তিনি যুদ্ধ করেন না, স্রেফ আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার জন্যই তিনি রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হন। সম্মিলিত হিন্দুদের বিশাল বাহিনী দেখে তার সেনাদের সর্বশেষ নির্দেশনা দিতে গিয়ে তিনি বললেন
বন্ধুরা! বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর চেয়ে তিনগুণ বেশি বেঈমান বাহিনীকে নবীজী পরাজিত করেছিলেন। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে আমাদের। আমি আজ তোমাদের কয়েকটি কথা বলতে চাই। নিজের অশে আরোহণ করা অবস্থায় সেনাদের উদ্দেশ্যে সুলতান বলতে লাগলেন, “আমি তোমাদের এই আত্মতুষ্টিতে ভুলিয়ে রাখতে চাই না যে, বিজয় তোমাদেরই হবে। তবে এ কথা অবশ্যই বলবো, তোমরা যদি আল্লাহর হয়ে যুদ্ধ করো, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের মদদ করবেন। মনের মধ্যে এই চেতনা রাখো, তোমরা আল্লাহর সত্য ধর্মের জন্য যুদ্ধ করছে। আল্লাহর কোনো শত্রুকেই তোমরা জীবিত থাকতে দেবে না। তোমাদের সামনে এখন পাহাড় দাঁড়ানো। এই পাহাড়কে অজেয় মনে করে যদি জীবনের প্রতি তোমরা বেশি দরদী হয়ে উঠো, তাহলে তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। মনে রাখবে, পাহাড় যতো দুর্ভেদ্য ও দুর্গম হোক না কেন, আমরা একে টুকরো টুকরো করে ফেলবো। নিজেদের কম জনবল আর শক্রদের সংখ্যাধিক্যের কথা ভুলে যাও। মনে রেখো, যুদ্ধ মনের জোরে হয়ে থাকে। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। আল্লাহ তাদেরই মদদ করেন যারা আল্লাহর নামকে উচ্চকিত করার জন্য বিজয়ের আশা নিয়ে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়।’
নিজ বাহিনীর ছোট্ট দুটি ইউনিটকে নিজের প্রত্যক্ষ কমান্ডে নিয়ে সুলতান মাহমূদ সিন্ধু নদের পাঞ্জাব তীরে তাবু গাড়লেন। তার গোয়েন্দাদের চোখে যেমন ৪ হিন্দু বাহিনীর বর্ণনা তিনি শুনেছেন, নিজের চোখে দেখেও তিনি হিন্দু বাহিনীকে পরখ করেছেন। হিন্দু বাহিনী এবার বিজয়ের নেশায় উন্মত্ত। তাই তিনি সেনা ক্ল কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বললেন- এবার হিন্দুরা বিজয়ের নেশায় উন্মত্ত, তাই ই আমাদেরকে খুবই ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে-চিন্তে অগ্রসর হতে হবে।’ তিনি পূর্বের যুদ্ধ ৫ পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন এনে সেনাবাহিনীকে কয়েকটি ঝটিকা বাহিনী ওগেরিলা দলে বিভক্ত করেন এবং কিছুসংখ্যক সৈন্যকে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে দিলেন। পেশোয়ার ও গজনীর নিরাপত্তার জন্য তিনি নদীকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্লান করলেন।
এছাড়া তার সেনা শিবিরের চতুর্দিকে তিনি পরিখা খনন করালেন। শিবিরের ভেতরে মরিচাবন্দী হয়ে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করাকে সমীচীন ভাবলেন। আরো কিছু নতুন কৌশলের কথা তিনি ভাবছিলেন কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করাও তার জন্য ছিলো ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, প্রতিদিনই নতুন নতুন লোক ও সেনা এসে হিন্দু বাহিনীর সাথে যোগ দিচ্ছিলো।
সুলতান দেখলেন, হিন্দু বাহিনী এখনো যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেনি। আল্লাহর উপর ভরসা করে একদিন ভোরবেলায় ফজর নামাযের পরক্ষণেই এক হাজার তীরন্দাজ ঝটিকা সৈন্যকে শত্রু সেনাদের উপর আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। বাহিনীর সবাই ছিলো ধাবমান অশ্বারোহণ ও লক্ষ্যভেদী তীরন্দাজে পারদর্শী।
৩৯৯ হিজরী মোতাবেক ২৯ রবিউস সানি ১০০৮ খৃস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর। বিখ্যাত ঐতিহাসিক গারদিজী স্বচক্ষে দেখা সেই যুদ্ধের বর্ণনায় বলেন, মাত্র এক হাজার তীরন্দাজকে আক্রমণে পাঠিয়ে সুলতান যেনো ভিমরুলের চাকে ঢিল দিলেন। শত্রু বাহিনী এদেরকে এভাবেই তুচ্ছজ্ঞান করলো, কোনো গুরুত্বহীন জিনিস লোকেরা যেমন অবজ্ঞাভরে আবর্জনায় ফেলে দেয়।
