তারা সবাই কুকুরকে ধরার জন্য এদিকে দৌড়ে এলে আলো-আঁধারীর মধ্যে সামুরাতি সুকাতে চেষ্টা করছিলো। কিন্তু লুকানোর মতো যুৎসই জায়গা পাচ্ছিলো না সামুরাতি। দৌড়-ঝাপের মধ্যে গলার আওয়াজ শুনে যখন আগন্তুকদের কণ্ঠ আরমুগানী ও তার সেবিকার কণ্ঠের মতো মনে হলো তখন ভাবনায় পড়লো, সে কোনো স্বপ্ন দেখছে না তো? না, আর লুকানোর চেষ্টা করলো না সামুরাতি। সামুরাতি তাদের মুখোমুখি হয়ে বললো, কিভাবে এখানে নীত হয়েছে। অতি সংক্ষেপে আরমুগনীও সামুরাতিকে জানালে তারা কি করে এ পর্যন্ত এসেছে। অকুস্থলে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা যুকিপূর্ণ ভেবে তারা সবাই যে জায়গায় উট ও ঘোড়া বেঁধে রেখেছিলো, সেখানে ফিরে এলো। যারকা ও সামুরাতিকে একটি উটের পিঠে, সেবিকাকে আরেকটি উটের উপর সওয়ার করিয়ে অন্যরা ঘোড়ায় চড়ে বসলো। খুব দ্রুতগতিতে স্থান ত্যাগ করে অগ্রসর হতে লাগলো আরমুগানীর কাফেলা। তাদের ফেরার গন্তব্য এখন লাহোর নয়, বেরা। লাহোর এখন আর তাদের কারো জন্যই নিরাপদ নয়।
পরিচিত পথ ছেড়ে বিজন জঙ্গল ও অচেনা পথ ধরে তারা অগ্রসর হতে লাগলো। তাদের পশ্চাদ্ধাবনের আশংকা ছিলো। আরমুগানী ভেবেছিলো, পণ্ডিত মন্দিরে গিয়ে বলবে, সামুরাতি পালিয়ে গেছে। সামুরাতির পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে পাহাড়ের সেনা ছাউনী থেকে সেনারা ঘোড়া নিয়ে নীচে অবতরণ করবে এবং সামুরাতির খোঁজে বের হবে। ইত্যবসরে তাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
আরমুগানীর আশংকা সঠিক ছিলো না। কেউ তাদের খোঁজে পশ্চাদ্ধাবন করেনি। সামুরাতির কুকুর পণ্ডিতের কাঁধ ও রানের গোশত্ ছিঁড়ে নিয়ে পাজরের হাড় ভেঙ্গে দিয়েছিলো। ক্ষতস্থান থেকে অস্বাভাবিক রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো। পণ্ডিত অব্যাহত চিৎকার করলেও কেউ না কেউ তাকে বাঁচানোর জন্য অবশ্যই আসতো। কারণ, এই আঘাতে তাৎক্ষণিকভাবে পণ্ডিতের মৃত্যু হওয়ার আশংকা ছিলো না। কিন্তু তাৎক্ষণিক দু’চারটি আর্ত-চিৎকার দিয়ে পণ্ডিত আর কোনো শব্দ করেনি। সে কাউকে তার সাহায্যের জন্যও ডাকেনি। এছাড়া পরনের কাপড় ছিঁড়ে ক্ষতস্থানে বেঁধে রক্ত বন্ধ করার জন্যও সে কোনো চেষ্টা করেনি। পাহাড়ের উপরে যাওয়ার পরিবর্তে পণ্ডিত অনতিদূরের সমতল ভূমির লোকালয়ের দিকেও নিজেকে বাঁচানোর জন্য অগ্রসর হয়নি।
কোথাও গেলো না পণ্ডিত। বাঁচার কোনো চেষ্টাই করলো না। কাষ্ঠ হাসি হেসে মনে মনে বললো, হয়েছে, খুব হয়েছে। এমনটাই হওয়া উচিত ছিলো। উচিত শিক্ষা হয়েছে…। পণ্ডিত নিজের নিস্তেজ ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে টেনে-হেঁচড়ে গঙ্গার তীরের দিকে চললো এবং বলতে লাগলো, “গঙ্গা মাও আমার এই পাপরাশি ধুতে পারবে না, কোনো আগুনও হয়তো আমার পাপ জ্বালাতে পারবে না। মন যখন পাপী হয়ে যায়, তখন শরীর পাপে ডুবে যেতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। আহ্! খুব তেষ্টা পেয়েছে ভগবান…!” পণ্ডিতের মাথা চক্কর দিতে শুরু করলো। কয়েকবার চক্কর খেয়ে পড়ে গেলো পণ্ডিত। শরীরের সব রক্ত ঝরে পড়েছে। এভাবে হোঁচট খেতে খেতে গঙ্গার পানির দিকে এগুতে থাকলো। এক পর্যায়ে পণ্ডিত ক্ষীণ আওয়াজে স্বগতোক্তি করলো, “আর একটু শক্তি দাও ভগবান, আমাকে গঙ্গা মার কোলে যেতে দাও!”
পণ্ডিতের প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছিলো। সে চক্কর খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলো। আবার কোনো মতে মাথা তুলে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো। এভাবে সামনে এগুচ্ছিলো। গঙ্গার পানির স্রোত ও ঢেউয়ের শব্দ তার কানে ভেসে আসছিলো। গঙ্গার শব্দ শুনে আরো তাড়াতাড়ি পৌঁছার জন্য অবশিষ্ট সব শক্তি দিয়ে গড়াতে লাগলো পণ্ডিত। এমন সময় তার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠলো সামুরাতির কথা “আমাকে আমার আল্লাহ বাঁচাবে, তোমাদের এসব মূর্তি সব ধ্বংস হয়ে যাবে।” তখন নিজের স্বগতোক্তিও মনে পড়লো তার- “নারী মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা হতে পারে, এছাড়া নারীকে অন্য কোনো রূপে রূপায়িত করে কাছে টানলে জ্বলে যেতে হবে। পরিণতি খুবই খারাপ হবে।” গোটা মন্দিরে এই নীতিই প্রতিষ্ঠা করেছিলো পণ্ডিত। কিন্তু নিজের নীতিতেই সে অটল থাকতে পারেনি। নিজেই। সেই পাপে জড়িয়ে পড়েছিলো। সামুরাতিকে সে সেই রূপই দিয়েছিলো, যা না ছিলো মা-বোন-কন্যা, না ছিলো স্ত্রী।
শরীরের রক্ত ঝরতে ঝরতে শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছিলো পণ্ডিতের। এদিকে পাপের অনুশোচনায় পণ্ডিতকে আরো নির্জীব করে ফেলেছিলো। এমতাবস্থায় গড়াতে গড়াতে সে গঙ্গা তীরে পৌঁছে যায়। এ জায়গাটা ছিলো ঈষৎ ঢালু। নদীর ঢেউ অনেক উপরে উঠে আসতো, আবার চলে যেতো অনেক নীচে। এমতাবস্থায় দু’চোখে অন্ধকার নেমে এলো পণ্ডিতের। কাদামাটিতে নিথর দেহ এলিয়ে দিলো পণ্ডিত। গঙ্গার ঢেউ এসে আছড়ে পড়লে তার গায়ে। পণ্ডিত শেষবারের মতো ক্ষীণকণ্ঠে বললো, “আমি পাপের পিয়াসী, আমি পাপী। এ সময় বিশাল এক ঢেউ এসে পণ্ডিতের নিথর দেহটি গঙ্গা তার গভীর বুকে টেনে নিয়ে যায়।
এদিকে মন্দিরের অন্যরা নগরকোটের মূর্তিগুলোকে নর্তকীর রক্তে স্নাত করার জন্য অপেক্ষা করছিলো। মন্দিরের সকল পুরোহিত মহাঋষির পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে। ব্রাহ্মপালের মা পণ্ডিতের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছিলো। বেলা এক প্রহর পার হলেও যখন পণ্ডিতকে গঙ্গাতীর থেকে ফিরে আসতে দেখা গেলো না, তখন ঋষির খোঁজে বেরিয়ে পড়লো লোকজন। দিনের শেষভাগে অনুসন্ধানকারী লোকজনও ফিরে এলো। কোথাও পণ্ডিত ও সামুরাতির খোঁজ পাওয়া গেলো না। অনুসন্ধানকারীরা গঙ্গাতীরে যাওয়ার পথে দেখতে পেলো রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। কিন্তু সেই রক্তের কোনো পরিচয় পাওয়া গেলো না। সেই রক্তের দাগ জন্ম দিলো বহু কাহিনী। অনেকেই অনেকভাবে রয়ে ব্যাখ্যায় গল্প তৈরি করলো। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও নগরকোটের পণ্ডিত ও সামুরাতির অস্তিত্ব উদ্ধার করতে পারলো না। এমতাবস্থায় সম্মিলিত হিন্দু বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ব্রাহ্মণপালের মা দেবদেবীর অভিশাপের ও অসন্তুষ্টির ভাবনায় মানসিকভাবে মুষড়ে পড়লো। ভয় করতে লাগলো, না জানি দেব-দেবীর পক্ষ থেকে কোন গজব আপতিত হয় কিনা।
