সামুরাতি হাসিতে ভেঙ্গে পড়লো এবং নিজেকে হঠাৎ করে পণ্ডিতের বাহবন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে নিলো। “শোনো! তোমার কৃষ্ণদেবী যদি সত্য হতো, তাহলে তোমার পঞ্চাশ বছরের প্রার্থনাকে এভাবে পাপে ভেসে যেতে দিতো না। আমি স্বাধীন। আমি জানতাম, তুমিও কোনো একদিন ওদের মতোই আমাকে চাইবে পাপীষ্ঠ পুরুষগুলো আমাকে যেভাবে পেতে চায়। আমি এ জন্যই তোমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই পাশবিকতাকে উস্কে দিয়েছি, যেন তুমি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আমার পায়ে এসে পড়ো। আমি তোমাকে ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো আমার পিছু পিছু মন্দিরের বাইরে নিয়ে আসবে এবং তোমার বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে যাবো।…, হ্যাঁ, আমি এখন স্বাধীন, আমি এখন মুক্ত।”
সামুরাতি হঠাৎ করে একদিকে দৌড়াতে লাগলো। কিন্তু অসমতল জমিনে সে বেশি দূর এগুতে পারলো না। পণ্ডিত দৌড়ে ওকে ধরে ফেললো এবং বললো, “পাগলামী করো না নর্তকী। আমার কাছ থেকে পালিয়ে তুমি কোথায় যাবে? আমি ঠিকই তোমাকে ধরিয়ে আনবো এবং বলী দিয়ে দেবো। আমি তো তোমার কাছে তেমন দামী জিনিস চাচ্ছি না।”
সামুরাতি গায়ের সব শক্তি দিয়ে পণ্ডিতের গালে থাপ্পর মেরে বললো, “আমি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরে যাবো কিন্তু তোমার মূর্তির জন্য মরতে পারবো না।”
“তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না নর্তকী। মূর্তির অপমান করো না।”
“আমার আল্লাহ আমাকে বাঁচাবে। আমার আল্লাহ যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে তোমাদের একটা মূর্তিও অটুট থাকবে না।”
পণ্ডিতের ভেতরকার পৌরুষরূপী পশুটা ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বেপরোয়া হয়ে উঠলো। যে প্রবৃত্তিকে হিমালয়ের পাদদেশে হত্যা করে এসেছিলো বলে মনে করেছিলো, পণ্ডিতকে তা আজ মাংসখেকো হিংস্র শৃগালে পরিণত করলো।
হঠাৎ অনতিদূরে একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যায়। দেখতে দেখতে কুকুরের ডাক নিকটবর্তী হতে থাকে।
যে সময় উপরের পাহাড় থেকে নীচে নেমে পণ্ডিত সামুরাতিকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো, ঠিক সে সময় শুয়াইব আরমুগনীর ছোট কাফেলা মন্দিরে যাওয়ার জন্য পাহাড়ী পথের শুরুটায় এসে পৌঁছে। সামুরাতির পরিচারিকা এই পথ ভালোভাবেই চেনে। এখানেই উট ও ঘোড়া তাদের ছেড়ে দিতে হবে। সামুরাতির কুকুরটি ছিলো বন্ধনমুক্ত। কুকুর হঠাৎ জমিন কে দু’পায়ে মাটি আচড়াতে থাকে এবং ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করে। সেই সাথে ওই পথেই কুকুরটি দৌড়াতে লাগলো যে পথে পণ্ডিত সামুরাতিকে নিয়ে গঙ্গাতীরের দিকে গিয়েছিলো। কাফেলার কেউ এদিকে তেমন খেয়াল করেনি। কারণ, কুকুর এমনটা করেই থাকে। কিন্তু কুকুর উচ্চ আওয়াজে ঘেউ ঘেউ করে সামনের দিকে দৌড়াতে থাকে। সামুরাতির সেবিকা বললো, মনে হয় কুকুর কোনো শিয়াল বা বনবিড়ালের গন্ধ পেয়েছে। তাদের কারো পক্ষে ঘুণাক্ষরেও ভাবার অবকাশ ছিলো না, কুকুর তার মালিকের গন্ধ পেয়ে দৌড়াচ্ছে। মাসাধিক সময় ধরে সামুরাতির সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন। কুকুরটি সামুরাতির এতোটাই প্রিয় ছিলো যে, শিশুর মতো সে কুকুরের সাথে খেলা করতো। কুকুর বিছানায় ওঠে সামুরাতির সঙ্গ দিতো।
পণ্ডিত কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দের কোনো পরোয়া করলো না। সে সামুরাতিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে ঝাঁপটে ধরে। সামুরাতি পণ্ডিতের পাঞ্জা থেকে মুক্ত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এ সময় কুকুরটি এসে সামুরাতির মুখের কাছে মুখ নিয়ে ওঁকে। সামুরাতি ভাবলো, এটি হয়তো কোনো নেকড়ে নয়তো মন্দিরের কোনো কুকুর হবে। কুকুরটি যে তারই পোষ তা সামুরাতির কল্পনার অতীত ছিলো। কুকুর ওর মুখে মুখ ঘষতে এবং ওর গা চাটতে শুরু করলো। সামুরাতির কেন যেনো সন্দেহ হলো, এটি তো তার শিরির মতোই মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনের অজান্তেই সামুরাতির মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- “শিরি, ছিঁড়ে ফেলো।”
সামুরাতির নির্দেশ মাত্রই কুকুর সামনের দুটি পা ছড়িয়ে দিয়ে পণ্ডিতের উপর হামলে পড়লো এবং পণ্ডিতের এক কাঁধের গোশত কামড়ে ছিঁড়ে ফেললো। কুকুর পণ্ডিতকে কামড়ে ধরে হেঁচড়াতে শুরু করলে পণ্ডিত বিকট শব্দে চিৎকার দিতে থাকে। এ সুযোগে সামুরাতি উঠে দাঁড়ায়। আর কুকুর পণ্ডিতের এক রান কামড়ে ধরে। পণ্ডিত মরণ চিৎকার দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে। এবার কুকুর তার রানের গোত ছিঁড়ে নিয়ে এক পা কামড়ে ধরে। সামুরাতি তখন চিৎকার করে বললো, আমি তোকে বলেছিলাম না পণ্ডিত! আমার আল্লাহ আমাকে বাঁচাবে। এটি আমার পালিত কুকুর। লাহের থেকে আমার গন্ধ এঁকে এঁকে দৌড়ে আমাকে বাঁচাতে এসেছে।
সামুরাতি কুকুর শিরিকে ঝাঁপটে ধরলো। সে ভাবতেই পারছে না তার কুকুর কী করে এখানে আসলো। দীর্ঘদিন পর মালিককে পেয়ে সামুরাতির পায়ে লুটোপুটি খেতে শুরু করলো। এদিকে পণ্ডিত প্রচণ্ড আঘাত নিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য পালাতে লাগলো। এমন সময় সামুরাতির কানে ভেসে আসে কারো পায়ের আওয়াজ। ভয়ে কেঁপে উঠে সামুরাতি। ভাবে, পণ্ডিতের আর্তনাদ শুনে হয়তো মন্দিরের সেনারা সাহায্যের জন্য আসছে। সামুরাতি কোথাও লুকানোর চেষ্টা করে। ঠিক এমন সময় এক নারীকণ্ঠ শোনা যায়, শিরি শিরি। কুকুর শিরিকে সামুরাতির বৃদ্ধা সেবিকা ডাকছে। এদিকে পণ্ডিতের আর্তনাদ এতোটাই বিকট ছিলো যে, সামুরাতির মনে হলো পণ্ডিত মরণ আর্তনাদ করছে। আরমুগানী ও তার সঙ্গীরা পণ্ডিতের আর্তনাদের পাশাপাশি কুকুরের গোঙানীর আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিলো। এ সময় আরমূগানীর মনে পড়লো, এই কুকুর তাকেও একদিন হামলা করে আহত করেছিলো।
