শেষ মঞ্জিলে রাত যাপনের অবসরে তারা সামুরাতিকে উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছিলো। তারা এটাই ভাবলো, এ ধরনের অপারেশন শেষ করে জীবন নিয়ে ফিরে আসা খুবই কঠিন। যারকা ও বৃদ্ধা পরিচারিকা দায়িত্ব নিলো, সামুরাতি যদি জীবিত থেকে থাকে তবে তারা তাকে উদ্ধার করবেই করবে।
বিশাল মন্দিরে ছিলো প্রায় কুড়িটি বড় বড় কক্ষ। ছিলো ছোট ছোট আরো বহু খিলান। তা ছাড়াও রয়েছে বিশালাকার পাতাল সুড়ং। সুড়ঙের সিঁড়িগুলো অন্ধকার। সামুরাতিকে এসব অন্ধ গলি থেকে বের করে আনার ব্যাপারটি জীবন বাজি রাখারই নামান্তর। বৃদ্ধা পরিচারিকা মন্দিরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে তাদের অবহিত করলো। তাছাড়া সবচেয়ে বেশি আশংকার কারণ ছিলো, মন্দিরের চারপাশ ঘিরে রাখা দুৰ্গসম সেনা ছাউনী।
আরমুগানী ও আরমুগানীর দু’সহযোগী খঞ্জর ও ছোট তরবারী তাদের পরিধেয় কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলো। রাতের শেষ প্রহরে তাদের এই ছোট্ট কাফেলা মন্দিরের দিকে রওয়ানা হলো। বৃদ্ধা পরিচারিকা কাফেলাকে পথ দেখাচ্ছে। রাতের অন্ধকার থাকতেই তারা মন্দিরের প্রধান ফটকে পৌঁছে যেতে চায়।
এই রাতটিই ছিলো সেই রাত, যে রাতে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ সামুরাতিকে বলেছিলো, খুব ভোরে এসে গঙ্গাস্নান করানোর জন্য তাকে গঙ্গাতীরে নিয়ে যাবে। খুব ভোরে পণ্ডিত যখন সামুরাতির কক্ষে উপস্থিত হলো, সামুরাতি তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পণ্ডিত তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললো। বললো, তোমাকে আমার সাথে যেতে হবে। সামুরাতি নীরবে পণ্ডিতের সাথে রওয়ানা হলো। মন্দির থেকে বের হলে তাদের জন্য দুর্গের প্রধান ফটক খুলে দেয়া হলো। দুর্গের বাইরে এসে তারা পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নীচে নামতে শুরু করলো। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে ওঠানামা পণ্ডিতের জন্য কোনো মুশকিলের ব্যাপার ছিলো না। কারণ, তার এ পথ খুবই চেনা। কিন্তু সামুরাতির জন্য নীচে নামা ছিলো কঠিন। কারণ, ঘোড়াগাড়িতে যাতায়াত করে সে অভ্যস্ত। তার পক্ষে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের নীচে নামার ঘটনা কখনো ঘটেনি। তাছাড়া তাকে যে চপ্পল দেয়া হয়েছিলো, তা পায়ে দিয়ে হাঁটা তার জন্য ছিলো আরো মুশকিল। পাহাড় থেকে নীচে নামার সময় বারবার সামুরাতির পা পিচলে যাচ্ছিলো। পণ্ডিত তাকে ধরে সহযোগিতা করছিলো, যার ফলে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছিলো সামুরাতি। পণ্ডিতকে এক হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছিলো সামুরাতি। পণ্ডিতও নিজেকে সামলানোর জন্য একহাতে সামুরাতিকে ঝাঁপটে রাখলো। তারপরও যখন বারবার সামুরাতি হোঁচট খাচ্ছিলো, তখন পণ্ডিত অনেকটা সামুরাতিকে তার কাঁধেই আগলে নিয়ে নীচে নামতে শুরু করলো। মওসুম ছিলো শীতের। সামুরাতি ছোট হয়ে পণ্ডিতের শরীরের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখে।
অনেক কষ্টে তারা পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নীচে নেমে নদী তীরের দিকে রওয়ানা হয়। মন্দির নদীতীর থেকে বেশ দূরে। উপরের পাহাড় চূড়ায় মন্দির আর নীচের নদী তীরবর্তী এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ। পণ্ডিত সামুরাতিকে তার বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করেনি। পরস্পর জড়াজড়ি করেই তারা নদীর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। তখনো পূবাকাশে ভোরের লালিমা দেখা দিতে অনেক দেরী। ভোর হতেই লোজন গঙ্গাতীরে আসতে শুরু করবে। এ জন্য পণ্ডিত অন্ধকার থাকতেই সামুরাতিকে নিয়ে গঙ্গাতীরের দিকে ছুটলো। যাতে অন্ধকারে মাসুরাতিকে সে লুকিয়ে রাখতে পারে।
“আপনি কি আমাকে শেষ গোসল দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলো সামুরাতি।
পণ্ডিত তার হাতের বন্ধনে সামুরাতিকে আরো বেশি করে নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নেয়ার চেষ্টা ছাড়া কোনো জবাব দেয় না। মনে হচ্ছিলো, পণ্ডিত বুঝি তাকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলবে।
“আপনি কথা বলছেন না কেন? আমাকে আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? আমাকে আজই যদি মরতে হয় তাহলে বলেই দিন না?”
“হ্যাঁ, সবই বলবো সামুরাতি।” দু’হাতে বুকের সাথে সামুরাতিকে চেপে ধরে বললো পণ্ডিত। “আমার মন বলছে শুধু তুমি একা নও, আমরা উভয়েই বলী হয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, আমার হয়তো আজকের সূর্য আর দেখা হবে না।” আওয়াজ জড়িয়ে এলো পণ্ডিতের। জড়ানো কণ্ঠে বললো, “হয়তো এটাই জীবনের শেষ সময়। আমাকে পিপাসা নিয়ে মরতে দিও না। আমি ভেবেছিলাম, আমার হৃদয়ের আবেগ-ভালোবাসা মরে গেছে। কিন্তু না, আমার হৃদয়ের আবেগ মরেনি। আমি তোমার মধ্যে মমতাময়ী নারীর ছবি আঁকতে চেয়েছি তোমাকে মেয়েরূপে, বোনরূপে, মায়ের অবয়বে চিত্রিত করতে চেয়েছি। দেবীর চরিত্রও তামার মধ্যে আমি চিত্রিত করতে চেয়েছি। কিন্তু কোনোটিই স্থিতি পায়নি। আমি তোমার মধ্যে দেবীর হাসিও দেখেছি কিন্তু তবুও আমার পাপীমনকে বোঝাতে পারিনি। আমি বুঝতে পারি না, এমন কেনো হলো। নারীর সঙ্গ থেকে আমি পালাতে বহু চেষ্টা করেছি কিন্তু…।”
“আপনি পাথরের মূর্তির পূজা করেন। আমার আল্লাহর ইবাদত করুন, দেখবেন মন থেকে সব পাপ দূর হয়ে যাবে।”বললো সামুরাতি।
“আমাকে আর কথার প্যাঁচে জড়িও না নর্তকী। আমি তোমাকে হৃদয়ের প্রেম দিয়েছি। এর বিনিময়ে তুমি আমাকে দেহের উষ্ণতা দিয়ে তৃপ্ত করে। আজ হয়তো তোমার জীবনের শেষ দিন। এরপর তোমার দেহকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে কিন্তু আমি তো বেঁচে থেকেও জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে ভস্ম হচ্ছি।”
