এর আগে আনন্দ পালের অপর স্ত্রী শুকপালের মা এই ভেবে ছেলেকে বিদ্রোহে উস্কানি দিয়েছিলো যে, শুকপাল বিদ্রোহ করে বেরায় সুলতান মাহমূদকে বন্দী করতে পারবে। আর শুকপাল হবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। কিন্তু পরিণতিতে শুকপাল নিজেই বন্দী হলো আর সুলতান তাকে আজীবনের জন্য বন্দী করে জেলখানায় আটকে রাখলো।
এখন আনন্দ পালের দ্বিতীয় স্ত্রী ভাবলো, তার ছেলে পেশোয়ার জয় করে গজনী পদানত করবে এবং বাপের সিংহাসনের উত্তাধিকারী হবে। সে পুত্রের বিজয়ের জন্য উন্মুখ ছিলো। তাই নগরকোটে নর্তকীর বলীদান পর্ব সমাধান হয়েছে কিনা তা জানার জন্য রাণী এখানে এসেছে।
বড় পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ রাজা আনন্দ পালের স্ত্রীকে জানায়, মুসলমান ঘরের মেয়ে এবং নর্তকী হওয়ার কারণে মেয়েটিকে পবিত্র করে বলীদানের উপযোগী করতে অনেক সময় লেগে গেছে।
ব্রাহ্মপালের মা বললো, “এর আগেও এক কুমারী মেয়েকে বলী দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে প্রস্তুত করতে এতো সময় লাগেনি!” সে পণ্ডিতকে তাকিদ করলো, শীঘ্রই যেনো বলীদান কাজ সেরে ফেলা হয়। কারণ, আমাদের সৈন্যরা রণাঙ্গনের একেবারে কাছে চলে গেছে অথচ সে জানতে পেরেছে, নর্তকীকে নাকি এখনো মা গঙ্গার জলে স্নান করানো হয়নি।
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের মর্যাদা ছিলো রাজা-মহারাজাদের চেয়েও বেশি। হিন্দুস্তানে তাকে ভগবানের বিশেষ দূত মনে করা হতো। কিন্তু আনন্দ পালের স্ত্রীর আশংকা ও উমায় পণ্ডিতের আভিজাত্য ও অহংবোধে আঘাত হানে। রাণী আরো বললো, নর্তকী সামুরাতি এতোটাই সুন্দরী যে ওকে কেউ দেখলে আর চোখ ফেরাতে পারে না। জানি না, ওর এই জাদুময়তা নগরকোট মন্দিরেও প্রভাব সৃষ্টি করেছে কিনা। আমার সন্দেহ হচ্ছে, নর্তকীর জাদু এখানেও প্রভাব বিস্তার করেছে। নর্তকীর বলীদান কর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি মন্দিরেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ এ কথার পরও আনন্দ পালের স্ত্রীকে কিছুই বললো না। কারণ, তার সন্দেহ অমূলক ছিলো না। পণ্ডিত আনন্দ পালের স্ত্রীকে জানালো, “এই একটি কাজই বাকি রয়েছে, এ কাজ আগামীকাল সকালেই সমাধা হবে। তার পরদিন নর্তকীর বলীদান কর্ম সেরে ফেলা হবে।”
রাজা আনন্দ পালের স্ত্রী এ কথার পর শাহী মেহমানখানায় চলে যায়। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ আবার ফিরে আসে সামুরাতির কক্ষে। সামুরাতি স্মিত হেসে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। পণ্ডিতের চেহারা ছিলো উদ্বিগ্ন। সে নিষ্পলক সামুরাতির দিকে তাকিয়ে রইলো। সামুরাতি তার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ জিজ্ঞেস করলে পণ্ডিত জানালো, “সে আগামীকাল ভোরে আসবে এবং তাকে নিয়ে গঙ্গা তীরে যাবে।” এ কথা বলেই কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো পণ্ডিত।
***
এদিকে শুয়াইব আরমুগনীর কাফেলা সামুরাতির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। দুটি উট ও তিনটি ঘোড়ার ছোট কাফেলা। একটি উটে এক যুবতী আর অপর উটে এক অর্ধবয়স্কা মহিলা আরোহী। আর তিনটি ঘোড়ায় তিনজন পুরুষ। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হবে এরা তীর্থযাত্রী, একটি কুকুরও এই কাফেলার সহযাত্রী। সেই যুগে দূর ভ্রমণযাত্রী কাফেলার সাথে প্রশিক্ষিত কুকুর নেয়া হতো নিরাপত্তার সহায়ক হিসেবে। লাহোর থেকে রওয়ানা হয়ে নগরকোটের দিকে যাচ্ছে কাফেলা। রাস্তায় তাদের কেউ জিজ্ঞেস করলে তারা জানিয়েছে, পূজাপাঠের জন্য তারা নগরকোট মন্দিরে যাচ্ছে। টানা তিন দিন চলার পর আরমুগানীর ছদ্মবেশী এই কাফেলা নগরকোট মন্দিরের কাছে চলে আসে। নগরকোট মন্দিরের নিকটবর্তী হয়ে তারা লোকজনকে বলে, তারা মহাঋষি রাধাকৃষ্ণের দর্শনের জন্য, তার পদধূলি নেয়ার জন্য নগরকোট এসেছে। কারণ, নগরকোটের আশপাশের লোকরা পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণকে অবতার বলেই মনে করে।
নগরকোটের অনতিদূরে আরমুগানীর কাফেলা শেষ রাত যাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করে। রাতের বেলা আগুন জ্বালিয়ে আগুনের চারপাশে বসে কাফেলার একজন বললো, “আমরা যদি মন্দিরে প্রবেশ করতে পারি আর আমাদের কেউ সন্দেহ না করে, তাহলে মন্দিরের কোথায় কি আছে তা জানা সম্ভব হবে। যদি জানতে পারি, সামুরাতিকে বলী দেয়া হয়ে গেছে, তাহলে আমি নগরকোটের সব পণ্ডিতকে হত্যা করে ক্ষ্যান্ত হবো।”
এই দৃঢ়তা ও প্রতিজ্ঞা আর কারো নয়, শুয়াইব আরমুগানীর। কারণ, মন্দিরের আচার অনুষ্ঠান সে জানতো। লাহোর থেকে আমরা দুজন সহকর্মীকেও সে সাথে করে নিয়ে আসে। যারকা আগেই সামুরাতির বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলো। সামুরাতির পরিচারিকা তো পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিলো। আরমুগানী ও তার দু’সহকর্মী মাথা ন্যাড়া করে হিন্দু পুরোহিতদের মতো মাথায় তিলক পরেছিলো। গোঁফ পরিষ্কার করে এমন কৃত্রিম গোঁফ মুখে লাগিয়ে নিয়েছিলো যে, তাদের ঠোঁট দেখাই যাচ্ছিলো না। পরিচারিকা ও যারকাকেও হিন্দু সন্ন্যাসীদের মতো পোশাকে সজ্জিত করা হয়েছিলো। মহিলা দু’জন শরীরে লম্বা দানাওয়ালা দস্তানা ঝুলিয়ে দিলো।
উট ও ঘোড়ার ব্যবস্থা শুয়াইব আরমুগানীর সহকর্মীরা করেছিলো। কুকুর সাথে নেয়ার বায়না ধরেছিলো পরিচারিকা। কারণ, ওখানে গেলে সামুরাতির অতি যত্নে পোষা কুকুরের দেখাশোনা করার কেউ ছিলো না। সামুরাতি এই কুকুরকে খুবই যত্ন করতো। অবসরে কুকুরের সাথে খেলা করতে সামুরাতি আর রাতের বেলা তার বাড়ি পাহারা দিতো এই দুর্ধর্ষ কুকুর। অবশ্য পথে এমন একটি কুকুর সাথে রাখার প্রয়োজনও ছিলো।
