* * *
এদিকে নগরকোট মন্দিরে সামুরাতির প্রায় মাসখানেক কেটে গেছে। নর্তকী সামুরাতির কক্ষ ততদিনে শাহজাদীর কক্ষে পরিণত হয়েছে। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ সামুরাতির কক্ষে এসে ঘণ্টার পর ঘন্টা গল্পগুজব করতো। পণ্ডিতের বর্তমান অবস্থা দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারত না, এই সেই পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ। রাধাকৃষ্ণের বয়স সামুরাতির বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো। পণ্ডিত সামুরাতির কক্ষে একটি পালঙ্ক নিয়ে এলো এবং এর মধ্যে গালিচা ও মখমলের বিছানা পাতার নির্দেশ দিলো। প্রদীপের পরিবর্তে সামুরাতির কক্ষে এলো রঙিন ফানুস, আর সেবিকা দুই তরুণী প্রতিদিন সকালে কক্ষ ঝাড়া-মোছা করে পুরনো ব্যবহার্য জিনিসপত্র সরিয়ে নতুন জিনিস ও নতুন ফুলের তোড়া দিয়ে যেতো।
অন্য পণ্ডিতরা ভেবেছিলো, তাদের গুরু সামুরাতিকে বলীদানের জন্য নিজেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করছে। কিন্তু পণ্ডিত সামুরাতির কক্ষে গিয়ে ভুলেই যেতো বলীদানের জন্য প্রস্তুত করার কথা। কিন্তু সামুরাতি কখনো বিস্মৃত হয়নি যে তাকে বলী দেয়া হবে। সে জানতো তাকে বলীদানের জন্যই প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এতোদিন কখনো ভুলেও পণ্ডিত সামুরাতিকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু যে পণ্ডিতকে কেউ কোনদিন হাসতে দেখেনি, এখন সে এ কারণে ও কারণে রীতিমতো হাসে। সামুরাতির কোনো কোনো কথায় সে সশব্দে হেসে ওঠে। ইতিমধ্যে সামুরাতি তাকে কয়েকবার বলেছে, তাকে যেনো শীঘ্রই বলী দিয়ে দেয়। কারণ, মৃত্যুর অপেক্ষা খুব কষ্টকর। সামুরাতির মুখে এ কথা শুনলে পণ্ডিতের চেহারা বিমর্ষ হয়ে যায়।
যে পণ্ডিত ভাবতো নারীর সংসর্গ ত্যাগ করে সে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে নিয়েছে, সেই পণ্ডিত এখন দেবতাদের অসন্তুষ্ট করে সামুরাতিকে খুশি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। নারী বঞ্চিত রেখে নিজের মধ্যে পণ্ডিত যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছিলো, সেই শূন্যতা সামুরাতির মাধ্যমে পূর্ণতা পাচ্ছিলো। পিপাসার্ত মানুষ পানি দেখলে যেমন তৃষ্ণার কষ্ট আরো বেশি অনুভব করে, তেমনি পণ্ডিত সামুরাতির সান্নিধ্যে নিজের শূন্যতা আরো বেশি অনুভব করতে লাগলো। সে সামুরাতিকে কখনো নিজের কন্যা রূপে, কখনো বোনের অবয়বে, কখনো নিজের মায়ের কাপে অনুভব করতে লাগলো। এই মন্দিরে সামুরাতির চেয়ে আরো সুন্দরী তরুণীও এসেছে কিন্তু পণ্ডিত কখনো ওদের সাথে কথা বলার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। দৈবক্রমে ওদের দিকে কখনো দৃষ্টি পড়ে গেলে সাথে সাথে সে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতো। সামুরাতিই ছিলো প্রথম নারী যার সাথে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ কথা বলেছে এবং নিজের অজান্তেই সামুরাতি তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। সামুরাতির সেই স্পর্শ ও আলিঙ্গন পণ্ডিতের মধ্যে সেই অনুভূতি সৃষ্টি করে, যে অনুভূতির দ্বারা মানুষ নিজেকে অনুধাবন করতে পারে।
“তোমার আত্মা কি এখনো সেই শূন্যতা অনুভব করে যে ভালোবাসা পূরণের অনুরোধ তুমি আমাকে করেছিলো সামুরাতিকে জিজ্ঞেস করলো পণ্ডিত।
“সম্ভবত আপমিই প্রথম পুরুষ যে এততদিন আমাকে নিজের আয়ত্তে রেখেও এভাবে রেখেছেন যেনো আমি আপনার কজায় থেকেও আপনার আয়ত্তের বাইরে।” বললো সামুরাতি। “আমার শরীরের প্রতি আপনার কোনো আকর্ষণ নেই। এতেই আমার আত্মা শান্তি পেয়েছে।… আচ্ছা, এখন কি দেবতার চরণে বলী হওয়ার যোগ্য আমি হতে পেরেছি।”
“না, এখনও সেই সময় আসেনি।” উদাস কণ্ঠে বললে পণ্ডিত।
পণ্ডিত গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামুরাতির দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে পণ্ডিতের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু পরতে শুরু করলো। সামুরাতি আগ বেড়ে পণ্ডিতের মাথা তার বুকে চেপে ধরলো। শাড়ির আঁচলে পণ্ডিতের চোখের পানি মুছে দিলো। তার ঝুঁকে থাকা মাথার এলোমেলো চুলগুলো পণ্ডিতের নাকে-মুর্থে ছড়িয়ে পড়লো। পণ্ডিতের একটি হাত কাঁপতে কাঁপতে উপরের দিকে উঠে এলো। সামুরাতির গাল পণ্ডিতের মাথা স্পর্শ করছিলো। কাঁপা কাঁপা হাতে পণ্ডিত সামুরাতির রেশমী কোমল ফুল স্পর্শ করলো। কয়েকটি চুল নিজের চোখের উপর ছড়িয়ে দিলো পণ্ডিত।
হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় পণ্ডিত। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে গেলো সামুরাতি। উঠে চোখ বড় বড় করে পণ্ডিত সামুরাতিকে দেখতে লাগলো। যেনো তার আত্ম-পরিচয়কে জাগিয়ে দিয়েছে কেউ। যেনো কোনো অশরীরী আত্মা এসে তার হাতকে নারীর চুলে স্পর্শ করিয়েছে।
মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি বাজতে লাগলো। সমূর্তিতে ফিরে এলো পণ্ডিত। কোনো রাজা-মহারাজা মন্দিরে এলেই কেবল এই ঘণ্টা ধ্বনিত হয়। পণ্ডিত নিজে মন্দিরের সদর দরজায় গিয়ে আগন্তুক রাজা-মহারাজাকে অভ্যর্থনা জানায়। সামুরাতির দিকে গভীর মমতার দৃষ্টি মেলে পণ্ডিত বললো, “হয়তো কোনো মেহমান এসেছে, আমি আসছি।”
বিশেষ ঘণ্টা ধ্বনি অমূলক ছিলো না। রাজা আনন্দ পালের স্ত্রী এলো নগরকোট মন্দিরে। এই স্ত্রী হলো আনন্দ পালের অপর পুত্র ব্রাহ্মপালের মা। আনন্দ পাল সম্মিলিত বাহিনীর সাথে থাকলেও গোটা বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ড ছিলো ব্রাহ্মপালের হাতে। রাজা আনন্দ পাল তার এই স্ত্রীকে বলেছিলো, রাজমহলের সবচেয়ে সুন্দরী ও অভিজ্ঞ নর্তকীকে নগরকোটের পণ্ডিত বলীদানের জন্য রেখে দিয়েছে। রাজা আরো বলেছে, এবার ব্রাহ্মপালের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী বিজয়ী হবেই হবে।
