সম্মিলিত বাহিনীর গতি মন্থর হওয়ার অপর কারণ ছিলো নদী। সৈন্যরা নদী পার হয়ে গেলেও তাদের রসদ সামগ্রীর গাড়ি পার করা ছিলো কঠিন। সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা প্রায় লাখের কোঠায় পৌঁছে। অপরদিকে সুলতান মাহমূদের কাছে তখন সৈন্য ছিলো মাত্র হাজারের কোঠায়। বিশাল হিন্দু বাহিনীর নদী পার হতে কয়েক দিন লেগে যায়। বড় নদী ছাড়া আরো ছোট ছোট নদীও তাদের গতিপথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সম্মিলিত বাহিনীর গতি মন্থরতার অপর কারণ ছিলো জনগণের অতি উৎসাহ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোটা ভারতের মন্দিরগুলো থেকে এমন জোরদার প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, গজনী বাহিনী গোটা হিন্দুস্তান দখল করতে ধেয়ে আসছে, ওরা সব হিন্দু মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ বানাবে, সকল হিন্দু তরুণীকে ধরে বাদী-দাসীতে পরিণত করবে, সকল হিন্দুকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করবে। মন্দিরের এই অপপ্রচারে হিন্দুস্তান জুড়ে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন সেনাবাহিনীকে আশীর্বাদ জানানোর জন্য, তাদের আদর-আপ্যায়ন করার জন্য জড়ো হতে থাকে। এতে সেনাদের গতিতে মাঝে-মধ্যে ছেদ পড়ছে। সাধারণ হিন্দুরা তাদের সঞ্চিত সোনাদানা, খাবার-দাবার, উট-ঘোড়া সেনাদের উপঢৌকন দেয়ার জন্য খবর শুনে আগেভাগেই পথিমধ্যে জমা করে রাখতো। যেসব হিন্দু যুবক তীর-তরবারী ও বর্শা চালাতে পারতো, অশ্বারোহণে দক্ষতা রাখতো; তারা নিজেদের ঢাল-তরবারী ও অশ্ব নিয়ে সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত হতো। মন্দিরের ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছিলো।
সম্মিলিত হিন্দু বাহিনী মহা-প্লাবনের মতো অগ্রসর হচ্ছিলো। প্রতিদিনই হিন্দু বাহিনীতে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো সৈন্য সংখ্যা। সকল হিন্দু নাগরিক ও সৈন্যের মধ্যে একই শ্লোগান, একই আওয়াজ- মুসলমানদের পিষে ফেলো, ওদেরকে ভারত সাগরের ওপারে পাঠিয়ে দাও। ইসলামকে চিরদিনের জন্য হিন্দুস্তানের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দাও।
পেশোয়ারে অবস্থানরত সুলতান মাহমুদের কাছে প্রতিদিন খবর আসছিলো, হিন্দু বাহিনী কতটুকু অগ্রসর হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ওদের বাহিনীর সংখ্যা কি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি তার সেনাপতিদের বলে দিয়েছিলেন, শত্রুবাহিনী কিছুতেই যাতে নদী পার হতে না পারে। যুদ্ধ নদী তীরেই সংঘটিত হবে। তার সেনাপতিরা এই আশংকা প্রকাশ করেছিলো, যেহেতু শত্রুবাহিনী সংখ্যায় বিপুল, তাই পেছনে নদী রেখে মোকাবেলায় অবতীর্ণ হওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ, প্রয়োজনে পশ্চাদপসারণের সুযোগ তখন বিপদ শংকুল হয়ে উঠবে।
সুলতান মাহমূদ তাদের বললেন, আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করতে হবে। সম্মুখ মোকাবেলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর গেরিলা যুদ্ধের জন্য নদী তীরবর্তী এলাকাই সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি সেনাপতিদের বলেন, পেশোয়ারের নদী তীরবর্তী এলাকা অসমতল। এখানটা গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী নয়। শত্রুবাহিনী এপাড়ে এসে গেলে সংখ্যাধিক্যের জোরে দু’চার ইউনিট সৈন্য হারিয়েও আমাদের ঘেরাও করতে সমর্থ হবে। আর ওপারে যদি ওরা আমাদের পিছু হটতে বাধ্যও করে, তবুও রিজার্ভ বাহিনী দিয়ে আমরা ওদের নদী পারাপার ঠেকিয়ে দিতে পারবো।
নিজ সেনাদের চেতনা, তাদের আবেগ, আদর্শিক দৃঢ়তা, নিজের রণ-পরিকল্পনা সর্বোপরি আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা ছিলো সুলতানের। তিনি অনেক আগেই মাঝি-মা ও মুটে-মজুরদের বেশে সিন্ধু তীরে কিছু সৈনিক মোতায়েন করে রেখেছিলেন। অপরদিকে কিছু ঝটিকা বাহিনীর সদস্য খিদররাতে মোতায়েন করেছিলেন। তাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো, শত্রুবাহিনীর আনাগোনা, গমনাগমন পর্যবেক্ষণ করবে এবং এরা যদি নদী পার হতে চায় তবে নদী পারাপারের জন্য তৈরি নৌকা-পুলের রশি কেটে দেবে। সম্ভব হলে নৌকা ছিদ্র করে দেবে।
গভীর চিন্তা-ভাবনার পর সুলতান তার বাহিনীকে যাত্রার নির্দেশ দিলেন এবং সিন্ধুকূলে এসে পৌঁছলেন। তিনি সেনাবাহিনীকে চার অংশে ভাগ করলেন। দুই অংশকে নদীর অপর পাড় আটকের উত্তর পাশে নিযুক্ত করলেন। আর দুই অংশকে নদীর এপাড়ে পেশোয়ার তীরে রাখলেন। এ পাড়ের দুই ভাগের একভাগ ছিলো অশ্বারোহী ও তীরন্দাজ। তাদেরকে নদী রক্ষার নির্দেশ দেয়া হলো। তাদের দায়িত্ব হলো নদীর তীরবর্তী এলাকাকে শত্রুমুক্ত রাখা এবং কিছুতেই যাতে শত্রুবাহিনী কোনদিক থেকে নদী পাড় হতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। আর এপাড়ের অপর অংশটি ছিলো রিজার্ভ বাহিনী। সেই সাথে নদীতে একটি নৌকা-পুলও তৈরি করা হলো।
সেনাবাহিনীর অবস্থান ঠিক করতেই সুলতানের কাছে খবর এলো, শত্রুবাহিনী তাদের অবস্থান থেকে পনের মাইল কাছে এসে গেছে। এটাই ছিলো শত্রুবাহিনীর শেষ ছাউনী। সুলতান আরো কিছু সময় চাচ্ছিলেন। তার একটু অবকাশের প্রয়োজন ছিলো। অবশ্য এ অবকাশ থেকে কোনো দিক থেকে সামরিক সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না। তখন শীতের মৌসুম শুরু হয়েছিলো। তিনি চাচ্ছিলেন যুদ্ধটা প্রচণ্ড শীতের মধ্যে টেনে নিতে। তার সেনারা প্রচণ্ড শীতেও সড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু কনৌজ ও গোয়ালিয়রের সেনাদের সম্পর্কে তিনি জানেন, ওরা অত্যধিক শীতে যুদ্ধ করতে অসুবিধা বোধ করে।
