সামুরাতি পণ্ডিতের হাত ধরে তাকে বিছানায় বসতে অনুরোধ করে। কিন্তু পণ্ডিত বসলো না। সে কক্ষে পায়চারি করতে লাগলো। সামুরাতি নীরব দাঁড়িয়ে রইলো। পণ্ডিত দাঁড়িয়ে তাকে দেখলো এবং মাথা নীচু করে ফেললো, যেনো সামুরাতির মুখোমুখি হতে অপ্রস্তুত। কয়েক কদম পায়চারি করে দাঁড়িয়ে সামুরাতিকে কাছে ডাকে পণ্ডিত।
“আমি জানি, তুমি প্রেমের কাঙালিনী।” বললো পণ্ডিত। “আসলে তুমি স্নেহ-মম-ভালোবাসা বর্ষিতা। তোমার ভালোবাসা প্রয়োজন। স্নেহ-মমতা ও প্রেম দরকার। বাবার আদর… ভাইয়ের মেহ.. সন্তানের মমতা… অথবা তোমার চাই…”
“হ্যাঁ, আপনি কি জানেন না, তৃষিত হৃদয় কোন্ ভালোবাসা চায় আপনার কাছে কোন্ ভালোবাসা আছে?”
পণ্ডিতের চেহারার ভাব বদলে যেতে থাকে। তার চোখে আন্তরিকতা ভেসে ওঠে। সামুরাতি পণ্ডিতের কাঁধে তার বাজু রেখে নিজেকে পণ্ডিতের শরীরের সাথে এতোটাই মিশিয়ে দিলো যে সামুরাতির বুক পণ্ডিতের বুক স্পর্শ করে। সামুরাতির শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা স্পষ্টই অনুভব করতে লাগলো পণ্ডিত। সামুরাতি পণ্ডিতকে বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে কানে কানে বললো, ‘আপনার কাছে আছে কি সেই ভালোবাসা, যে ভালোবাসার সাথে দেহের কোনো সম্পর্ক নেই, যে প্রেমে নেই কোনো পাপের গন্ধ?’
সামুরাতির তপ্ত নিঃশাস পন্ডিতের নিঃশ্বাসের সাথে মিশে তাকে মোহাচ্ছন্ন করে তুলে।
“ঘাবড়ে যাবেন না সাধু! আপনি যে নারী থেকে পালিয়ে থাকেন, সেই নারী হয় শরীর সর্ব, সে তো একটা জীবন্ত মূর্তি মাত্র। আমি কোনো মানব মূর্তি নই। দেহকে আমি ত্যাগ করেছি, আপনাকে হৃদয়ের ভালোবাসা দিচ্ছি আমি, আপনাকে আমার আত্মার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। এ আত্মা থেকে আপনার পালানোর দরকার নেই, এটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” বললো সামুরাতি।
অবচেতন হয়ে যাচ্ছিলো পণ্ডিত। সামুরাতি দু’হাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো পণ্ডিতকে। পণ্ডিত সামুরাতির জাদুকরী দৃষ্টির অদৃশ্য শিকলে বাঁধা পড়ে না যায়।
“আমি জানি, আপনার আত্মাও তৃষ্ণার্ত। নারীর প্রেম-ভালোবাসার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই। নারী অপবিত্র হতে পারে কিন্তু তার ভালোবাসা অপবিত্র নয়।”
হঠাৎ করে পণ্ডিত সামুরাতির কাঁধে হাত রেখে সামুরাতিকে বুকের বেষ্টনী থেকে দূরে ঠেলে চোখে চোখ রেখে বললো- “আমি জানি না ভালোবাসা কেমন। আমি জানি না কোন্ প্রেম-ভালোবাসার কথা তুমি বলছো। আমার কোনো মেয়ে নেই, বোন নেই। মাকে দেখেছি ছোটবেলা। বিয়েও করিনি আমি। তুমিই আমাকে ভালোবাসা বোঝাও।”
“আপনার হৃদয়ে কি কোনো ধরনের তৃষ্ণা অভাববোধ অনুভব হচ্ছে না?” বললো সামুরাতি।
“আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে যুবতী।” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো পণ্ডিত। “তুমি আমাকে আর জ্বালিও না।”
সামুরাতি গভীরভাবে পণ্ডিতের কথায় পরিবর্তন লক্ষ্য করলো, আগে পণ্ডিত কথায় কথায় আমাদের শব্দ ব্যবহার করতো কিন্তু আজ ‘আমার’ শব্দ ব্যবহার করছে।
“আমাকে জবাই করার আগে ভালোবাসার স্বাদটুকু আপনি আস্বাদন করে নিন, নয়তো আমার দেহ জবাই হয়ে যাবে বটে কিন্তু আপনার আত্মার অপমৃত্যু ঘটবে।”
পণ্ডিতের মাথা গুলিয়ে গিয়েছিলো, সে মনের মধ্যে কোনোকিছুই গোছাতে পারছিলো না। কখনো সামুরাতির দিকে তাকাতো আবার কখনো মাথা নীচু করে কক্ষে পায়চারি করছিলো।
“কবে আমাকে বলী দেবেন পণ্ডিতজী মহারাজ!” চকিতে ঘুরে দাঁড়ালো পণ্ডিত। এভাবে কথাটি বললো যেনো তার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়েছে, “না না, এখনই নয়- তোমাকে এখনই বলী দেয়া হবে না।”
‘আজ না হয় হবে না, কিন্তু কাল তো দেয়া হবে? পণ্ডিত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড় বিড় করে বললো- “কাল আসতে বহু সময় বাকী। কে জানে কাল কি হবে!”
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো পণ্ডিত এবং দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলো। পণ্ডিতের কক্ষ ত্যাগের ভঙ্গি দেখে সামুরাতির হাসি পায়। সে পণ্ডিতের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামুরাতির কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজের কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে সরস্বতী মূর্তির সামনে হাতজোড় করে প্রণাম জানায়। সরস্বতী মূর্তি হাসছিলো। সরস্বতী মূর্তির আদলটা হাস্যোজ্জ্বল। পণ্ডিত জীবনে এই প্রথম সরস্বতী মূর্তির হাস্যোজ্জ্বল চেহারার দিকে গভীরভাবে তাকালো। তার মনে এক অস্থিরতা তোলপাড় করছে, যা সে বুঝে উঠতে পারছে না। জীবনের যতো দুঃখ-কষ্ট সবই ভজন-গুঞ্জনের ভাষায় পণ্ডিত এ সরস্বতী মূর্তির কাছে পেশ করতো। কিন্তু আজ তার কি যে হলো তা কিছুতেই ব্যক্ত করতে পারছে না।
হাস্যোজ্জ্বল সরস্বতী মূর্তির সামনে হাতজোড় করে ভজন গাইতে গাইতে মূর্তির অম্লান হাসির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললো পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ। সরস্বতী মূর্তির সামনে প্রার্থনা করে তার মনের জ্বালা দূর করার জন্য বসেছিলো পণ্ডিত কিন্তু আজ দীর্ঘক্ষণ ভজন-বন্দনা করেও মনের মধ্যে স্বস্তি পাচ্ছিলো না। মূর্তির হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তার কাছে অপূর্ব মনে হচ্ছিলো। মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক পর্যায়ে সরস্বতির মূর্তিটাই সামুরাতির অবয়ব ধারণ করলো। মূর্তির হাসিতে বিকশিত হলো সামুরাতির অকৃত্রিম অবয়ব। মনের অজান্তেই তার কণ্ঠে গীত হতে লাগলো ভজন সংগীত।
***
১০০৮ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ৩৯৯ হিজরী সনের সেপ্টেম্বর মাস। পাবনের মতো হাজার হাজার হিন্দু সৈন্য পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের গতি তীব্র করা সম্ভব হচ্ছিলো না। কারণ, এ বাহিনীতে ছিলো কয়েকটি হিন্দু রাজ্যের সৈন্য। কঞ্জরের সেনাবাহিনী খিদররা এলাকায় শিবির স্থাপন করে। লাহোর থেকে যে বাহিনী যাত্রা শুরু করে, তন্মধ্যে রাজা আনন্দ পালের বাহিনী ছাড়াও উজান, গোয়ালিয়র, কনৌজের সৈন্যও ছিলো। এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে আরো নতুন সেনাদল এদের সাথে এসে শামিল হচ্ছিলো। নতুন বাহিনীকে স্বাগত জানানোর জন্য সম্মিলিত বাহিনী যাত্রাবিরতি করতো। সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডে ছিলো রাজা আনন্দ পালের ছেলে ব্রাক্ষ্যপালের উপর ন্যস্ত। সে সৈন্যদের জড়ো করে তারপর একসাথে অগ্রসর হতে চাচ্ছিলো।
