সহযোগী দুই পণ্ডিত যখন ওঠে চলে গেলো, তখন চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেলো রাধাকৃষ্ণ।
* * *
এদিকে সামুরাতির বিস্ময়ের অবধি রইলো না। টানা তিন দিন তিন রাত চলে গেলো কিন্তু একবারও বড় পণ্ডিত তার কক্ষে এলো না। সেই দুই তরুণী তার জন্য খাবার নিয়ে আসে আর তার সব প্রয়োজন পূরণ করে। সামুরাতি তাদের অনেকবার বলেছে, তারা যেনো পণ্ডিতজী মহারাজকে একবারের জন্য হলেও তার কাছে পাঠায়। কিন্তু এরপরও পণ্ডিত আসেনি। নিজের প্রাণ সংহারের জন্য সামুরাতির কোনো দুঃখ ছিলো না, কিন্তু তার মনটা ভারী হয়ে উঠলো এ জন্য যে হিন্দুরা তাকে নর্তকীতে পরিণত করেছে, তার ধর্মীয় চেতনা বিনষ্ট করে। দিয়েছে, তার সম্ভ্রম লুটেছে, শেষ পর্যন্ত হিন্দুদের বিজয়ের জন্য দেবীর পদতলে তার প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে।
সামুরাতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো, মাটি-পাথরের তৈরি মূর্তিগুলোর কোনো ক্ষমতা নেই, ওরা কিছুতেই মাবুদ হতে পারে না। জয়-পরাজয়ে মূর্তিগুলোর কোনো প্রভাব নেই। যিনি সত্য ও প্রকৃত মাবুদ, তার বিধান মতে নরবলী দান ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা সম্পূর্ণ অন্যায়, গুনাহের কাজ। নরবলী নিতান্তই মিথ্যা ধর্মের অপরীতি।
সামুরাতির মনে পড়লো, কয়েক বছর আগে রাজা জয়পালের বিজয়ের জন্য লাহোরে এক তরুণীকে বলী দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু সেই যুদ্ধে রাজা এমন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলো যে, রাজধানীতে ফিরে এসে সে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়।
মৃত্যুকে সামুরাতি ভয় করছিলো না কিন্তু পৌত্তলিকদের মূর্তির জন্য মোটেও মরতে চাচ্ছিলো না। আরমুগামী সামুরাতির আত্ম-পরিচয়কে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু মন্দিরের বন্দী দশা থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো পথ তার দৃষ্টিতে পড়ছিলো না। সামুরাতি বিচলিত হচ্ছিলো এই ভেবে যে, যে কোনো সময় তাকে নিয়ে মূর্তির পদমূলে বলীদান করবে। সামুরাতি বহুবার শুনেছে মন্দিরের পণ্ডিতদের কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে না। কিন্তু তার দেখাশোনাকারী দুই তরুণী বলেছে, পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের মধ্যে কোনো চারিত্রিক ক্রটি নেই, সে প্রকৃত অর্থেই একজন সাধক পুরুষ, ঋষি। অনেকের মুখে সে আগেও শুনেছে, পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ শুধু ঋষিই নয়, সে একজন ব্রাহ্মচারী।
সামুরাতির মনে পড়লো প্রথম যে রাতে তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো, তখন তার কাছে মনে হয়েছিলো পণ্ডিত নিজে ভোগ করার জন্য তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। সে যখন এ ধরনের ইঙ্গিত করে তখন পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ তাকে বলেছিলো, “তোমার দেহ সৌন্দর্য আমার ভালো গেলেছে বটে কিন্তু যা ভেবেছো তা ভুল। আমার জীবন নারীভোগ থেকে পবিত্র। নারীসঙ্গ নেয়া দূরে থাক, নারীকে কাছে থেকে দেখাও আমি পছন্দ করি না।”
সামুরাতির মনে পড়লো, পণ্ডিত যখন তার সাথে কথা বলছিলো, তখন পণ্ডিতের চেহারার মধ্যে একটা উদাস ভাব সে দেখতে পেয়েছে। পুরুষের মনের কথা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারে সামুরাতি। তাছাড়া নিজের রূপ-সৌন্দর্য ও ভাবভঙ্গীর জাদুময়তা সম্পর্কেও পূর্ণ সচেতন। সামুরাতির মনের মধ্যে নতুন একটা চিন্তা উঁকি দিলো। সেই সাথে পালানোর একটা পথও বের করার কথা ভাবতে লাগলো। সে মনে মনে তার প্রকট নারীত্বের জাদুময়তাকে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফন্দি আঁটলো। এটাই ছিলো সামুরাতির একমাত্র পুঁজি, যা দিয়ে কঠিন লোহাকেও সে মোমের মতো গলিয়ে দিতে সক্ষম।
নগরকোট মন্দিরে আসার চতুর্থ রাতের প্রথম প্রহর। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ সামুরাতির কক্ষে এলো। সামুরাতির কক্ষে দুটি প্রদীপ জ্বলছে আর সামুরাতি সারা কক্ষ জুড়ে পায়চারি করছে। পণ্ডিত তাকে দেখে স্থবির হয়ে যায়। সে সামুরাতিকে নৃত্যের পোশাকে প্রথম দেখেছিলো, সেই পোশাক ছিলো কৃত্রিম। তখন তার কাধ, গলা, বুক ও পিঠের ঊর্ধ্বাংশ ছিলো উন্মুক্ত। তার চেহারায় ছিলো কৃত্রিম প্রলেপ আর চুল ছিলো নাচিয়ের টংয়ে সাজানো, চোখে ছিলো কাজলমাখা। সেই পোশাকে ছিলো উগ্রতা কিন্তু এখনকার পোশাক সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন সামুরাতি একান্তই অকৃত্রিম। সাজ-পোশাক ও চেহারায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। অকৃত্রিম প্রাকৃতিক অবয়বে সামুরাতিকে এখন দেখতে পেলো পণ্ডিত। তার চেহারা ও কনুই উন্মুক্ত। এলোমেলো তার চুল আর চোখে নেই বাড়তি কাজল। অবিকল অকৃত্রিম অবয়বে সামুরাতিকে আরো বেশি মোহনীয় মনে হলো। পণ্ডিতের দৃষ্টিতে মনে হলো সামুরাতি মর্ত্যের নারী নয়, স্বর্গের অপ্সরা।
“আপনি কি আমাকে ভুলে গিয়েছিলেন মহারাজ” পণ্ডিতের কাছ ঘেঁষে বললো সামুরাতি। “লোকে বলে জীবজন্তুকে জবাই করার আগে পানি পান করাতে হয়, আপনি কি আমাকে পান করাবেন না। আমার আত্মার তৃষ্ণা মিটাবেন না? আমাকে জবাই করার আগে যদি আমার মনের তৃষ্ণা না মিটান, তাহলে এই মন্দিরে আমার আত্মা ঘুরে বেড়াবে। আমার আত্মা সর্বক্ষণ আপনাকে অস্থির করে রাখবে।”
পণ্ডিতের চোখে চোখ রেখে কথা বলছিলো সামুরাতি। তার চোখে-মুখে-চেহারায় ছিলো সেই জাদুকরী ভাষা যা সে কারো মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতো। পণ্ডিত অনুভব করলো, তার শরীরে একটা কামোদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। সামুরাতিকে নৃত্যের পোশাকে দেখে পণ্ডিতের মনে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হতো কিন্তু অকৃত্রিম পোশাকে মাথায় তিলক পরিহিতা সামুরাতির অঙ্গভঙ্গিতে নর্তকীর নির্লজ্জতা নেই। মেয়েটিকে এখন শান্ত সৌম্য কান্তিময় পূতঃপবিত্র মনে হচ্ছিলো পণ্ডিতের কাছে। পণ্ডিত সামুরাতির কথায় উদাস মোহন্দ্র হয়ে যায়।
