সামুরাতির মধ্যে একটা দৃঢ় সংকল্প জন্ম নিলো, কিছুতেই হিন্দুদের মূর্তির জন্য সে নিজেকে বলী হতে দেবে না। সে বন্দীদশা থেকে পালানোর কথা ভাবতে লাগলো। এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি সে কখনো হয়নি। সে কোনো সৈনিক ছিলো না, ছিলো না কোনো নারীযোদ্ধা। এক অর্থে সামুরাতি ছিলো শাহজাদী। কারণ, রাজ-রাজন্যবর্গের হৃদয়রাজ্যে বিরাজ করতো সামুরাতি। বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, ক্ষমতাবান পুরুষও তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার আবেদন করতো। ফলে ফেরার হওয়ার বিষয়টি তার জন্য ছিলো একটা সুকঠিন কাজ। তাছাড়া এই দুর্গসম মন্দির থেকে পালানোর বিষয়টি সহজ ছিলো না। কিন্তু এরপরও মনে মনে সে পালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়সংকল্প করলো।
বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে এমন সময় সামুরাতির কক্ষে প্রবেশ করলো দুই তরুণী। এদের একজনের হাতে কাপড় আর অপরজনের হাতে খাবার। তরুণী দু’জন যুবতী বটে কিন্তু সুন্দরী নয়। খাবার অবসরে সামুরাতি তরুণীদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলো, আমরা মন্দিরের সদর দরজা থেকে কতটুকু দূরে তরুণীদ্বয় তার কথার জবাব না দিয়ে বললো, আমাদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে, আপনার সাথে যেনো কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা না বলি। সামুরাতির কথার জবাব এড়িয়ে তরুণীদ্বয় তার পরিচয় জানতে চাইলো। আপনার পরিচয়
“আমি নগরকোটের নর্তকী। বড় পণ্ডিতজী মশাই এ মন্দিরে নাচ-গান করার জন্য আমাকে এনেছেন।”
“মহারাজ আপনার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।” বললো এক তরুণী।
“কোন নারীর প্রতি এতটা আগ্রহী হতে মহারাজকে আমরা কখনো দেখিনি।” বললো অপর তরুণী। তিনি তো এর আগে কোন নারীর সাথে কথাই বলতেন না। কিন্তু আপনার ব্যাপারে তিনি এভাবে কথা বলছেন, মনে হয়েছে আপনি তার মেয়ে কিংবা বোন।”
“এটা মহারাজার অনুগ্রহ।” বললো সামুরাতি। তিনি আমাকে সারা মন্দির দেখাবেন। এমনিতেই তোমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মন্দিরের সদর গেট এখান থেকে কোন্ দিকে।”
“আপনি তো সদর দরজা দিয়েই মন্দিরে এসেছিলেন।”
তরুণীরা সামুরাতিকে সদর দরজার কথা বললেও সে কিছুই আন্দাজ করতে পারলো না। তবে এটা বুঝতে পারলো, কোননা জানাশোনা লোকের পথ দেখানো ছাড়া তার পক্ষে সদর গেট পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়। সে তরুণীদের কাছে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলো। তরুণীদ্বয় কিছু কিছুর জবাব দিলো, কোনো কোনো কথার জবাব এড়িয়ে গেলো। পণ্ডিত সম্পর্কে তরুণীরা তাকে জানায়, নারীর নাম নিতেও সে অপছন্দ করে।
এই তরুণীরা জানতো না এই নর্তকীকে বলীদানের জন্য আনা হয়েছে। তারা সামুরাতিকে গোসল করালো এবং তাদের নিয়ে আসা কাপড় পরিয়ে দিলো। কাপড়টি ছিলো শাড়ি। তরুণীদ্বয় সামুরাতির মাথায় তিলক পরিয়ে দিয়ে চলে যায়।
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের একান্ত কক্ষে আরো দু’পণ্ডিত উপবিষ্ট। তারা জানতো, সামুরাতিকে বলীদানের জন্য আনা হয়েছে। সামুরাতিকে বলীদানের জন্য প্রস্তুত করা ছিলো তাদের কাজ। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তাদের কাজ শুরু করার। বলে রাখা ভালো, নগরকোট অঞ্চলে তখন চলছিলো ভয়ানক অভাব-অনটন। কারণ, দীর্ঘদিন থেকে এ অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছিলো না। অথচ পাহাড়ী এলাকা হওয়ার কারণে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো। অনাবৃষ্টির কারণে খাদ্যাভাবে মানুষ ও গৃহপালিত পশু মরতে শুরু করে। অতঃপর পতি রাধাকৃষ্ণের নির্দেশে এক কিশোরীকে বলীদান করা হয়। সেই তরুণীকেও এ কক্ষে রেখে বলীদানের জন্য দু’পণ্ডিতকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিলো।
আগের মেয়েটি ছিলো অল্পবয়সী বালিকা। কিন্তু এ বালিকা নয়, যুবতী। সে রাজার একান্ত নর্তকী ছিলো। আগের তরুণী ছিলো পবিত্র। কিন্তু সামুরাতিকে আগে পবিত্র করতে হবে- সহকর্মী দু’পণ্ডিতকে রাধাকৃষ্ণ বলেছিলো। একেই বলী দেয়া হবে কিন্তু তৈরি করতে বেশ সময় লাগবে। এ হচ্ছে মুসলমান। একে পূজা-অর্চনার জন্য আগে মানসিকভাবে তৈরি করতে হবে। এরপর বলী দেয়ার ব্যাপারে ভাবতে হবে।
“আপনি জানেন মহারাজ! রাজা আনন্দ পালের নেতৃত্বে আমাদের সম্মিলিত সেনাবাহিনী অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে। বলীদান তো যুদ্ধ শুরুর আগেই করা উচিত।” বললো এক পণ্ডিত।
“রণাঙ্গনে পৌঁছতে সেনাবাহিনীর অনেক দিন লাগবে।” বললো বড় পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ। “যে পরিমাণ সেনাবাহিনী অভিযানে গেছে, তারা মাহমূদ গজনবীর সেনাদের কচুকাটা করে গজনী পর্যন্ত চলে যাবে। আর যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছতে সেনাদের দু’তিন মাস সময় লেগে যাবে। এর মধ্যে আমাদের বলীদান কর্মও সমাধা হয়ে যাবে। আমরা এ সময়ের মধ্যে এ নর্তকীকে বলীদানের জন্য প্রস্তুত করে ফেলবো। আশা করি নিজের পক্ষ থেকেই নর্তকী দেবীর চরণে তাকে বলীদানের জন্য অনুরোধ করতে থাকবে।”
রাধাকৃষ্ণের সহকর্মী দুই পণ্ডিত বলীদানে বিলম্বের ব্যাপারে সম্মত হচ্ছিলো না, কিন্তু প্রধান পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ মনে মনে বলীদান মূলতবী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। সহযোগী দু’পণ্ডিতের বারংবার অসম্মতিতে বড় পণ্ডিতের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হলো। সে নির্দেশের স্বরে বললো, যে যাই বলুক, এই নর্তকী বলীদানে সে কারো কথাই শুনবে না। কারণ, নর্তকী বলীদানের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তার একার। ওকে নির্বাচনও করেছে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ নিজে। দেব-দেবীর ইঙ্গিতে যেহেতু সে এই নর্তকীকে বলীদানের জন্য বাছাই করেছে, তাই সে-ই ভালো জানে কখন কিভাবে ওকে বলীদান করতে হবে।
