কথাগুলোতে হয়তো সামুরাতির জাদুকরী কৌশল ছিলো নয়তো তা ছিলো আত্মশক্তির প্রভাব। সামুরাতির বলার ভঙ্গিতে এতোটাই আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, তার কথা শুনে পণ্ডিতের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যায়। পণ্ডিতের মন-মানসিকতায় প্রভাব বিস্তার করে সামুরাতি। পণ্ডিতের দেমাগে এতোদিন পুষে রাখা পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞা আর স্বর্গ-নরকের দর্শন এলোমেলো হয়ে গেলো।
ভোলা কাঁধ। বিক্ষিপ্ত কেশরাজি। পণ্ডিত সাধনার এ দীর্ঘ জীবনে এই প্রথম অনুভব করলো নারীকে যন্ত্রণা বলা সহজ কিন্তু নারীর ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করা ততোটা সহজ নয়। সামুরাতিকে এ অবস্থায় দেখে পণ্ডিতের হৃদয়রাজ্যে তোলপাড় শুরু হলো। মনের মধ্যে শুরু হলো যুদ্ধ।
“আরে আপনি একেবারে চুপ হয়ে আছেন যে?” স্মিত হেসে বললো সামুরাতি। “আপনি মহারাজা আনন্দ পালের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে এনে একাকী ফেলে চলে গেছেন। আচ্ছা, রাতে আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি না আমাকে পবিত্র করতে চান? পবিত্র করতেই আমাকে নিয়ে এসেছেন। আমাকে পবিত্র কবে করবেন?”
হঠাৎ হতচকিয়ে উঠলো পবিত। তার মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে পড়লো, “কৃষ্ণদেবীর চরণে তোমাকে বলী দেবো।”
কথাটা এমনভাবে বললো পণ্ডিত যেনো এমন সৌভাগ্য সবার কপালে জোটে না।
পণ্ডিতের কথায় সামুরাতির মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটলো না। বলীদানের কথা শুনে বিস্মিতও হলো না। ঠোঁটের স্মিত হাসিও ম্লান হলো না।
কিন্তু মুখ ফসকে কথাটা বের হওয়ায় পণ্ডিত নিজেই বিস্মিত হলো, এ মুহূর্তে কথাটা বলা তার উচিত হয়নি। যাকে বলীদান করা হয়, তাকে কখনো বলীদানের কথা জানানো হয় না। বরং নেশা জাতীয় কিছু খাইয়ে ও কৌশল প্রয়োগ করে তার দেমাগে বিকৃতি সাধন করা হয়। তার চিন্তা-চেতনায় পণ্ডিতের মনোবাসনা আত্মপ্রবিষ্ট করা হয়। কিন্তু পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণকে সামুরাতির প্রভাব এতোটাই আবিষ্ট করে ফেলেছিলো যে পণ্ডিত নিজের নিয়ন্ত্রণ বিবেকের কজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।
“আপনি আমার দেহকে বলী দিতে চান। কিন্তু এই শরীর তো আমার শরীর নয়। এটা যদি আমার দেহ মেনে নিই, তাহলে তা তো অনেক আগেই বলী হয়ে গেছে। দেখুন, আত্মাটা একান্তই আমার। আপনি এটিকে বলীদান করুন। অবশ্য আমার আত্মা আপনার কজায় যাবে না। আপনি কি কখনো কারো আত্মা কজা করেছেন অথবা আপনার আত্মার উপর কি অপর কারো কজা হয়েছিলো?”
এসব তাত্ত্বিক কথায় বোকার মতো সামুরাতির দিকে তাকিয়ে রইলো পণ্ডিত।
“আপনি সত্যিকার প্রেম-ভালোবাসার সাথে পরিচিত নন। কারণ, আমি আপনাদের সম্পর্কে মন্দিরগুলোর ভেতরে কি ঘটে তা জানি। এখানে সেইসব জিনিসকে পছন্দ করা হয় যেগুলো দৃশ্যত সুন্দর আর যেগুলোকে স্পর্শ করা যায়। এ জন্যই তো আপনারা সেই প্রভুকে বিশ্বাস করেন না, যে প্রভুকে দেখা যায় না। দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রভু আপনারা নিজের হাতে তৈরি করে নেন। আপনারা দেহকে বলী দিয়ে মনে করেন এসব মূর্তিকে খুশি করেছেন। এটাও বিশ্বাস করেন, এসব পাথরের মূর্তি আপনাদের সব আকভক্ষা পূর্ণ করে দেবে।”
“তুমি মুসলমান বলেই এ ধরনের কথা বলছে।”
“না, আমি কিছুই না। আমার কোনো ধর্ম নেই। আমি একটা তৃষ্ণার্ত আত্মা। আপনার আত্মাও তৃষ্ণার্ত। আমি পুরুষের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনের অবস্থা বলে দিতে পারি।” সামুরাতি একটি হাত এগিয়ে বললো, “আপনার হাত আমার হাতে রাখুন। দূরে বসে আছেন কেন? আমার কাছে আসুন।”
মূর্তির মতো বসে রইলো পণ্ডিত। সামুরাতি লাফিয়ে উঠে তার গা ঘেঁষে বসে। সামুরাতি দু’হাতে পণ্ডিতের চেহারা তালুবদ্ধ করে পণ্ডিতের চোখে চোখ রাখে। কেঁপে উঠলো পণ্ডিতের শরীর। সামুরাতির হাত তার চেহারা থেকে সরিয়ে তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যায়।
কি যেনো বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু পণ্ডিতের কথা জড়িয়ে যায়। জড়ানো কণ্ঠে পণ্ডিত বললো, তোমার জন্য কাপড় পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি স্নান করে নাও। ইতিমধ্যে তোমার খাবারও পৌঁছে যাবে। এ কথা বলেই পণ্ডিত দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
পণ্ডিতের মনোভাব দেখে প্রচণ্ড হাসি পেলো সামুরাতির। শোয়াইব আরমুগানীর কথা তার মনে পড়লো। সে আরমুগনীকে বলেছিলো, তার উপস্থিতিতে আনন্দ পালকে কাঞ্জরের রাজা বলেছিলো, আমরা সুন্দরী মুসলিম তরুণীদেরকে ধরে এনে বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত করি এবং তাদেরকে নৃত্যসংগীত ও বেহায়াপনায় উৎসাহিত করি। মুসলমানদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও তাদের বংশধারা বিনষ্টকরণে এর বিকল্প নেই। এ তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এমন এক সময় আসবে যখন যেসব মুসলমান হিন্দু প্রধান এলাকায় বসবাস করবে, সম বিক্রি ও নাচ-গান ছাড়া এদের জীবন-জীবিকার উপায় থাকবে না।
সামুরাতির মনে পড়লো, আরমুগানী তাকে বলেছিলো, মুসলমান তরুণীদের চরিত্রহীনতার শিকার সে নিজে। সে আরো বলেছিলো, গজনী থেকে এতো দূরে এসে মুসলমান যোদ্ধারা তোমাদের মতো মুসলিম তরুণীদের সম্ভ্রম বিক্রির কারণে শাহাদতবরণ করছে, জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। অথচ তারা তোমাদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ করছে। আরমুগানী তাকে আরো বলেছিলো, সামুরাতি কাউকে বিয়ে করে বন্ধু হয়ে যাও, নিজের আত্মাকে শান্তি দাও, নিজের আত্মপরিচয় উপলব্ধি করো।
আরমুগানীর কথায় সামুরাতি আত্ম-পরিচয় ফিরে পেয়েছিলো। সামুরাতির হৃদয়পটে যখন আরমুগনীর চেহারা ভেসে উঠলো, তখন তার ভেতর একটা ঝড় বয়ে গেলো। আরমুগানীর প্রতিটি কথা তার কানে ধ্বনিত হতে লাগলো। তার যখন মনে পড়লো, আরগানী হয়তো যারকার সাক্ষাৎ পেয়েছে এবং তার সাথে বসবাস করছে। সে বুকের ভেতর একটা কষ্ট অনুভব করলো । আরমুগানীই ছিলো সামুরাতির জীবনের প্রথম পুরুষ যে তার আশ্রয় ও এক প্রকার বন্দীত্বে থেকেও তার মনকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো।
