হ্যাঁ, তোমাকে আমি গঙ্গা জলে বিধৌত নির্ভেজাল প্রেম দেবো। স্বগতোক্তি করে রাধাকৃষ্ণ। আমি এ নর্তকীকে গঙ্গা জলে ধৌত করে অকৃত্রিম প্রেম দেবো। এরপর ওকে কৃষ্ণ দেবীর চরণে বলী দিয়ে বলতে পারবো যে, আমি এমন এক নারীকে বলী দিয়েছি যাকে আমি ভালোবাসি। অবশ্যই এই বলীদান দেবীর কাছে কবুল হবে। গজনী, বলখ, বোখারা, সমরকন্দ মহাভাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। মন্দিরের শাখা ধ্বনি মাহমূদের প্রতিটি মসজিদে ধ্বনিত হবে। হিন্দু ধর্মের মহাবিজয় আর ইসলাম ধর্মের পতন ঘটবে।
গঙ্গা স্নান থেকে ফিরে এসে মন্দিরের যেখানে হিন্দু নারী-পুরুষ সকালের পূজা দিচ্ছিলো, মণ্ডিত সেখানে গেলো। সে ঘটি থেকে গঙ্গার পানি মূর্তির চরণে ছিটিয়ে দিয়ে হাত জোড় করে মূর্তিকে প্রণাম করলো।
অন্যদিনের চেয়ে সেদিন সকালে সময় বেশি নিয়ে পূজা-অর্চনা করতে লাগলো। সে যখন দেব-দেবীর সন্তুষ্টি বিধানে আত্মতুষ্টির মোহময়তা কাটিয়ে স্বাভাবিক হলো, তখন সেখানে আর কেউ নেই। নগরের লোকজন পূজা-অর্চনা শেষ করে সবাই যে যার মতো চলে গেছে।
পণ্ডিতের মনে পড়লো, আরে, এই নর্তকীকেও গঙ্গা জলে স্নান করানো উচিত ছিলো। কিন্তু ততোক্ষণে সূর্য উঠে চতুর্দিকে সকালের কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে। সে কক্ষে এসে দেখলো, সামুরাতি এখনো গভীর ঘুমে অচেতন। সে সামুরাতির বিছানা থেকে দু’তিন কদম দূরে দাঁড়ালো। যেনো কোনো অদৃশ্য হাত তাকে ওখানেই থামিয়ে দিয়েছে।
সামুরাতি নিরুদ্বেগে ঘুমাচ্ছিলো। তার ঠোঁটে যেনো তখনও নিষ্পাপ শিশুর হাসি মেখেছিলো। দেখে মনে হচ্ছে, সে হয়তো রঙিন কোন স্বপ্ন দেখছে। বেলা অনেক উপরে ওঠে গেলেও সে নিশ্চিন্তে বেঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। পণ্ডিত ভাবলো, পাপ তো মানুষকে স্বস্তি দেয় না! এই নর্তকী তো পূজা পাঠের ঘোরবিরোধী। ওর আত্মা কি পবিত্র? এটা কি ওর আত্মিক প্রশান্তি যে বলীদানের কথা শুনেও নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে?
ঘুমন্ত সামুরাতিকে দেখতে দেখতে পণ্ডিতের ভাবান্তর ঘটলো। ঘুমন্ত নর্তকীর চেহারায় সে কোন পাপ দেখছে না। ইত্যবসরে সামুরাতির ঘুম ভেঙ্গে গেলে পণ্ডিতের মনে হলো এ যেনো সদ্যভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ কোনো শিশু, যে নিশ্চিন্তে মায়ের কোলে শুয়ে আছে। পণ্ডিত অনুভব করলো, নর্তকী আর তার মধ্যে যেনো একই রক্ত প্রবাহিত। পণ্ডিত সামুরাতির দিকে তাকিয়ে অতীতে হারিয়ে যায়। তার মনে পড়ে শৈশবের কথা। যখন এই তরুণীর মতোই সে বেঘোরে ঘুমাতো। ছোটবেলার দেখা সেই মায়ের চেহারা তার চোখে ভেসে ওঠে। অতীতের ভাবনা কাটিয়ে বাস্তবতা অনুভব করার জোর চেষ্টা করলো পণ্ডিত কিন্তু ভাবালুতা তাকে আরো বেশি আবিষ্ট করে ফেললো। তার মনে হতে লাগলো, তার মায়ের চেহারা যেন অবিকল সামুরাতির চেহারার মতোই ছিলো অমলিন নিষ্কলুষ।
কন্যা-জায়া-জননী- পণ্ডিতের হৃদয়ে এ তিন মমতার কাঁটা বিদ্ধ হতে শুরু করলো। হঠাৎ তার মধ্যে দেখা দিলো বিশাল শূন্যতা। নিজেকে বিরান ভূমিতে ভগ্নস্তূপের মতো মনে হতে লাগলো। জীবনের দীর্ঘ সময় কন্যা-জায়া-জননীর শূন্যতা পূরণের জন্য সে দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করে পূরণ করতে চেয়েছে, কিন্তু আজ এই নর্তকী তার মধ্যে সেই শূন্যতাকেই প্রকট করে তুলেছে। মনে হচ্ছে তার এতোদিনের সাধনা নর্তকী গঙ্গাজলে ভাসিয়ে দিয়েছে। সে একটা পরিত্যক্ত উজার শ্মশান। নর্তকীর মধ্যে নারীর সকল রূপ-সৌন্দর্য, স্নেহ-মমতা জীবন্ত হয়ে উঠলে পণ্ডিতের হৃদয়ে শুরু হলো এক ধরনের হাহাকার। সামুরাতিকে স্পর্শ করার জন্য অধীর হয়ে উঠলো।
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ যখন সামুরাতির আরো কাছে আসে তখন সামুরাতি চোখ খুলে। সে পণ্ডিতকে দেখে আড়মোড়া দেয় এবং হাই তুলে। পণ্ডিত জীবনে কখনো কোন নারীকে এতো কাছে থেকে ঘুম থেকে ওঠে হাই তুলতে দেখেনি। সামুরাতির হাইতোলা দেখে পণ্ডিতের মধ্যে এক ধরনের ঝড় সৃষ্টি হয়। এমন এক ভাবের সৃষ্টি হয় যা কখনো সে অনুভব করেনি। এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতে লাগলো। দেখা দিলো আত্ম-বিমোহিতা।
“ওহ! কত বেলা হয়ে গেছে। গত রাতে আপনি আমাকে একাকী ফেলে কোথায় চলে গিয়েছিলেন?” সামুরাতি বললো।
“তুমি একাকী ভয় পাও?”
“ভয়? হেসে লুটিয়ে পড়লো সামুরাতি। ভয় তো একটা অনুভূতি। আমার অনুভূতি মরে গেছে। নারী পরপুরুষে ভয় পায় কিন্তু পরপুরুষের হাতের খেলার পুতুল নারীর কোনো ভয় থাকে না। যে পথিক একবার লুটেরা দ্বারা লুষ্ঠিত হয়, বাকি পথ সে নির্ভয়েই অতিক্রম করে। আমার এখন আর কোনো দস্যুর ভয় নেই।”
“তুমি যেভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলে তা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব যাদের আত্ম পবিত্র। কিন্তু একটা নর্তকী কিভাবে এতো প্রশান্তচিত্ত হতে পারে!”
“আমার শরীরে এখন শুধু রূহটাই আছে, যাকে আপনি আত্মা বলছেন। আমার শরীরটা পর হয়ে গেছে কিন্তু আত্মা আমার নিজের, এটা প্রকৃতপক্ষে শান্তই আছে।”
“কি! কিভাবে তা সম্ভব?”।
“ধর্মীয় উন্মাদনায় অন্ধ ব্যক্তিরা আত্মার এই প্রশান্তির কথা বুঝতে পারে না। তারা একটাই শোর তোলে, প্রার্থনা করো আত্মার প্রশান্তি পাবে। জাগতিক বোকা হৃদয়ে না থাকলে আত্মা প্রশান্ত থাকে। মানসিকতার মধ্যে যদি সুচিন্তা কাজ করে তাহলে আত্মা শান্তি পায়…। এসব কথার কথা পণ্ডিত মশাই। আমি মানুষের পাপের বোঝা নিজের মাথায় তুলে নিয়েছি, যার দ্বারা আমি আত্মার প্রশান্তি পাচ্ছি।”
