যারা তাকে জানালো, “সরকারীভাবে তোমাকে এখন আর খোঁজাখুজি করছে না। এ মুহূর্তে লাহোর অনেকটাই শান্ত। সেনাবাহিনী অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে, ধর-পাকড়ও থেমে গেছে।”
আরমুগানীর দাড়ি তখন বেশ বড় হয়ে গেছে। এমনিতেই সে রূপ বদল করার বিস্ময়কর ক্ষমতা রাখতো। তাছাড়া বহু ধরনের আওয়াজ সে করতে পারতো। যারকাকে অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়ে তার বন্ধুদের উদ্দেশে অন্যদিকে চলে গেলো আরমুগানী। তার মন-মানসিকতায় এখন সামুরাতির মুক্তিই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।
***
নগরকোটের পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের হৃদয়রাজ্যেও সামুরাতি প্রভাব সৃষ্টি করেছিলো। নারীর ব্যাপারে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ ছিলো পাথর। পণ্ডিত নারীদের খুবই ঘৃণা করতো। বলতো, নারী একটা জীবন্ত যন্ত্রণা, সকল অঘটনের শিকড় এই নারী। নারীর মধ্যে এমন জাদু রয়েছে যদি তা কোনো পুরুষকে পেয়ে বসে তাহলে সেই পুরুষের আর কোন কর্মশক্তি থাকে না। তখন মন্দ ছাড়া মঙ্গলের কিছু ভাবতেই পারে না নারী প্রভাবিত পুরুষ।
কিন্তু সামুরাতিকে বলী দেয়ার জন্য যখন পাহাড়ের উপর মন্দিরের গোপন কক্ষে নিয়ে গেলো এবং সামুরাতিকে বশীর কথা শোনালো, তখন সামুরাতি তার সাথে এমনসব আচরণ করছিলো, যেন পণ্ডিতের ভেতরকার কোনো এক শক্তি মোচড় দিয়ে ওঠে। সেই শক্তির উপস্থিতি এতোদিন পণ্ডিত অনুভব করেনি। অতঃপর ভোরবেলায় এসে সামুরাতিকে গঙ্গাতীরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে পণ্ডিত নিজের শয়নকক্ষে চলে যায়। নিজের ভেতর পণ্ডিত এতোটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলো যে, বিছানায় গা এলিয়ে দেয়া মাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়তে পারতো। সে কখনো মানসিক অস্থিরতায়ও ভোগেনি কিন্তু এ রাতে পণ্ডিতের কি যে হলো, ঘুমানোর চেষ্টা করেও সে ঘুমাতে পারছিলো না। সামুরাতির অট্টহাসি আর শির মতো গায়ের উপর লুটিয়ে পড়ার মতো আচরণ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। সামুরাতির রেশম কোমল চুলের স্পর্শ যেনো তার অনুভবে শিহরণ খেলে যাচ্ছে। নারীর স্পর্শ, নারী দেহের উষ্ণতা ও গন্ধের সাথে তার পরিচয় ছিলো না। কিন্তু আজ নারীদেহের আকর্ষণ থেকে সে নিজেকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারছিলো না।
সামুরাতির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ তার কানে নিরন্তর ধ্বনিত হচ্ছিলো- “আপনি যদি আমাকে সেই ভালোবাসা দেন, যে ভালোবাসার জন্য আমার হৃদয় বহুদিন থেকে তৃষ্ণার্ত, তাহলে মনের আনন্দে আমি এমন নৃত্য করবা যে, পাথরের মূর্তিগুলোও আমার সাথে নাচতে শুরু করবে। লোকজন দূর-দূরান্ত থেকে নগরকোটের নর্তকীর নাচ দেখতে আসবে আর ভগবানের পূজা বাদ দিয়ে লোকজন নগরকোটের নর্তকীর পূজা করতে শুরু করবে।”
পণ্ডিত এতোটাই মোহাবিষ্ট হয়ে সামুরাতির কথা ভাবছিলো, যেনো সে রঙিন স্বপ্নে মেতে আছে। আর এরই মধ্যে কেউ তার শরীরে সুঁই ফুটিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে। সে রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলো। এক লাফে বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালো। তার স্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো যেনো। সে মনে মনে স্বগতোক্তি করলো সামান্য একজন নর্তকী… মুসলমান… ম্লেচ্ছ পাপীষ্ঠা। জানা নেই কত পুরুষের সাথে মেলামেশার পাপ মাথায় নিয়ে বেড়াচ্ছে। ও করছে কৃষ্ণ ভগবানকে অপমান? কৃষ্ণ ভগবানের ক্রোধ সম্পর্কে জানে না হতভাগী। এ জন্যই দেব-দেবীকে পাথরের মূর্তি বলে।
নিজের হাতের তালুতেই প্রচণ্ড আঘাত করে পণ্ডিত। ক্ষোভে দাঁতে দাঁত পিষে স্বগতোক্তি করলো- ছিঃ ছিঃ স্নেচ্ছের বাচ্চা ম্লেচ্ছ, আমার শরীর অপবিত্র করে দিয়েছে। আমি মিথ্যা বলিনি, নারীর শরীর পুরুষকে জানোয়ার বানিয়ে দেয়। পণ্ডিত নিজের অজান্তেই বিড় বিড় করতে লাগলো। সে যা ভাবছিলো তা কণ্ঠ দিয়ে সশব্দে বেরিয়ে আসছিলো- “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওকে পবিত্র করতে হবে । হয়তো বহু দিন লাগবে, তবুও ওকে পবিত্র করে ওর রক্ত দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পা ধুইয়ে দিতে হবে।”
দীর্ঘক্ষণ পর পণ্ডিতের দেমাগ সামুরাতির প্রভাবমুক্ত হলো। মধ্যরাতের পর পণ্ডিত গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো। প্রতিদিনের অভ্যাস মতো ভোরেই পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তোরের আবছা অন্ধকারে উঁচু পাহাড়ী মন্দির থেকে নীচে নেমে ভজন গুনগুনিয়ে পণ্ডিত গঙ্গার একটি শাখা নদীর তীরে পৌঁছালো । নদীতে নেমে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে দু’হাত পানি ছিটিয়ে ভজন জপতে জপতে পানিতে বসে পড়লো। হিন্দুরা আজো বিশ্বাস করে, গঙ্গা নদীর পানিতে স্নান করলে সকল পাপ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ঠাণ্ডা পানিতে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর পণ্ডিত অনুভব করলো তার শরীরটা এখন জুড়িয়ে এসেছে। সারারাত সে শরীরে একটা জ্বালা অনুভব করেছে। সে অনুভব করলো নর্তকী সামুরাতি তার শরীরে যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো, সে আশুন চিরদিনের জন্য নিভিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছে।
ভজন ও গঙ্গা স্নান পণ্ডিতের মনে স্বস্তি এনে দিলো। এখন সে আগের পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের ভাবগাম্ভীর্য ফিরে পেলো। যে কারণে কোনো পূজারিণী নারীকেও পর্যন্ত কোনদিন তার শরীর স্পর্শ করতে দেয়নি রাধাকৃষ্ণ। রাতের অস্থিরতায় সামুরাতির প্রতি তার মনে যে ঘৃণা ও ক্ষাভ দানা বেঁধেছিলো, তাও তিরোহিত হয়ে গেলো। সে ভাবতে লাগলো, মাসুরাতির কোনো দোষ নেই, তাকে পাপ কাজে বাধ্য করা হয়েছে। তাই তো সে বলেছে, সে নির্ভেজাল প্রেমের কাঙালী । সে বলেছিলো, আমাকে কি গঙ্গা জলে বিধৌত অকৃত্রিম ভালোবাসা দিতে পারবে?
