তিন জনের মধ্যে নেমে এলো গভীর নীরবতা।
“সামুরাতি আমার যে উপকার করেছে, তা কোনো সাধারণ কাজ নয়। আমি তা ভুলে যেতে পারি না।” বললো আরমুগানী। “আমি অবশ্যই নগরকোট যাবো এবং সামুরাতি জীবিত না ইতিমধ্যেই তাকে বলী দেয়া হয়েছে- তা জানতে চেষ্টা করবো। যদি জীবিত থাকে, তবে আমি তাকে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করবো।”
“নগরকোট মন্দির সম্পর্কে তুমি জানো না।” বললো বৃদ্ধা। “সেটি সাধারণ কোনো মন্দির নয় যে, তুমি সেটিতে প্রবেশ করে সব কক্ষ ঘুরে দেখতে পারবে। আমি নগরকোট মন্দিরের ভেতরে গিয়েছি। নগরকোট মন্দির একটা গোলক ধাঁধা। সেখানে রয়েছে বিশাল পাতাল কক্ষ। পাতাল কক্ষগুলো এতোটাই বিশাল যে, কোনো হাতিও যদি-সেখানে হারিয়ে যায়, তাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। তাছাড়া মন্দির ঘিরে রয়েছে বিশাল সেনা দুর্গ। বহু মানুষ সেখানে পূজা পাঠ করতে যায় বটে, কিন্তু সামুরাতিকে পণ্ডিতেরা কোথায় রেখেছে তা জানা সহজ ব্যাপার নয়।”
শুয়াইব আরমুগানীর শরীরে তখন যৌবনের দৃপ্ত তারুণ্য ঝিলিক দিয়ে উঠে। সে জানতো, সামুরাতি একটি মুসলিম মেয়ে। একজন মুসলিম তরুণী হিন্দুদের যুদ্ধ জয়ের জন্য বলীর শিকার হবে, তা মোটেও বরদাশত করতে পারছিলো না আরমুগানী। আরমুগানীর চোখে তখন ভেসে উঠলো সেই দৃশ্য, যখন কুকুর তাকে মারাত্মকভাবে আহত করার পর সামুরাতি তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে নিজের হাতে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দিচ্ছিলো। সামুরাতির এক হাতও কামড়ে দিয়েছিলো কুকুর। অনবরত ঝরেপরা আরমুগানীর রক্তের সাথে সামুরাতির ক্ষতস্থান থেকেও যখন দু’ফোঁটা তাজা রক্ত বিছানায় পড়েছিলো, তখনই এই রক্ত দেখিয়ে সামুরাতিকে সে বলেছিলো, দেখো, তোমার আর আমার রক্তের মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই, যেনো একই রক্ত। সেদিন সামুরাতি তাকে বলেছিলো, আজ তুমি আমার রক্ত দেখিয়ে আমার মৃতপ্রায় বোধকে জাগিয়ে দিলে। এই রক্ত দেখে এখন আমি নিজের আত্মপরিচয় উপলদ্ধি করতে পারছি।
দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো আরমুগানী। সেই রাতের গোটা ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ভেসে উঠলো সামুরাতির হৃদয়ের আকুতি এবং মমতার পরশ। হঠাৎ সে বলে উঠলো, “পাথরের তৈরি মূর্তির কল্যাণে এক মুসলিম তরুণীর মৃত্যু হতে আমি কখনো দেবো না।” চকিতে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে আরমুগানী বললো, “তুমি দাবী করো, সামুরাতিকে নিজের মেয়ের মতোই মেহ করো। তোমার হৃদয়ে তার জন্য রয়েছে মায়ের মমতা। যদি তাই মনে করো তাহলে তুমি কি তা প্রমাণ করতে পারবে? তুমি কি আমার সাথে নগরকোট যেতে পারবে? কারণ, আমি নগরকোটের পথ চিনি না। তুমি আমাকে নগরকোট নিয়ে চলো আর ভেতরের পরিবেশটা একটু বুঝিয়ে দিও। আমার বিশ্বাস সামুরাতি এখনও জীবিত আছে।”
“পথেই আমরা গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার আশংকা নেই কি?” বৃদ্ধা বললো।
“না। অন্তত পথের গ্রেফতারী আমরা এড়িয়ে যেতে পারবো। কারণ, আমরা ছদ্মবেশে যাবো।” আরমুগানী যারকার উদ্দেশে বললো, “তুমি এখানেই থাকো যারকা। আমি বেঁচে থাকলে অবশ্যই দেখা হবে।”
“আমিও যাবো তোমাদের সাথে।” দৃঢ়তার সাথে বললো যারকা। “আমি আর একাকী থাকতে পারবো না। যেখানে তুমি যাবে আমিও তোমার সঙ্গে যাবো।”
পরিচারিকা আগেই জেনেছিলো আরমুগনী আর যারকা স্বামী-স্ত্রী। এ জন্য সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সামুরাতির মৃত্যু আশংকা আর আরমুগানীর প্রতি তার অবদানের বিষয়টি আরমুগনীকে এতোটাই আবেগাপ্লুত করে ফেলেছিলো যে, সে ভুলেই গিয়েছিলো তার একান্ত প্রেয়সী দীর্ঘদিন পর তার একান্তই পাশে রয়েছে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে তার একান্ত সান্নিধ্যের জন্য চলে এসেছে। আরমুগানীর ভাবান্তর অনুধাবন করে যারা তার কাঁধে হাত রেখে মৃদু ঝাঁকুনি দেয়। যারকার দিকে তাকায় আরমুগানী।
“মনে হয় তুমি এখন পর্যন্ত আমাকে ধোকাই ভাবছো।” শ্লেষমাখা কণ্ঠে বললো যারকা। “একজন নর্তকীকে তুমি আমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবছো এবং ওর জন্য পেরেশান হয়ে পড়েছে?”
“ওহ্ যারকা!” যারকার হাত ধরে বললো আরমুগানী। এভাবে বলো না। সামুরাতি আমাকে আশ্রয় না দিলে আজ রাজার বন্দীশালায় আমাকে জীবন্ত লাশে পরিণত হতে হতো। তুমি জানো না, তুমি যেমন মুসলমান, সামুরাতি একজন মুসলিম তরুণী। আমি তোমাকে মোটেও অবিশ্বাস করছি না। ভাবছি, তোমাকে এখানে রেখে যেতেও মন চাচ্ছে না, আবার সাথে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। এখানে রেখে গেলে মনে হয় না পুনর্বার ফিরে এসে আমার পক্ষে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করা সব হবে।”
“ছদ্মবেশে যেভাবে তুমি পরিচারিকাকে নিয়ে যাবে, সেভাবে আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে চলো। অতীতের কৃত গুনাহর কাফফারা করার সুযোগটুকু আমাকে দাও।”
“যারকা! একটা বিষয় তোমার খেয়াল রাখতে হবে যে, সামুরাতির পরিচারিকাকে তুমি যে আমার স্ত্রী একথা আমি বলেছি বটে কিন্তু আমি যে গজনী সুলতানের গোয়েন্দা এ কথা কিন্তু বলিনি। আমার আরো দুই সাথীকে সঙ্গে নিতে হবে। আজ রাতে আমি ওদের সাথে দেখা করবো। আমি ওদের বলে-কয়ে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য রাজি করাবো। তুমি এখন চলে যাও। সম্ভব হলে আগামীকাল সকালে একটু এদিকে এসো। তখন বলে দিতে পারবো, আমাদের যাত্রা কিভাবে হবে।”
