যারকা এ বাড়িতে সামুরাতির সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে আরমুগানী যখন তার সাথে লুকিয়ে কথা বলতে অনুরোধ জানায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধা পরিচারিকার মনে প্রশ্ন দেখা দেয়, লুকিয়ে থাকা এই যুবকের সাথে যারকার কি সম্পর্ক? কিভাবে তার পরিচয় যারকার সাথে? যারকার সাথে অতি গোপনে বান্ধবীকে এড়িয়ে কি কথা সে বললো?
বৃদ্ধার মনোভাব আন্দাজ করে আরমুগানীর মধ্যেও এ তাড়না সৃষ্টি হলো যে, সে নিজের প্রকৃত পরিচয় বৃদ্ধার কাছে ব্যক্ত করবে কিনা? ভেবে-চিন্তে সে সিদ্ধান্ত নিলো, হ্যাঁ, বৃদ্ধাকে বলেই দেবে তার পরিচয়।
আরমুগানী বৃদ্ধাকে ডেকে বললো, “যারা আমার বিবাহিতা স্ত্রী।”
“তাই যদি হবে তবে এমন রাখঢাক কেন?” জানতে চাইলে বৃদ্ধা।
“তুমি কি ওর সৌন্দর্য দেখেছ?” আরমুগানীর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সে বলল, “তুমি কি জানো যারকা কার মেয়ে?”
“যারকা এক ভয়ংকর সাপের সন্তান?” উত্তর দিলো বৃদ্ধা। “ওর বাবাকে আমি চিনি। সে দুর্নীতিবাজ, বেঈমান, আত্মমর্যাদাহীন, গাদ্দার, কুলাঙ্গার এক মুসলমান। সে তার নিজের কন্যার রূপ-সৌন্দর্যের বিনিময়ে রাজ দরবারে বিশেষ সম্মানের অধিকারী হয়েছে।”
“ওর মেয়ে গোপনে আমাকে বিয়ে করেছিলো। সে আমার ঘরে চলে এলে তার বাবার কানে এ সংবাদ চলে যায়। তুমি জানো, গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে লাহোরের সব মুসলমানদের ঘরে তল্লাশি করছে এবং নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। ব্যক্তিগত আক্রোশেও অনেকে নিরপরাধ মানুষকে ধরিয়ে দিচ্ছে। যারকার বাবা সামরিক বাহিনীর এক পদস্থ কর্তাব্যক্তির কাছে তার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে দেয়ার কথা বলে প্রশাসনকে পক্ষে নিয়ে এক রাতে কয়েকজন পুলিশ নিয়ে আমার ঘরে হানা দেয় এই বলে যে, আমি গজনী সুলতানের গোয়েন্দা। কিন্তু যারা আমাকে গ্রেফতারির কবল থেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। পুলিশ আমার ঘরে হানা দেয়ার আগেই যারকা কিভাবে যেনো জানতে পারে এবং আমাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে, তোমাকে গ্রেফতার করতে পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করেছে। পরিস্থিতির ভয়াবতা অনুমান করতে পেরে আমি ঘরের ছাদে উঠে দেয়াল টপকে দৌড়ে পালাতে গিয়ে তোমাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে এসে বাগানে লুকাই। পুলিশ আমার পিছু ধাওয়া করেও ধরতে পারেনি। কিন্তু তোমাদের কুকুর আমাকে পেয়ে বসে। তোমাদের বিবি সাহেবা আমার এ অবস্থা দেখে দয়াপরবশ হয়ে আমাকে আশ্রয় দেয়। আচ্ছা, আমাকে কি গোয়েন্দা মনে হয়?”
“না, তোমাকে গোয়েন্দা মনে হবে কেন?” বললো বৃদ্ধা পরিচারিকা। “রকার বাবা আক্রোশের কারণে এমনটা করেছে। আচ্ছা, তুমি এখন কি করতে চাও?”
“আমার পক্ষে এখন আর শাহোরে থাকা সম্ভব নয়। যারকার বাবা যদি আমার কথা জানতে পারে, তবে সে আমাকে ধরিয়ে দেবে, নয়তো হত্যা করবে। আমি যারকাকে নিয়ে পেশোয়ার চলে যেতে চাই।”
“সে কি তোমার সাথে যেতে প্রস্তুত?”
“হ্যাঁ, সে তো একপায়ে খাড়া। আমি এ ব্যাপারে তোমার সহযোগিতা চাই। আগামীকাল সন্ধ্যায় যারকা লুকিয়ে এখানে আবার আসবে। আমি গোপনে বাগানের একটি জায়গায় ওর সাথে দেখা করবো বলে কথা দিয়েছি। এখন তো আদ্যপান্ত তুমিও জানতে পারলে। এখন তুমি কি ওকে ঘরে নিয়ে আসা পছন্দ করবে? অবশ্য ওর পিছু পিছু যদি কেউ এখানে পৌঁছে যায়, তাহলে আমার ধরা পড়ার আশংকা আছে।”
“তুমি নির্দিধায় ওকে ঘরে নিয়ে আসতে পারো। আমি কুকুর ছেড়ে দেবো, তাহলে কারো পক্ষে এদিকে পা বাড়ানো সম্ভব হবে না। কেউ পিছু নিলেও তুমি পালানোর সুযোগ পাবে। যারকাকে আড়াল করার প্রয়োজন নেই। কারণ, আমি দৃঢ়তার সাথে যে কারো সাথে এ কথা বলতে পারবো যে, সে সামুরাতির সাথে দেখা করতে এসেছিলো।”
“তুমি কি এ বিষয়টি জানতে পেরেছে, মহারাজা ফিরে এসেছে কিন্তু সামুরাতি ফিরে এলো না কেন?”
“চেষ্টা করছি।” বললো বৃদ্ধা। “এমন তো হওয়ার কথা নয় যে, মহারাজা সামুরাতিকে উপঢৌকনস্বরূপ কাউকে দিয়ে আসবে। কারণ, যে কোনো মূল্যে সামুরাতিকে সে হাতের মুঠোয় রাখতে চাইবে।”
“আমি অবশ্য যারকাকে এ ব্যাপারে খবর নেয়ার জন্য বলে দিয়েছি। আশা করি, সে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহে সক্ষম হবে।”
***
যারকা কথা মতো সন্ধ্যায় সামুরাতির বাড়িতে এলো। সে ঠিকই সামুরাতির না ফেরা সম্পর্কে খবর সগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছে। আরমুগানী বাগানের বাইরে এ যে জায়গায় সে গকিয়ে ছিলো, সেই জায়গায় যারকার জন্য অপেক্ষা করছিলো। এ দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যারকা এলো। যারকা একাকীই এলো। সে যারকাকে # ঘরের ভেতরে নিয়ে এলে পরিচারিকা বাগানে কুকুর ছেড়ে দেয়।
যারা প্রথমেই জানালো, সামুরাতিকে নগরকোটের প্রধান পণ্ডিত বলী ৫ দেয়ার জন্য রেখে দিয়েছে। সে দ্বিতীয় সংবাদ দিলো, বিগত কয়েক মাস ধরে তিন-চারটি রাজ্যের যেসব সেনা রাজা আনন্দ পালের রাজধানী লাহোরে জমায়েত হচ্ছিলো, এরা সবাই পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই সম্মিলিত হিন্দু বাহিনীর বিজয়ের জন্য পণ্ডিত দেবীর পদমূলে নর বলী দেয়ার জন্য সামুরাতিকে আটকে রেখেছে। মনে হয় এর মধ্যে পণ্ডিত সামুরাতিকে বলী দেয়ার কাজ সমাপ্ত করেছে।” বললো যারকা।
“আমার বিশ্বাস, সামুরাতি এখনো বেঁচে আছে।” বললো বৃদ্ধা পরিচারিকা। “কারণ, যেসব নারীকে পণ্ডিতরা বলী দিতে চায়, এদেরকে কয়েক দিন নিজেদের কজায় রেখে মানসিকভাবে তৈরি করে। তাদেরকে গঙ্গাজলে ধৌত করে আর নানা তন্ত্রমন্ত্র পড়ে বশে আনে। এদেরকে নেশাদ্রব্য খাইয়ে এমন করে ফেলে যে, তরুণী নিজে থেকেই বলতে থাকে, আমাকে দেবীর চরণে বলী দিয়ে দাও।”
