যারকা আরমুগানীর জীবনে এক আয়েশী মরীচিকা হয়ে দেখা দিয়েছিলো। যারা যারকাকে মরীচিৎকার মতো ব্যবহার করেছিলো, তাদের এই প্রয়োগ ছিলো স্বার্থক। এই ধোকায় পড়ে আরমুগানী ওয়াদা ভঙ্গ করে তার আত্ম-পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছিলো। আরমুগানী নারী সৌন্দর্যের ফাঁদে পড়ে নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছিলো কিন্তু হয়তো সেটি কুরআন কারীমেরই বরকত যে, যে ফাঁদ পাতা হয়েছিলো আরমুগনীকে ফাঁসানোর জন্য, সেই ফাঁদে সে নিজেই আটকে গিয়েছিলো। আরমুগানীর ফাঁদও ছিলো এমন কার্যকর যে, চক্রান্তকারিণী যারকা নিজের মিশন ভুলে গিয়ে শিকারকে শুধু মুক্ত করেই দেয়নি, সেও শিকারের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। কারণ, জীবনে যত পুরুষের স্পর্শে সে গিয়েছিলো, কেউ তাকে আরমুগানীর মতো অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত করেনি। সবাই তার দেহ-সৌন্দর্য নিয়ে উল্লাস করেছে মাত্র। নারী মনের ভালোবাসার অভাবটুকু আরমুগানীর অপত্য ভালোবাসায় আরো তীব্র হয়ে ওঠে, বুকের মধ্যে না পাওয়ার হাহাকার আরো প্রচণ্ড হয়। আরমুগানীর অকৃত্রিম ভালোবাসার ঝর্নাধারায় অবগাহন করে নিজেকে সিক্ত করতে সবকিছু ভুলে যায় যারকা। যারকা নিজেকে ভাসিয়ে দেয় আরমুগনীর প্রেমের জোয়ারে। কিন্তু জোয়ারের পর ভাটার টানে তারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই যারকা সামুরাতির ঘরে আরমুগনীর দেখা পেয়ে যায়। কিন্তু বেশিক্ষণ আরমুগানীর সান্নিধ্যে কাটানোর সুযোগ ছিলো না যারকার। কারণ, তার বান্ধবীকে খুব বেশি সময় বৃদ্ধা পরিচারিকা অন্য ঘরে বসিয়ে রাখতে পারছিলো না।
“আগামীকাল রাতে এই বাড়ির বাগানে তোমার সাথে আমার দেখা হবে।” এই বলে কক্ষ থেকে চলে গেলো আরমুগানী ।
যারকা ও তার বান্ধবী চলে যায়। বৃদ্ধা পরিচারিকা আরমুগানীকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি লুকিয়ে যারকার সাথে কি কথা বলেছে? ওই মেয়েটি থেকে নিজেকে আড়ালে রাখলে কেন?”
এমন প্রশ্ন করা ছিলো স্বাভাবিক। বৃদ্ধা আরমুগানীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলো বটে কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় সে মোটেও জানতো না। সামুরাতি তাকে শুধু বলেছিলো, ওকে তুমি লোকচক্ষুর দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখবে। আর ওর ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করবে। বৃদ্ধা সামুরাতির কথা যথার্থভাবেই পালন করছিলো।
এই বৃদ্ধা ছিলো রাজমহলের শীর্ষ নর্তকীদের একজন। রূপে-গুণে-নাচে সমবয়স্কাদের মধ্যে সে ছিলো অনন্যা। কিন্তু বয়সের ভারে যখন তার সুঢৌল গণ্ডদ্বয়ে দেখা দিলে বলী রেখা, আর মাথার দু’চারটি চুলে সাদা বর্ণ ধারণ করলো, নাচের মুদ্রায় দেখা দিলো ছন্দপতন তখন তার প্রতি আকর্ষণে ভাটা পড়লো। সে রাজমহল থেকে বিতাড়িত হলো। তার নাচের মুদ্রায় যারা বিমোহিত হতো, তার শরীর নিয়ে খেলতো, যারা অহর্নিশ উন্মুখ থাকতো, তাদের সবাই তার দিকে আর ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করতো না। রাজমহল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তার রক্তের কণায় কণায় আত্মোপলব্ধি হলো যে, রাজমহলের মহারথীরা আমার মতো নারীদের শরীর ও সৌন্দর্যকেই শুধু ভোগ করতে চায়। এদের মধ্যে কোনো মানবিক দয়া নেই। এরপর সে একজনকে ভালোবাসে। স্বপ্ন দেখে তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার। কিন্তু বয়োজ্যষ্ঠ এক নর্তকীর ঘর বাঁধার স্বপ্ন পূরণ হলো না। রাজার আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে সেই পুরুষকে রাজা কারান্তরীণ করলো। কারণ, সে ছিলো মুসলমান। বস্তুত সেই লোক স্বজাতির সাথেও বেঈমানী করেছিলো, কিন্তু পরিণামে আজীবন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে ধুকে ধুকে মরা ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্তি ঘটলো না। বয়স্ক এই নর্তকীর এই ভালোবাসার কথাও নীরবে-নিভৃতে মৃত্যুবরণ করলো। কেউ তা জানতে পারলো না তার সেই স্বপ্নের পুরুষের কথা। কারণ, জানাজানি হয়ে গেলে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে তাকেও কারাবরণ করতে হতো।
এখনও সে শাব্দিক অর্থে বুড়ি নয়। স্বাস্থ্য সচেতন বলে এখনও তার শরীরের গাঁথুনী ও চেহারা ছবি ছিলো ভরাট ও টলটলে। সে যখন বুঝতে পারলো তার পক্ষে আর নাচা সম্ভব নয়, তার জায়গা দখল করে নিয়েছে সামুরাতি তখন সে সামুরাতির ঘরে এসে ঠাই নেয়। সামুরাতির সাথে এই বয়োজ্যেষ্ঠ নর্তকীর সম্পর্ক অন্য নর্তকীদের মতো ছিলো না। যেমনটি নর্তকীদের মধ্যে পারস্পরিক হয়ে থাকে। সামুরাতিকে সে খুব ভালোবাসতো। সামুরাতি নাচে-গানে ছিলো সকলের সেরা। জাদুকরী কণ্ঠ ও রূপ-সৌন্দর্যে সামুরাতি ছিলো অনন্যা। পরিচয়ের শুরু থেকেই সামুরাতির প্রতি মনের টান ছিলো এই প্রবীণার। এক পর্যায়ে রাজমহল থেকে বিতাড়িত হয়ে সে যখন সামুরাতির বাড়িতে ঠাই নিলো, তখন সামুরাতি তাকে সানন্দে জায়গা দিলো। সেও নিজেকে ঢেলে দিলো সামুরাতির সেবা-যত্নে। দিনে দিনে সামুরাতি তাকে মায়ের আসনে স্থান দিয়েছিলো আর বয়োজ্যেষ্ঠও তার হৃদয় নিংড়ানো স্নেহ-মমতা উৎসর্গ করে দিলো সামুরাতির কল্যাণে।
শুয়াইব আরমুগানী আহত হলে সামুরাতি তাকে ঘরে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করে যখন বললো, গোপন রত্নের মতো তুমি ওকে আগলে রাখবে এবং সেবা-যত্ন করবে। তখন সে জানতেও চায়নি, লোকটি এমন কি রত্ন আর কেনই বা তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখতে হবে। সে এমনিতেই বুঝে নিয়েছিলো, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে। বৃদ্ধা বুঝে নিয়েছিলো, নিশ্চয়ই এ সুদর্শন যুবককে বিশেষ লক্ষ্যে লুকিয়ে রাখতে চায় সামুরাতি। কারণ, এক সময় সেও একজনকে আপন করে নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু রাজার বাহিনী তার ভালোবাসার মানুষটিকে ধরে নিয়ে সারাজীবনের জন্য কয়েদখানায় বন্দী করে রেখেছে। ঘর বাঁধার স্বপ্নটা তার স্বপ্নই থেকে যায়। আজীবন বুকের মধ্যে সেই কষ্ট-যাতনা সে বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই সামুরাতির জীবনটাও এমন যন্ত্রণাদগ্ধ হোক, তা সে ভাবতেই পারে না। ফলে সামুরাতির এতোটুকু বলায়ই সে অমূল্য রত্নের মতোই আরমুগনীকে আগলে রাখতে চেষ্টা করে। সামুরাতি রাজা আনন্দ পালের নগরকোট মন্দিরে গিয়ে ফিরে না এলেও আরমুগনীকে সে যথারীতি লোকচক্ষুর আড়ালেই রেখেছে। আসলে এ কাজটি সে করেছে সামুরাতির ভালোবাসার টানে। নিজের অপূরণীয় প্রেমের সুপ্ত ঝর্না থেকে সিঞ্চিত মমতা দিয়ে সে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলে আরমুগনীকে। সামুরাতির দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সে কোনো দিন আরমুগনীকে এ কথাটিও জিজ্ঞেস করেনি, সে কে? কি তার পরিচয়? কোত্থেকে এসেছে যাবেই বা কোথায়?
