এ খবর শুনে আরমুগানী ভাবতে লাগলো, নগরকোট থেকে সামুরাতির ফিরে না আসার কারণ কি? সে ভাবলো, পণ্ডিত সামুরাতিকে দেখে এতোই মুগ্ধ হয়ে গেছে যে, সামুরাতিকে সে নিজের কজায় রেখে দিয়েছে। নগরকোটের বড় পণ্ডিতের কথা রদ করার দুঃসাহস হিন্দুস্তানের কোনো রাজা-মহারাজার নেই।
বৃদ্ধা পরিচারিকা হৃদয়ের সবটুকু মমতা দিয়ে শুয়াইব আরমুগানীর সেবা-শুশ্রূষা করছিলো। সে ছিলো আরমুগানীর প্রতি বিশ্বস্ত। সামুরাতির নির্দেশে অতি গোপনীয় রত্নের মতোই আরমুগনীকে সবার দৃষ্টি থেকে আড়ালে রেখেছিলো বৃদ্ধা। সেই সাথে প্রতিদিন আরমুগানীর ক্ষতস্থানের পট্টি বদলে ওষুধ দিয়ে দিচ্ছিলো। যার ফলে আরমুগনীর ক্ষতস্থান দ্রুত সেরে উঠছিলো।
ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে শুয়াইব আরমুগানী। সামুরাতির ঘরে আশ্রয় নিয়ে গ্রেফতারী এড়িয়ে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলো আরমুগানী। আত্মরক্ষার ব্যাপারটিই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আরমুগানীর জন্য। অপরদিকে যারকার কথা এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারছে না। এতোদিন গোয়েন্দা কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে বলে কোনো মেয়েকে বিয়ে করেনি আরমুগানী। কিন্তু যারকাকে বিয়ে করার পর আরমুগানীর জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে। সে প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হয়ে পড়ে। ফলে যদিও আরমুগানী জানতো যারকার সাথে তার বিয়েটা হয়েছে চক্রান্তমূলক কিন্তু সেটিকে সে এই বলে মেনে নিয়েছিলো যে, যারকা চক্রান্তের ক্রীড়নক হলেও মনে-প্রাণে তাকে ভালোবেসেছে। এর প্রমাণ হলো, সে ঝুঁকি নিয়ে তার প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন তার হৃদয়ের একমাত্র আকুতি, যারকাকে সে কোথায় পাবো।
সামুরাতির বৃদ্ধা পরিচারিকা আরমুগানীর এসব গোপন কথা জানতো না। তার পক্ষে বৃদ্ধাকে এ কথা বলাও সম্ভব ছিলো না, সে যারকা নামের এক তরুণীর সাহচর্য পেতে অধীর হয়ে আছে।
একদিন একটি ঘোড়াগাড়ী সামুরাতির বাড়ির সামনে এসে থামলো। সামুরাতি বাড়ি ফিরে এসেছে ভেবে বৃদ্ধা পরিচারিকা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ঘোড়াগাড়ী থেকে দুই তরুণী নামলো। তারা এসে সামুরাতির পরিচারিকার সাথে কথা বলতে শুরু করলো। আরমুগানী লুকিয়ে আগন্তুকদের দেখছিলো। দুই তরুণীকে দেখে সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। দুই তরুণীর একজন ছিলো যারকা। যারকা সামুরাতির সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য এসেছিলো।
বৃদ্ধা পরিচারিকা তাদেরকে সামুরাতির কক্ষে বসিয়ে গল্প করছিলো। এমতাবস্থায় আরমুগানীর পক্ষে বৃদ্ধাকে ডাকা সম্ভব ছিলো না। সাত-পাঁচ ভেবে সে একটি ফুলদানী মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো। ফুলদানী ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে পরিচারিকা দৌড়ে এ কক্ষের দিকে এলো এই ভেবে যে, হয়তো বিড়াল কোনো কিছু ফেলে দিয়েছে।
বৃদ্ধা এ কক্ষে এলে আরমুগানী তাকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে কানে কানে বললো, তোমাকে এ ঘরে আনার জন্যে আমিই ফুলদানী ছুঁড়ে ফেলেছি। আগন্তুক মেয়ে দুটির মধ্যে যারকা নামের মেয়েটিকে এভাবে আমার কাছে পাঠাবে যাতে তার সঙ্গী মোটেও বুঝতে না পারে।
বৃদ্ধা আরমুগানীকে জানালো, সে সামুরাতির সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলো। সে জানতো না, মাসুরাতি বাড়িতে নেই। এখন তো সে চলে যাচ্ছে, কিভাবে আমি ওকে তোমার কথা বলবোর
আরমুগানী নাছোরবান্দা। সে বৃদ্ধাকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলো, তুমি যে করেই হোক আমার কাছে ওকে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। এ কাজটি খুব জরুরী।
আরমুগনীর উপর্যুপরি অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধা সম্মত হলো। এই বৃদ্ধা পরিচারিকা ছিলো অভিজ্ঞ। জীবনে বহু নারী-পুরুষকে সে আঙ্গুলের ইশারায় নাচিয়েছে। উটকো একটা বাহানা সৃষ্টি করে পরিচারিকা অপর তরুণীকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলো। এই ফাঁকে আরমুগানী এসে যারকার সামনে দাঁড়ালো। যারকা আরমুগনীকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। সে আরমুগানীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিস্ময়ের সাথে বললো, তুমি এখনো এদেশে রয়ে গেছে? পায়ে আঘাত পেয়েছো কিভাবে?
“যদি ধোকা দিতে চাও তাহলে পরিষ্কার বলে দাও। আমি তোমার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছিলাম। প্রতারণা করলে জীবনের জন্য চলে যাবো। নয়তো বলো, কোথায় তোমার সাথে সাক্ষাৎ হবে?”
“হায়! আমি কিভাবে বিশ্বাস করাবো যে, তোমার সাথে ধোঁকাবাজি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি যেখানে যেতে বলবে সেখানেই যাবো। চাইলে এখানেও আসতে পারি।”
“ঘরে নয়, বাইরেই আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। প্রয়োজনে তোমাকে ঘরেও নিয়ে আসতে পারবো।… তবে এর মধ্যে তুমি এ ব্যাপারটা জানতে চেষ্টা করবে, সামুরাতি কেন নগরকোট থেকে ফিরে আসেনি। সে আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে উপকার করেছে। এখন চলে যাও। তোমার সঙ্গীনী এসে পড়ছে।”
যারকা আরমুগানীর সামনে থেকে আড়াল হতে চাচ্ছিলো না। বহুদিন পর অপ্রত্যাশিতভাবে সে আরমুগানীর সাক্ষাৎ পেলো। সে ভেবেছিলো, আরমুগানী নিরাপদেই শহর থেকে পালাতে পেরেছে। সে কোনদিন আরমুগনীর দেখা পাবে এমনটি আশা করেনি। কারণ, তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে আরমুগানীর গ্রেফতার হওয়ার আশংকা ছিলো। আরমুগানী কোনো অবস্থাতেই গ্রেফতার হতে চাইবে না। কারণ, আরমুগনী যে সুলতান মাহমুদের গোয়েন্দা, এ সংবাদ লাহোরে জানাজানি হয়ে গিয়েছিলো। কাজেই, আরমুগানীর পক্ষে আর লাহোরে আসা সম্ভব নয়।
