* * *
একদিন সুলতান মাহমূদকে তার গোয়েন্দা শাখা খবর দিলো, বিদয়ো অঞ্চলে ফঞ্জরের সেনারা শিবির স্থাপন করেছে। এ সংবাদ সুলতানকে আরো ভাবিয়ে তুললো। তিনি বুঝতে পারলেন, হিন্দুরা একসাথে তিনটি রণক্ষেত্র তৈরি করছে। তারা বেরা এবং মুলতান অবরোধ করবে, একই সাথে আমাকে এখানে ব্যস্ত থাকতে বাধ্য করবে।
বিষয়টি প্রকৃতপক্ষেই সুলতানের জন্য ছিলো চরম উদ্বেগের। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে একই সাথে তিনটি রণাঙ্গন মোকাবেলা করা এবং জয়লাভ করার ব্যাপারটি তার পক্ষে মোটেও সম্ভব ছিলো না। বিজয় তো দূরের কথা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই তখন সংশয়পূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
হিন্দু সেনাদের বিদরো পৌঁছার সংবাদের কয়েক দিন পরই সুলতানের কাছে খবর এলো, সম্মিলিত হিন্দু বাহিনী প্লাবনের মতো ধেয়ে আসছে। হিন্দু বাহিনীর দৃষ্টি ছিলো পেশোয়ারের দিকে। লাহোর ও আশপাশের লোকেরা হিন্দু বাহিনীকে এতোটাই সহযোগিতা করেছে যে, তারা কাঁধে বয়ে সেনাদের রাভী নদী পার করে দিয়েছে। তখন রাভী নদীতে ছিলো যথেষ্ট স্রোত। নদী পার হওয়ার জন্য নৌকা দিয়ে পুল তৈরি করা হয়। নৌকা স্রোতে যাতে নড়তে না পারে এ জন্য স্থানীয় লোকেরা মোটা মোটা রশি দিয়ে বেঁধে হাজার হাজার লোক টেনে রাখে, যার ফলে সেনাদের নদী পার হতে বেগ পেতে হয়নি। সামরিক রসদপত্রের বোঝাই গরুগাড়ীগুলোকে হিন্দু জনতা নিজেরা ঠেলে নদী পার করে আরো এগিয়ে দেয়, যাতে নরম মাটি ও কাদা পানিতে আটকে মালবাহী জন্তুগুলো কাহিল না হয়ে যায়।
সুলতান মাহমূদকে যখন জানানো হলো, সকল হিন্দু ফৌজ লাহোর থেকে পেশোয়ারের দিকে চলে এসেছে তিনি তা বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি বেরায় ছদ্মবেশে গোয়েন্দা পাঠিয়েছিলেন। তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিলো না, কেন হিন্দুরা বেরা ও মুলতান এড়িয়ে লাহোরের দিকে অগ্রসর হবে। সকল দিক থেকেই গোয়েন্দারা যখন খবর পাঠাচ্ছিলো, বেরা ও মুলতানের দিকে হিন্দুদের কোনো দৃষ্টি নেই, সম্মিলিত হিন্দু ফৌজ পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেই সাথে তার একান্ত গোয়েন্দা দলও যখন এ খবর নিশ্চিত করলো যে, হিন্দু বাহিনী পেশোয়ারের পথে অগ্রসর হচ্ছে, তখনই সুলতানের বিশ্বাস হলো কিন্তু ততোদিনে অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে।
সুলতান এ খবর নিশ্চিত হলে তার সেনা কর্মকর্তাদের বললেন, শত্রুদের কাছে বেরা ও মুলতানের চেয়ে গজনী বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হচ্ছে, পেশোয়ারের যে ময়দানে জয়পাল আমাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলো, হিন্দু সম্মিলিত বাহিনী সেই ময়দানেই আমাদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছে। ওরা আমাদের বাহিনীকে কচুকাটা করে গজনী দখলের পরিকল্পনা এঁটেছে। তারা যদি এ লক্ষ্য অর্জনে এদিকে এসে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা দূরদর্শিতার পরিচায়ক বটে। এতো বিপুল সেনা সদস্যের একটি বাহিনীর লক্ষ্য এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।…
আল্লাহ ছাড়া দৃশ্যত সিন্ধু নদ আমাদের সহায়ক হতে পারে। কোনভাবেই যাতে হিন্দু বাহিনী সিন্ধু নদ পার হতে না পারে, সে ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। এখন আমাদের দরকার একদল আত্মত্যাগী যোদ্ধা আর লক্ষ্যভেদী তীরন্দাজ। শবাহিনী যদি নদ পার হতে চায়, তাহলে তারা যে কোনো মূল্যে শক্রদের নদ পরাপার রুখে দেবে। শত্রুবাহিনী যদি নৌকা দিয়ে পুল তৈরি করে সিন্ধু পার হতে চায়, তাহলে আমাদের যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে ওদের নৌকার রশি কেটে দেবে। আর হাতি যদি নৌকার পুল দিয়ে পার করতে চায়, তাহলে হাতিগুলোকে তীরন্দাজরা তীরবিদ্ধ করবে। দু’একটি হাতি তীরবিদ্ধ হলে পুল দিয়ে আর কাউকে পার হতে দেবে না।
অবশ্য শুধু এই তৎপরতা দ্বারা শত্রুবাহিনীর পথ রোধ করা যাবে না। কারণ, শত্রবাহিনী যখন এখানে পৌঁছবে, তখন শীতকাল শুরু হয়ে যাবে। তখন নদীর পানি কমে যাবে। নদীর স্রোতও তেমনটা থাকবে না। আমরা শত্রু বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করবো নদীর তীরে। এ যুদ্ধটা হয়তো আমাদের জীবন-মরণ যুদ্ধে পরিণত হবে।
সুলতান তখনই বেরা, মুলতান ও গজনীতে দূত পাঠিয়ে খবর দিলেন, ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রিজার্ভ বাহিনীর সকল সদস্য পেশোয়ার এসে পড়ো। খুব দ্রুতগতিতে এসো। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সুলতান মাহমূদ এমন হয়ে গেলেন যে, তিনি মানচিত্র সামনে রেখে গভীর চিন্তায় ডুবে যেতেন, ঘন্টার পর ঘণ্টা শুধুই ভাবতেন। পানাহার ও ঘুমের কথাও ভুলে যেতেন। তার আঙ্গুল মানচিত্রের রেখায় রেখায় ঘুরতো। তিনি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র নির্ধারণ করতেন, কৌশল নির্ধারণ করতেন। সবদিক বিবেচনা করে আবার সেটি পরিবর্তন করে নতুন রণক্ষেত্র নির্ধারণ করতেন। এভাবে সকাল, দুপুর হয়ে রাতও চলে যেতো। ওয়াক্ত মতো নামায আদায় ছাড়া তার আর কোনো কিছুর দিকে খেয়াল ছিলো না।
***
রাজা আনন্দ পাল যখন নগরকোট মন্দির থেকে রাজধানীতে ফিরে এলো, তখন শুয়াইব আরমুগানী সামুরাতির ঘরে। সামুরাতির পরিচারিকা আরমুগানীকে জানালো, “রাজা সফর থেকে ফিরে এসেছে কিন্তু সামুরাতি ফেরেনি।”
দু’তিন রাত পর সামুরাতির পরিচারিকা আরমুগানীকে জানালো, “যেসব তরুণী সামুরাতির সঙ্গে নগরকোট গিয়েছিলো তারা বলেছে, প্রথম রাতেই নগরকোটের বড় পণ্ডিত সামুরাতিকে মন্দিরের ভেতরে নিয়ে গেছে। এরপর তারা আর সামুরাতির দেখা পায়নি। রাজাও আর তার ব্যাপারে কিছু বলেনি।”
