“এটা আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। পরিবর্তন শুধু একটাই। আগে আমি এক রাজার দখলে ছিলাম, সেখান থেকে এখন একজন মন্দিরের পণ্ডিতের দখলে এলাম। যখন এনেছেন আমাকে মনের মতো করে ভালোবাসা দিতে হবে। আপনাকে অবশ্যই আমার হৃদয়ের মূল্য দিতে হবে। সোনা-দানা দিয়ে এর মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
চকিতে সামুরাতি তার শরীর থেকে হীরা-মতি-পান্নার গহনা খুলে পণ্ডিতের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দেয় এবং আঙ্গুল থেকে মুক্তার আংটি খুলে ছুঁড়ে ঘরের মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলে, “নিন, এসব গঙ্গা জলে ফেলে দিন।”
পণ্ডিত মাথা নিচু করে হার ও আংটি কুড়িয়ে তার সামনে রেখে বলে, “যাও, এখন আরামে শুয়ে ঘুমাও। আমি খুব ভোরে আসবো এবং তোমাকে গঙ্গা তীরে নিয়ে যাবো।”
***
সামুরাতিকে পণ্ডিতের হাতে তুলে দিয়ে রাজা আনন্দ পাল লাহোর ফিরে যায়। রাজার বুকভরা কষ্ট তার সবচেয়ে প্রিয় গায়িকা নর্তকীকে ছেড়ে আসতে হলো। সামুরাতির নাচের মুদ্রা আর জাদুকরী কণ্ঠের জন্য রাজা আনন্দ পাল একশ’ তরুণীকেও নর বলী দিতে প্রস্তুত ছিলো। কিন্তু পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ তাকে কোনো কথা বলারই অবকাশ দিলো না। দেবীর নামে তাকে বলী দেয়ার জন্য তুলে দিয়ে গেলো। শেষবারের মতো সামুরাতির সাথে দুটি কথা বলারও সুযোগ দিলো না। উপরের মন্দিরে গেলেও রাজা আর সামুরাতির দেখা পেলো না। এ জন্য রাজার মনটা ভারী হয়ে আছে। বেশ ক’দিন সামুরাতির শূন্যতায় মন খারাপ রইলো রাজার। কিন্তু খুব বেশি দিন সামুরাতির প্রেমের যাতনা বোধ করার অবকাশ পেলো না রাজা। অন্যান্য রাজা থেকে দলে দলে সৈন্য তার রাজধানীতে আসতে শুরু করেছে। বাধ্য হয়েই সামুরাতির কথা ভুলে গিয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে তাকে মনোনিবেশ করতে হলো।
দেখতে দেখতে আজমীর, কনৌজ ও গোয়ালিয়রের সেনাবাহিনী লাহোর পৌঁছে যায়। কাজরের সেনাবাহিনীকে লাহোর না পাঠিয়ে পেশোয়ারের দিকে পাঠানো হয়। কাজর বাহিনীর কমান্ডারকে বলে দেয়া হলো, সে যেনো সিন্ধু নদী পার হয়ে তাঁবু খাঁটিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
১০০৮ সালের শ্রাবণ-ভাদ্র মাস। সিন্ধু নদ তখন উত্তাল। কানায় কানায় পানিতে ভরা থাকায় সেনাবাহিনীর যাতায়াত যথেষ্ট কষ্টকর হয়ে উঠলো। সে সময় বহু নৌকা একসাথে জুড়ে দিয়ে পুল তৈরি করা হতো। কিন্তু নৌকার তৈরি পুলকে বারবার ঢল এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। সেই সাথে বিশাল সেনা বহরের সাথে অপরাপর উট-ঘোড়া ও গরুগাড়ি বোঝাই রসদপত্র পারাপারের জন্য অন্তত মাসখানেক সময় দরকার ছিলো। কিন্তু হিন্দু রাজা সুলতান মাহমূদকে সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের সুযোগ মোটেও দিতে চাচ্ছিলো না।
তৎকালীন ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সে সময় গোটা লাহোের একটি সেনা ক্যাম্পে পরিণত হয়েছিলো। যেদিকেই চোখ যেতো শুধু সেনাবাহিনীর আনাগোনা চোখে পড়তো। দলে দলে বিভিন্ন রাজ্য থেকে সেনাবাহিনী লাহোরে পদার্পণ করেছিলো। সেই সাথে দলে দলে হিন্দু তরুণ-যুবকরা সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য লাহোরে এসে জড়ো হচ্ছিলো।
যেসব হিন্দু যুবক-তরুণ অশ্বারোহণ ও তীর তরবারী চালাতে পারতো, তাদেরকে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নেয়া হচ্ছিলো। হিন্দু মহিলা তাদের যুবক ছেলেদের এবং তরুণী বধূরা তাদের সামর্থবান স্বামীদেরকে সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে গর্ববোধ করছিলো।
মন্দিরের পণ্ডিতরা ভক্তদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এতোটাই ক্ষেপিয়ে তুলেছিলো যে, কোন হিন্দু মা আর তার তরুণ ছেলেকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বারণ করতে না বরং যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতো। সাধারণ হিন্দু প্রজারা সেনাদের জন্য পণ্যসামগ্রীর পাহাড় গড়ে তুলেছিলো। সেনাদের জরুরী রসদপত্র বহনের জন্য সাধারণ প্রজারা পর্যন্ত তাদের উট, মহিষ ও গরুগাড়ী দিয়ে দিচ্ছিলো। তখন মন্দিরগুলোতে শুধু একটাই প্রার্থনা হতো, “হে ভবগান! হিন্দুদের বিজয়ী এবং মুসলমানদের পরাজিত করো।”
অবস্থা দেখে মনে হতো, হিন্দুদের অন্যসব কামনা-বাসনা হারিয়ে গিয়েছিলো। তাদের তখন একটা কামনাই ছিলো, মুসলমানদের পরাজিত করা, তাদের নিঃশেষ করা। লাহোরের আশপাশের লোকেরা বিশাল সেনাবাহিনীর আগমনে আনন্দে নেচে ওঠেছিলো। ঐতিহাসিক আল-বিরুনী ও ফিরিশতা লিখেন, হিন্দুস্তানে এর আগে এতো বিপুল সেনা সমাবেশ কখনো ঘটেনি।
হিন্দু রাজাদের বিশাল রণপ্রস্তুতির বিপরীতে সুলতান মাহমূদের ছিলো মুষ্টিমেয় সেনা আর আল্লাহর উপর ভরসা। অবশ্য হিন্দু বাহিনীর আধিক্যে তিনি মোটও চিন্তাৰিত ছিলেন না। কারণ, তার নিজস্ব রণকৌশলের প্রতি তিনি ছিলেন পূর্ণ আস্থাশীল এবং আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির প্রতি তার ছিলো অগাধ বিশ্বাস।
সেই দিনগুলোতে সুলতান ছিলেন পেশোয়ারে। লাহোর থেকে অব্যাহতভাবে তার কাছে খবর আসছিলো। সেনাবাহিনী তো নয় বিশাল এক প্লাবন তার দিকে ধেয়ে আসছে। অবশ্য তখনো সুনির্দিষ্টভাবে তার কাছে খবর পৌঁছেনি, এ প্লাবনের গতি কোন্ দিকে।
বেরা ও মুলতানে তিনি এতো পরিমাণ রসদপত্র সঞ্চিত করেছিলেন যে, বেরা ও মুলতান অবরুদ্ধ হলেও এক বছর পর্যন্ত অবরোধবাসীরা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারবে। তিনি মনে করেছিলেন, হিন্দুরা যদি তার দখলিকৃত এসব শহর অবরোধ করে তাহলে বাইরে থেকে তিনি অবরোধ ভাঙ্গার চেষ্টা করবেন।
