“কেনো?”
“আমি নারীর সংস্পর্শে যাওয়াকেই পাপ মনে করি।”
“তাই নাকি? তাহলে আজ এই পাপ করছেন কেনো?” জানতে চাইলো সামুরাতি।
‘এ কথার জবাব আমি এখন দিতে পারবো না।” বললো পণ্ডিত। “তবে এ কক্ষে এসে তুমি মনে যে ধারণা পোষণ করেছে, আমার ক্ষেত্রে এমন ধারণা মন থেকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলো। তোমার শরীরের সৌন্দর্য নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমাকে এসব ব্যাপারে তুমি আর কিছু জিজ্ঞেস করো না। তোমাকে আমি মনের মধ্যে দেবীর মর্যাদা দিয়ে রেখেছি। তোমাকে আমি গঙ্গা জলে স্নান করাবো। তোমার সকল পাপ ধুয়ে সাফ করে ফেলবো।”
পণ্ডিতের কথা শুনে সামুরাতির হাসি পেলো । বেশি সময় সে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলো না। টানা কিছুক্ষণ হাসলো। আর পণ্ডিত নির্বাক হয়ে সামুরাতির চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো। শিশুর মতো হাসতে হাসতে উচ্ছ্বসিত হয়ে সামুরাতি পণ্ডিতের কোলে লুটিয়ে পড়ে। সামুরাতির রেশমী কোমল চুলগুলো পণ্ডিতের কোলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সামুরাতি তার চুলে এমন সুগন্ধি লাগিয়েছিলো- বিশেষ কোনো রাজার আগমনের অনুষ্ঠানেই শুধু এ ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করে সে। সুগন্ধিতে ছিলো মন মাতানো সৌরভ। মনোহরী এই সৌরভের সাথে সামুরাতির ভোলা কাঁধ আর নরম হাত যখন পণ্ডিতের শরীর স্পর্শ করে, তখন হঠাৎ যেনো পণ্ডিত তার শরীরে একটা কাঁপুনি অনুভব করে। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ জীবনে এতো ঘনিষ্ঠভাবে কোনো তরুণীকে দেখেনি। কিন্তু আজ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট এক অপ্সরা তার কোলে লুটিয়ে আছে।
“ওঠো নর্তকী! বলো, তুমি কেননা এভাবে হাসছে।” সামুরাতিকে স্পর্শ না করেই লুটিয়ে পড়া থেকে ওঠে বসতে নির্দেশ দেয়।
সামুরাতি বিশেষ কোনো অভিজাত বংশের মেয়ে নয়। সে যৌবনের শুরু থেকেই শরীর নিয়ে খেলা করতে শিখেছে। পণ্ডিতের তাড়া খেয়ে ওঠে বসার পরিবর্তে সে পণ্ডিতের কোলে আরো বেশি করে নিজেকে মেলে ধরে। সে চিত হয়ে পণ্ডিতের মুখের দিকে শিশুর মতো কৌতূহলীকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “গঙ্গা জলে স্নান করিয়ে আপনি আমার সব পাপ ধুয়ে দেবেন? না, তা নয়। আপনি ভুল বলেছেন। আপনার বলা উচিত ছিলো, যখন গঙ্গা জলে ঝাঁপ দেবো, তখন গঙ্গার সব পাপ গঙ্গার পানির সাথে ধুয়ে চলে যাবে।”
পণ্ডিত নিজে সামুরাতির হাত ধরে উঠানোর কোনো চেষ্টাই করলো না। সামুরাতি নাগিনীর মতো ফণা ধরে ওঠে বসলো এবং পণ্ডিতের দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো, “আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি কেননা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন? আপনি আমাকে পবিত্র করতে চাচ্ছেন…।” একথা বলে সে গম্ভীর হয়ে যায়। “আমার পাপ সেদিন মুছবে যেদিন আপনি ওইসব পাপীষ্ঠকে গঙ্গা জলে ডুবিয়ে জনমের স্নান করাবেন, যারা এতোদিন আমার শরীর নিয়ে খেলা করেছে। আমার শরীরকে যারা খেলার পুতুলে পরিণত করেছে। বলুন, আপনার ভগবান কি ওদের কোনো বিচার করতে পারে না…।
পণ্ডিত মহারাজ! আমার কোনো জাত-ধর্ম নেই। ওরা আমার জাত-ধর্ম থাকতে দেয়নি। কিছুদিন থেকে আমি অনুভব করছি, দৃশ্যত আমি যতো পাপ কর্মেই লিপ্ত থাকি না কেন, আমার দেহের খাঁচার ভেতরে যে হৃদয় আছে সেটি সম্পূর্ণ পবিত্র। এই পবিত্র হৃদয়টি সেই মহাপুরুষের জন্য অপেক্ষা করছিলো যে স্কুল লালসা নয়, আমাকে প্রকৃত হৃদয়ের ভালোবাসা দেবে।”
“তুমি কি জানো সেই মহাপুরুষটি কে?”
“হ্যাঁ, জানি। আপনিই সেই মহাপুরুষ। সে আপনার চেয়েও বয়স্ক কেউ হতে পারতো কিংবা আমার চেয়ে আরো তরুণ কেউ, সেই মহাপুরুষ হতে পারতো। সে কোনো মুনিঋষি কিংবা মাওলানা মুফতী হতে পারতো। সে কোনো চাটাইয়ে শয়নকারী দরবেশ হতে পারতো। আবার রাজপ্রাসাদের বিলাসী বাসিন্দাও হতে পারতো।… বলুন, আপনার কাছে কি গঙ্গা জলে বিধৌত অমলীন ভালোবাসা আছে?”
সামুরাতির কথা শুনে পণ্ডিত এভাবে চমকে উঠলো যেনো হঠাৎ কেউ তাকে সুখ-স্বপ্ন থেকে জাগিয়ে দিয়েছে। পণ্ডিত নিজেকে যতোই দাবী করছিলো নারী স্পর্শ থেকে তার শরীর পবিত্র এবং ভবিষ্যতেও পবিত্র থাকবে, কিন্তু সামুরাতির কোমল স্পর্শ আর তার রেশমী কোমল চুলে সে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলো। সামুরাতির লাজুক হাসি পণ্ডিতকে জাদুর মতো অবচেতন করে দিয়েছে। পণ্ডিত নিজেও মুগ্ধ হাসি হেসে বললো, “অবশ্যই, একজন পূজারীর কাছ থেকে তুমি পাপ নয়, ভালোবাসাই পাবে।”
“আপনি যদি আমাকে সেই রকম ভালোবাসা দেন, যে ভালোবাসার জন্য আমার হৃদয় উন্মুখ হয়ে আছে, তাহলে আমি পাথরের মূর্তির সামনে এমন নাচন নাচবো যে, তারাও আমার নাচ দেখে নাচতে শুরু করবে। আর যে মূর্তির হাতে আপনি বাঁশি রেখেছেন সেই বাঁশি থেকে এমন সুর বের হবে, যে সুরে আপনিও হারিয়ে যাবেন। দূর দরাজ থেকে লোকজন নগরকোটের নর্তকীর নাচ দেখার জন্য আসবে। লোকজন কৃষ্ণ ভগবানকে ভুলে গিয়ে নগরকোটের নর্তকীর পূজা করতে শুরু করবে।”
হঠাৎ পণ্ডিত বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং কক্ষে দু’হাত পেছনে বেঁধে মাথা নিচু করে পায়চারি করতে শুরু করে। পণ্ডিতের পায়চারি লক্ষ্য করছিলো সামুরাতি। পণ্ডিত থেমে থেমে সামুরাতির দিকে তাকাচ্ছিলো আর পায়চারী করছিলো।
“আপনি কি সকাল বেলা মহারাজের তাঁবুতে যাবেনা” পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করলো সামুরাতি।
“আমি যদি মহারাজা আনন্দ পালের কাছ থেকে চিরদিনের জন্যে তোমাকে নিয়ে আসি, তাতে তুমি খুশি হবে”
